বিস্ময়কর খুম রাজ্যের আদিঅন্ত

অমিয়াখুম। ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

যেমন ধরুন অনেকের কাছেই পাহাড়, ঝর্ণা ব্যাপারগুলো দৈনন্দিন ব্যবহার্য জামাকাপড় বা জুতো থেকে বেশি ভালোবাসার। আমি সেই দলের একজন। সেই সুবাদেই জীবন থেকে পালানোর অনুপ্রেরণাগুলো পাহাড় থেকেই আসে, ওই যে ঝর্ণাগুলো? পলায়নে ইচ্ছুক কোনো এক বিকেলে আমি বৃত্তের একটা ইভেন্ট পাই ফেসবুকে।

অমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম, নক্ষাংমুখ, নাফাখুম। সব মিলিয়ে খুমের রাজ্য দর্শন।  ৭-৮ দিন আগে কনফার্ম করায় আমি বেশী সময় ধরে উত্তেজিত ছিলাম, কবে যাব- কবে যাব। তো সময় চলে এলো পালাবার। ২৬ এপ্রিল, ২০১৮। সায়েদাবাদ বাস কাউন্টার থেকে আমাদের বাস ছাড়ল বান্দরবানের দিকে।

আলো ঠিকরে পড়া আকাশ। বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

বান্দরবানে ঢোকার আগেই দেখা পেলাম ভালোবাসার পাহাড়ের। উঁচুনিচু সাপের মতো রাস্তা, দুপাশে পাহাড়। তার মধ্যে দিয়ে পিঁপড়ের মতো চলছিল আমাদের বাস। রাস্তায় যানযট কম থাকায় ভোর ৬টা ২০ এর দিকে আমরা মেঘে ঘেরা বান্দরবান নামলাম।  যেহেতু গ্রুপ ইভেন্ট, সেহেতু চান্দের গাড়ি আগে থেকে প্রস্তুত ছিল আমাদের চান্দে নেবার জন্যেই হয়তো! আমরা ফ্রেশ হয়ে উঠে বসলাম চান্দের গাড়িতে। ছোট পাহাড় ডিঙিয়ে যাচ্ছিলাম অজস্র মায়াময় বাঁক নিতে নিতে।

ছোট পাহাড়গুলো পেরোতেই চোখ আটকে থাকতে লাগল, প্রতিটা রাস্তার মোড়ে যেন বিশাল পাহাড় আর মেঘের সমুদ্রে। দেখতে দেখতে ঘণ্টা আড়াই যাত্রার পর আমরা থানচি বাজারে পৌঁছলাম। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম সবাই। এবার অনেকে ট্রেকিং স্যান্ডেল, ট্রেকিংয়ের সাজ সরঞ্জাম কিনে নিয়ে, থানচি থানায় নাম এন্ট্রি করিয়ে গেলাম থানচি ঘাটে। ওখান থেকে পরিচয় হলো প্রধান গাইড হারুন অর রসিদের সাথে।

৮টা বোটে আমরা ৪০ জন বের হয়ে পড়লাম পাহাড়ি নদী, পাথর, স্রোত দেখতে দেখতে পদ্মমুখ ঝিরির উদ্দেশ্যে। ৩৫-৪০ মিনিট পর আমরা ঝিরির মুখে নেমে ট্রেকিং শুরু করলাম। পরিচয় হলো অন্য গাইড বীর বাহাদুরের সাথে।

বাঁশের সাঁকোয় পিপড়ে যাত্রা। পদ্মমুখ ঝিরী, বান্দরবান, ছবিঃ হারুন অর রসিদ (হারুন)

পাহাড়ি খাঁজের ভেতর ৪০ ফিটের মতো বাশের সাঁকো পেরিয়ে দুটি দলে ভাগ হয়ে হাঁটতে শুরু করলাম কখনো ঝিরি, কখনো পাহাড়ে পিঁপড়ের সারির মতো। প্রচণ্ড গরমে যখন মাথার তালু সেদ্ধ প্রায়, কিছু সবুজ, দুরের নীল বা লাল হয়ে ওঠা বিশাল পাহাড় দেখে স্নিগ্ধতায় ভরে উঠছিল মন।

সাড়ে তিন ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা একটা পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। উঠছি তো উঠছি। পাহাড়ের ঢাল ক্রমশ বাড়ছে, বুকের ছাতি ফেটে যায় অবস্থা এমন সময় চোখে পড়ল, সামনে পাড়া। হাত-পা ছড়িয়ে বসে পানি, ডিম, শুকনো খাবার খেলাম হরিসচন্দ্র পাড়ায়।

হরিসচন্দ্র পাড়া, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

বিশ্রাম শেষে আবার ট্রেকিং শুরু। পাহাড়ি পথে আরো ঘণ্টা তিনেক হাঁটার পর সন্ধ্যা নেমে এলো। পাহাড়ি ফাটল থেকে সংগ্রহ করা পানি দিয়ে বাকি পথ চলতে হবে। আকাশে চাঁদ, পাহাড়, পাথর, ঝিরি আর ছোট একটা ক্যাসকেড পেরিয়ে পৌঁছলাম থুইসা পাড়া। পদ্মমুখ ঝিরি থেকে মোট সাড়ে সাত ঘণ্টা ট্রেকিং করা হয়েছে ততক্ষণে।

থুইসা পাড়ার পাহাড়ি ভোর। ছবিঃ লেখক

পাড়ায় পৌঁছে পিঠের হালকা ব্যাগটাও পাহাড় সমান লাগছিল। ব্যাগ নামিয়ে বাঁশের মাচায় শুয়ে পড়লাম হাত পা এলিয়ে। গোসল করলাম এক অলৌকিক পাইপ লাইনের পানি দিয়ে। অনর্গল পানি পড়েই যাচ্ছে সেই পাইপ দিয়ে। পরে জানলাম ওটা উঁচু কোনো ঝিরি থেকে আসে। গোসল শেষ করার পর ডাক পড়ল রাতের খাবারের। পেট যেন রাক্ষস হয়ে ছিল সবার।

জুম ধানের চালের ভাত, ডাল, আলু ভর্তা আর পাহাড়ি মুরগির মাংস গোগ্রাসে গিলে সেদিনের মতো আর কথা বলার শক্তি ছিল না কারো। তাছাড়া হারুন ভাই বলে দিলো কাল ১,৬০০ ফিট দেবতা পাহাড় দুই বার টপকাতে হবে। ভোর ৫টা থেকে হাঁটা শুরু। সেই চিন্তা করে হয়তো কেউ জেগে থাকার সাহস পায়নি। সারাদিনের ওই ক্লান্তির পর জোৎস্না আর মেঘ মাখা বাতাসে নিশ্চুপ হয়ে এলো থুইসা পাড়া।

দেবতা পাহাড় আরোহণ। থুইসা পাড়া, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

পরদিন ভোরে আমরা রওনা হয়ে গেলাম অমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম, নইক্ষ্যামুখের উদ্দেশ্যে। পথে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছিল ১,৬০০ ফিট উঁচু দেবতা পাহাড়। থুইসা পাড়া থেকে ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা ওঠা-নামা দিয়ে। পাহাড় টপকে আমরা চলে এলাম ভেলাখুমে। এখানে এসে উত্তপ্ত পাহাড়ের ঝাঁজ মেটাতে নেমে পড়লাম স্বচ্ছ, শীতল অথচ শান্ত ভেলাখুমে।

খুমের জলে প্রাশান্তির পরশ। সাতভাইখুম, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

এরপর শরীর জুড়িয়ে উঠে পড়লাম। বিশাল বিশাল পাথর বিছানো পথে কিছুদূর এগুতেই চোখ আটকে গেল বিশাল এক জলপ্রপাতের দিকে। পাহাড়ের খাঁজে বয়ে চলা খুমটি হুট করে নেমে গেছে ধাপে ধাপে অনেকখানি নীচে।

আর আমিয়াখুমের অফুরন্ত জলধারা উপচে পড়ছে সেখানে। দুই পাশে উঁচু পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়ে যেন শান্তির নহর। ছায়ায় বসে উপচে পড়া পানির দৃশ্য দেখলে ১,৬০০ ফিট বেয়ে ওঠানামার পরিশ্রমটা নস্যি মনে হয়। মাথা থেকে ধুয়ে যায় কষ্টের সব চেতনা।

দলবলে অমিয়াখুম। অমিয়াখুম জলপ্রপাত, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এর পর বাঁশের ভেলায় ভেসে চললাম কয়েক ঘণ্টা। পাথুরে পাহাড় দুপাশে। তার ভেতর দিয়ে পাহাড়ি পোকা-পাখির গোপন কথাবার্তা শুনতে শুনতে ভেলায় দাঁড় বাইলে মনে হয় আমি দুনিয়ার সব থেকে সুখী মানুষ। এর পর দ্বিতীয় দফা গোসল শেষে আমরা সাতভাই খুম ও নইক্ষ্যামুখ দেখা শেষে আবার চড়তে থাকলাম দেবতা পাহাড়ের চূড়ার উদ্দেশ্যে।

দেড় ঘণ্টা হাঁচড়ে পাঁচড়ে পাহাড়ে ওঠার পর দেখি আগে পৌঁছানো দল গানের আসর বসিয়েছে। এদিকে কারো কাছেই পানি নেই এক ফোটা। পাহাড়ি টাম (কাজু বাদাম এর  ফল) ফলের রস খেয়ে সে অভাব মিটল। এরপর পাহাড়ের মাথা থেকে দেখলাম দূরে মাথা উঁচু করে আছে, বাংলাদেশের সব থেকে উচু পর্বত সাকাহাফং ও তাজিংডং ।

সন্ধায় পাহাড়্রারাজি। দেবতা পাহাড়, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

শেষ বিকেলে পাহাড়ের ওপর থেকে যে সূর্যাস্ত দেখেনি সে পাহাড়ের সৌন্দর্যের অর্ধভাগই দেখেনি। দেবতা পাহাড়ের এই অপরূপ শোভা দেখে আমরা সন্ধ্যাকালীন পাহাড়ি বাতাস আর ছাতিফাটা তেষ্টা নিয়ে ফিরলাম থুইসা পাড়া। সে রাতে আমরা পাহাড়ি চাঁদের আলোয় আড্ডা জমালাম শহুরে জোনাকিরা।

চাঁদের পাহাড়। ছবিঃ লেখক

পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা রওনা হয়ে গেলাম হেডম্যান পাড়া হয়ে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে অনর্গল ঘণ্টা চারেকের পথ হেঁটে, পাহাড়, ঝিরিপথের অসাধারণ সব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম নাফাখুম। সেই সুদৃশ্য নহর। প্রাণ জুড়িয়ে আসে ধীরে ধীরে।

ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নিতে মন চায় না কার? দিলাম ঝাঁপ, উবে গেল সব উত্তাপ। সাঁতার কেটে, ঝর্ণায় ভিজে না থাকে ক্ষুধা, তেষ্টা বা বাড়ি ফেরার পায়তারা। মনে হয় আজীবন ঘর বেঁধে থেকে যাই এর পাশে। তবুও ফিরতে হবে। জীবন যে ডাকছে ছুটি শেষ করে ফেরার জন্য।

সাবলীল নাফাখুম। নাফাখুম জলপ্রপাত, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

এর পর আবার ঘণ্টা দুই ট্রেকের পর পর পৌঁছলাম হেডম্যান পাড়ায়। ডিম, ড্রাইকেক, খেজুর আর পাহাড়ি পেঁপে দিয়ে পেটপূর্তি করে ফের এক ঘণ্টা ট্রেকিং করে পৌঁছলাম রেমাক্রি বাজার। জংলি পাহাড় আর নদীর মাঝে এত সুন্দর গ্রাম দেখার সে অনুভূতি প্রকাশ সাধ্য না। এখান থেকে নৌকা নিয়ে একে একে বেরিয়ে পড়লাম থানচির উদ্দেশ্যে।

পথে পড়ল তিন্দু, রাজাপাথর। পুরো ঘোরাঘুরির এই অংশটা অন্যতম রোমাঞ্চের। বিশাল বিশাল পাথরের বোল্ডার পড়ে আছে নদীর জলে। জলের গভীরতা কোথাও এক ফুটের ও কম। তার মধ্যে দিয়েই সাই সাই করে চলছে পাহাড়ি নৌকাগুলো। আর মাঝে মাঝে ক্যানভাসে আকা গ্রামগুলোর মতো পাহাড়ি গ্রামগুলো উঁকি দিচ্ছে শেষ বিকেলের সূর্যের থেকে রঙ ধার করে।

ফেরার যাত্রা। রোমাক্রি, থানচি, বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

তিন ঘণ্টা এসব দৃশ্য দেখে নিয়ে আমরা ফিরলাম থানচিতে। হঠাৎ করে ঝড় বৃষ্টির আগমনে থানচিতে আমরা মেতে উঠলাম বৃষ্টি বিলাসে। খাওয়া দাওয়া শেষে আমরা বান্দরবান ফেরত যেতে চান্দের গাড়িতে উঠে পড়ি। বৃষ্টি হচ্ছিল বাইরে তাই চান্দের গাড়ি ঢেকে দেয়া হয়েছিল। সন্ধ্যা ৬টার পর আর কোনো পর্যটক পরিবহনের চলাচলের অনুমতি না থাকায় মধ্য রাস্তায় বলিপাড়া ক্যাম্পে থেকে যেতে হয় সে রাত।

পরদিন খুব ভোরে উঠেই আমরা তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে ক্যাম্প ত্যাগ করি। এরপর আবার মেঘ কুয়াশার ভেতর দিয়ে অপরূপ সুন্দর বান্দরবান দেখতে দেখতে বান্দরবান সদরে পৌঁছাই। এখান থেকে সকালে খাওয়া শেষ করে আমরা পাহাড় কন্যা বান্দরবান ছেড়ে আসি।

যেভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া: 

ঢাকা থেকে বান্দরবানগামী বাসে উঠে পড়ুন। ভাড়া ৬৫০ টাকা। এবার বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে থানচি। ভাড়া (৭,০০০-৮,০০০) টাকা। থানচি পৌঁছে লোকাল গাইডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পুলিশ ক্যাম্পে নাম উঠিয়ে নেবেন। নৌকা ভাড়া করে পদ্মমুখ ঝিরিতে নেমে ট্রেক শুরু করে আট ঘণ্টা পর পৌঁছবেন থুইসা পাড়া।

থুইসা পাড়া থেকে দেড় ঘণ্টা ট্রেক করলেই খুমের রাজ্যের দেখা পাবেন। থুইসা পাড়া থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা ট্রেকিং করে চলে আসুন নাফাখুম। ফেরার পথে তিন্দু বাজার থেকে নৌকা ঠিক করে থানচি চলে আসুন। এরপর একইভাবে বান্দরবান হয়ে ঢাকা চলে আসুন।সন্ধ্যে ৬টার পরে কেউ থানচি থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বের হবেন না।

সতর্কতা

যেখানেই যাবেন, যেভাবেই যাবেন, সতর্ক থাকবেন আপনার কোনো কাজে যেন প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে না ফেলা হয় সব এক করে পুড়িয়ে ফেলুন বা সাথে করে এনে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রান্সের নিস শহর: ট্রান্সপোর্টার ছবির শ্যুটিং যেখানে করা হয়েছিল

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: স্বপ্নময়ী গন্তব্য মানালি ভ্রমণ