পেহেলগামের পাইন বনে ঘোড়ার রোমাঞ্চ

পেহেলগামের একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো ঘোড়ায় চড়ে টগবগিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাইনের গভীর অরণ্যের রোমাঞ্চকর যাত্রা, যা এতদিন শুধু নানা রকম সিনেমায় ও কিছু আরব্য চিত্রায়নে দেখেছি। কিন্তু আগে থেকেই জানতাম যে পেহেলগামে ঘোড়ায় চড়ে অরণ্যের ভেতর দিয়ে মিনি সুইজারল্যান্ড যাওয়া একটি জনপ্রিয় রাইড।
তাই শ্রীনগর থেকে পেহেলগাম আসার সময় থেকেই ঘোড়ায় চড়ে এই রোমাঞ্চকর রাইডের জন্য কিছুটা রোমাঞ্চিত ছিলাম। আর পেহেলগামের স্বর্গ প্যালেসে নামার পরে জানালা দিয়ে বাইরে টগবগ টগবগ করে পাইনের অরণ্যের ভেতরে ঘোড়াদের ছুটে যাওয়া দেখে ভেতরে ভেতরে অস্থির লাগছিল, কখন এই রোমাঞ্চকর রাইড শেষ করবো?

পাইন বনে প্রস্তুত ঘোড়া। ছবিঃ লেখক

খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, পেহেলগাম থেকে পাইনের অরণ্যের ভেতর দিয়ে দুই কিলোমিটার পাহাড় পেরিয়ে মিনি সুইজারল্যান্ডসহ আরও দুই তিনটি স্পট ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে ঘোড়ার মালিকরা যার কাছে যেমন পারে দাম হাঁকিয়ে থাকে। যেটা সবচেয়ে কম ১,০০০ থেকে ১,৬০০ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে! কিন্তু এখন ওদের অফ সিজন, টুরিস্ট কম বলে কটেজের মালিক ভালো করে আমাদের দামদর করে নিতে বললেন।
আমাদের চার পরিবারের মধ্যে দুই পরিবারের মাত্র দুইজন এই রোমাঞ্চকর রাইডের জন্য একদম প্রস্তুত। বাকি দু’জন যাবে কি যাবে না এই নিয়ে অনেকক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করার পর থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে শীত শীত আবহাওয়ার উষ্ণ নরম কম্বলের নিচে নিজেদেরকে সঁপে দিলেন! আর আমরা দুই বেপারোয়া, হতচ্ছাড়া, বউদের অযথা অভিমানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, পুরো ওয়েস্টার্ন স্টাইলে।
এমন দুর্গম পথেই রাইড হয়। ছবিঃ লেখক

নিচে শীতের জন্য ইনার, তার উপরে ওয়েস্টার্ন জিন্সের হাফ প্যান্ট। টি শার্টের উপরে হালকা জ্যাকেট, মাথায় ক্যাপ আর গলায় বা কোমরে ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবটা এমন যেন বিশাল কোনো শিকার অভিযানে বেরিয়েছি! আমাদের দেখেই কয়েকজন ঘোড়ার মালিক ছুটে এলেন। অনেক দরদাম করে ১,৬০০ রুপীর ঘোড়ার রাইড মাত্র ৫০০ রুপীতে রফা করা হলো। দুইজন মিলে দুই ঘোড়ার জন্য ১,০০০ রুপী। দুই ঘোড়ার দিক নির্দেশনার জন্য থাকবে একজন সহকারী।
ব্যস, একটি সাদা আর একটি খয়েরি ঘোড়ায় চড়ে শুরু হলো কোনো অন্য রকম এক রোমাঞ্চের স্বাদ। সত্যিই তাই, যারা পেহেলগামের ঘোড়ায় চড়ে, খাড়া পাহাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে, পাইনের ঘন অরণ্যের ভেতর দিয়ে, এই রাইড দিয়েছেন তারা মাত্রই একটা নতুন আর অন্য রকম রোমাঞ্চের স্বাদ উপভোগ করেছেন নিশ্চিতভাবেই। আমাদের যাত্রাটা আরও একটু বেশী রোমাঞ্চকর ছিল কারণ তখন প্রায় প্রতিদিনই পুরো পেহেলগাম জুড়ে বৃষ্টি ঝরার কারণে পুরো পথটুকু ছিল দারুণ কাদাময়, পিচ্ছিল আর দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ।
পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ। ছবিঃ লেখক

পথের শুরুটাই হলো সমতল থেকে হুট করে একটি ঝিরির মধ্য দিয়ে, মাত্র কয়েক ইঞ্চি চওড়া একটি সরু পাথুরে আর পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে! ঘোড়া সামনে ওঠার সময় পুরো খাড়া হয়ে যায়, যাতে করে পিঠে বসে থাকা আনকোরা যে কেউ ছিটকে পড়ে যাবার আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারে! যদিও ঘোড়ার সহকারী সব সময় তৎপর থাকে। কয়েক মিনিট পরেই বেশ পিচ ঢালা, গাড়ি চলা চওড়া রাস্তা। একটু পরেই সেই রাস্তা পেরিয়ে পাইন বনে ঢুকে পড়লো ঘোড়া। এইবারই শুরু হলো ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ে ওঠার আর স্বাদ মিটিয়ে পাইনের অরণ্য উপভোগের সত্যিকারের রোমাঞ্চ।
আমি আর আমার সঙ্গী তুষার ভাই দুজনই দারুণ রোমাঞ্চিত, আনন্দে আত্মহারা বউ-বাচ্চা রেখে শুধু নিজেদের জন্য এমন একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেবার জন্য। কারণ যে রাস্তা শুরু হলো একটু পরেই, সেই রাস্তায় ছোট বাচ্চা নিয়ে এসে নিজেদের ভ্রমণ রোমাঞ্চ মাটি করার কোনো মানেই হয় না। তাই ওদেরকে জোর করে না এনে বেশ করেছি, সেটা নিয়েই দারুণ আপ্লুত ছিলাম দুজনেই।
রোমাঞ্চকর পথ। ছবিঃ লেখক

আহা, কী রোমাঞ্চই ছিল ৪০ মিনিটের সেই পথে! যতদূর চোখ যায় শুধু আকাশ ছুঁয়ে থাকা পাইনের বন। ছোট, মাঝারী আর বড় থেকে আরও বড়, বিশাল আকৃতির এক একটা গাছ, বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে, বন্যা-খরা-বৃষ্টিতে কালো হয়ে গেছে কোনো কোনোটা। কোনো কোনোটায় আবার আলাদা আগাছা পর্যন্ত জন্মেছে যা ওর বয়স বা প্রাচীনতার পরিচয় বহন করে চলেছে। যতদূর চোখ যায় শুধু পাইনের গভীর অরণ্য, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, পিচ্ছিল পাথুরে খাড়া পাহাড়ি পথ। ঘোড়া পর্যন্ত পিছলে পড়ে যাচ্ছিল কয়েকবার।
কোথায় পাইনের অরণ্যের মাঝে মেঘ আর কুয়াশারা ঢুকে পড়েছে ফাঁকফোঁকর দিয়ে, সেখানে হয়তো এক চিলতে সূর্যের সোনালী আলো পড়ে তৈরি করেছে এক অনন্য পরিবেশ, যা দেখে শুধু রোমাঞ্চ জাগে না, শরীরের পশমও দাঁড়িয়ে গেছে কখনো কখনো! না কোনো ভয়ে নয়, সিনেমায় দেখা এমন অদ্ভুত অরণ্যের সাথে নিজেদের বাস্তবতাকে সেই স্বপ্ন আর কল্পনার সাথে গুলিয়ে ফেলে! কখনো কখনো মনে হচ্ছিল সত্যি কি এমন পরিবেশে আমরা আছি? নাকি কোনো সিনেমার সাথে নিজেদেরকে মিলিয়ে ফেলছি? কারণ এমনটা এর আগে শুধু সিনেমাতেই দেখেছি কিনা?
ঝুঁকিপূর্ণ রাইড। ছবিঃ previews.123rf.com

কোথাও কোথাও পুরনো পাইন ঝরে উপড়ে গিয়ে গোড়ার পুরনো শেকড় ভয়ানক আকৃতি নিয়ে তাকিয়ে আছে, যেন পারলে এখুনি গিলে খাবে হরর কোনো মুভির মতো! বা জড়িয়ে ধরবে ওর শেকড় দিয়ে! কোথাও বয়ে যাওয়া ঝিরির মধ্যে কাদা এত বেশি যে ঘোড়া নিজের পা নিজেই তুলতে হাঁপিয়ে উঠছিল। তাই ওকেও বেশ কয়েক জায়গায় বিশ্রাম নিতে হলো, পানি খেতে হলো, ঘাস খেতে থামতে হলো। খাড়া পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উপরে ওঠা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপদজনক।
সত্যি-মিথ্যা জানি না, এই পথে যেতে যেতে ঘোড়ার সহকারী আমাদেরকে দেখাল কোথায় জনপ্রিয় সিনেমা বজরাঙ্গি ভাইজানের শুটিং হয়েছিল। আমরাও দেখলাম, কখনো মিল পেলাম আবার কখনো পেলাম না। কারণ পুরো পেহেলগামের প্রায় সকল পাইনের অরণ্যর চেহারা অনেকটা একই রকম, তাই বিভ্রান্তিতে পড়া কোনো ব্যাপার না।
বাইশরনের পথে। ছবিঃ greetholidays.com

তবে পুরো পথের প্রতিটি বাঁকে, পাহাড়ের চড়াইয়ে, গভীর কাদাযুক্ত পথে, পিচ্ছিল পাথুরে পাহাড়ের সরু রিজে, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে আরও ভয়ানক হয়ে ওঠা পাইনের অরণ্যে সেদিন যে রোমাঞ্চের স্বাদ পেয়েছিলাম সেটা অনন্য এক অভিজ্ঞতা, অসাধারণ এক রাইড আর মনে রাখার মতো কিছু সুখ গেঁথে নিয়েছিলাম নিজেদের অলস অবসরের স্মৃতিকাতর হওয়ার মুহূর্তের জন্য।
যে কারণে পুরো রাইডের শুরুতে, মাঝে আর শেষেও দুজনেই দুজনকে দিয়েছিলাম অনেক অনেক আন্তরিক ধন্যবাদ, দুজনের যৌথ কিন্তু সবাইকে রেস্ট হাউজে রেখে এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা স্বাদ মিটিয়ে উপভোগ করতে পারার জন্য।
ফিচার ইমেজ- ghumakkar.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পীর খান জাহান আলীর রাস্তার খোঁজে বাগেরহাটে

বিশ্ব জুড়ে সৌন্দর্যের ৮টি অদ্ভুত মানদণ্ড