মুর্শিদাবাদ: বাংলার ইতিহাসের এক ঝলক

ইতিহাসকে ইতিহাসের মতো দেখতে হয়, সময় নিয়ে যেতে হয়, থাকতে হয়, বুঝতে হয়, অনুভব করতে হয়। তবেই হয়তো ইতিহাসের সাথে কিছুটা মেশা হয়, ইতিহাসকে কিছুটা জানা হয়। ইতিহাসকে বা ঐতিহাসিক যে কোনো কিছু দেখতে, জানতে, বুঝতে বা উপলব্ধি করতে খুব বড় গবেষক বা ইতিহাসবিদ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। একটু সময় নিয়ে ইতিহাসে চোখ রাখলেই অনেক কিছু দেখতে পাওয়া যায়।
যদি ধীর লয়ে হেঁটে হেঁটে চোখ রাখা যায়, কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনার দেয়ালে, পাথরে, মাটিতে বা মেঠো পথে, তবে ইতিহাসের নানা কিছু আপনার কাছে এসে বসবে, কথা বলবে, নিজেকে জানান দেবে। দেখবেন ঠিক ইতিহাসকে আপনি স্পর্শ করতে পারছেন, দেখতে পারছেন, বুঝতে পারছেন, অনুভব করতে পারছেন।

কাঠগোলা, মুর্শিদাবাদ। ছবিঃ লেখক

কিন্তু আমরা আজকাল এমনভাবে ভ্রমণসূচী ঠিক করে থাকি যে, কত কম সময়ে কত বেশী জায়গা কভার করা যায়, সেদিকেই বেশী মনোযোগী থাকি। আর বিশেষ মনোযোগ থাকে সব লোকেশনে এক বা একাধিক ছবি তুলে বন্ধু মহলে নিজেকে জাহির করার যে কত কত জায়গায় গিয়েছি, সেটা দেখানোর! তাই এসব লোক দেখানো ভ্রমণে গিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনার সাথে ছবি তোলা হলেও, ইতিহাসকে আর জানা, বোঝা বা অনুভব করা হয়ে ওঠে না। সেই সময়ই যে পাওয়া যায় না আজকাল।
আমাদের সর্বশেষ শান্তিনিকেতন, চুরুলিয়া আর মুর্শিদাবাদ ভ্রমণও অনেকটা এমনই ছিল। যদিও এই ভ্রমণের শুরুতে মুর্শিদাবাদ ছিল না তালিকায়। ছিল রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নজরুলের কবি তীর্থ চুরুলিয়া অভিযান। কিন্তু বাবুদার বিশেষ আবদার ফেলতে না পেরে অবশেষে শেষ দিনে দিয়েছিলাম একটি ঝটিকা সফর, আসানসোল থেকে মুর্শিদাবাদ। নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীরজাফর আর জগতশেঠদের জলজ্যান্ত ইতিহাসের নগরী মুর্শিদাবাদ।
আদালত ভবন, মুর্শিদাবাদ। ছবিঃ লেখক

বেশ ঝটিকা একটা অভিযান, কিন্তু তারপরেও একদম না দেখার চেয়ে অল্প হলেও তো দেখা হয়েছে, আর তৈরি হয়েছে একটা অদম্য আগ্রহ কোনো এক সময় বেশ সময় নিয়ে ওইসব ইতিহাসের নানা স্থাপনাকে অনুভব করতে আর একবার যাবার অদম্য ইচ্ছা। আর সেজন্য বা এই আগ্রহ তৈরি করে দেবার জন্য ভ্রমণসঙ্গী বাবুদাকে বিশেষ ধন্যবাদ। কারণ তার অদম্য ইচ্ছা না থাকলে এখানে গিয়ে ইতিহাসের লোভে পড়া হতো না এত সহজে।
বিকেল প্রায় ৫টায় দুর্গাপুর থেকে বাসে রওনা হয়ে, ৫ ঘণ্টার জার্নি শেষে রাত ১০:৩০ এর দিকে মুর্শিদাবাদের মূল শহর বহরমপুরে পৌঁছে, গ্রেভি চিকেনের দুঃখ-কষ্ট বোনাস পেয়ে, রাতে কম দামী একটা হোটেল রুমে গোসল করে ঘুম দিলাম। আগের রাতেই স্টেশনটা দেখে এসেছিলাম রুমে ঢোকার আগেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে, বাইরের স্টল থেকে চা আর বিস্কিট খেয়ে সোজা স্টেশনে। ১০ রুপির টিকেট কেটে বহরমপুর থেকে মুর্শিদাবাদ মাত্র ১৫ মিনিট আর তিনটা স্টেশন। ভাড়াটা বেশ বেশীই মনে হলো! অবশ্য এটাই সর্বনিম্ন ভাড়া বলে আর কিছুই করার নেই।
ট্রেন থেকে নেমে আগে ঐতিহাসিক জায়গা, মুর্শিদাবাদ স্টেশনের স্মৃতিস্বরূপ কিছুক্ষণ ছবি তোলা হলো। তারপর বাইরে বেরিয়ে ১০+১০=২০ রুপির ভাড়ায় একটা রিক্সা নিয়ে হাজারদুয়ারীর গেটে। গিয়েই দুঃসংবাদ! সেদিন শুক্রবার সকল স্থাপনা বন্ধ! শুনেই মাথায় হাত, গার্ডকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম স্থাপনার ভিতরে যাওয়া যাবে না তবে বাগানে ঢুকে দেখতে আর ছবি তুলতে কোনো বাধা নেই। ব্যস, এতেই চলবে আপাতত। একটু ঘুরে ঘুরে বাইরে থেকে দেখে কিছু ছবিই নাহয় তুলে নিয়ে যাই এবারের মতো। তাই বেশ আয়েশ করে কিছু ছবি তুলতে লাগলাম দুজন মিলে।
প্রাচীন ঘড়ি, মুর্শিদাবাদ। ছবিঃ লেখক

এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়াবার সময় আমাদের ছিল না। সময় তখন সকাল ৯টা। ১১:৪০ আমাদের কলকাতা যাবার ট্রেন ধরতে হবে, তাই সময় খুব কম। এই দুই আড়াই ঘণ্টায় যতটুকু সম্ভব ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে নিতে হবে। যে কারণে হাঁটার ইচ্ছা থাকলেও, সময় বাঁচাতে ঝটপট একটা টোটো ভাড়া করে নিলাম ১৫০ রুপি দিয়ে। যেটা আমাদের যতগুলো স্থাপনা সম্ভব ঘুরিয়ে দেখাবে।
একে একে আমরা ঘুরে দেখলাম গোলাপ গার্ডেন, নবাবের বাগান বাড়ি, মীর জাফরের বাড়ি, সমাধি, নবাবের কন্যাদের সমাধিক্ষেত্র, নবাবের পারিবারিক মসজিদ, মীরজাফরের মসজিদ, বিশাল আম বাগান, মাঝে ছুঁয়ে গেলাম ভাগিরথী নদীর পাড়। আরও দেখলাম সে সময়ের রাজাদের নর্তকী নিয়ে নানা রকম কীর্তি কলাপ! সেসব গল্প পরে বলবো, আস্তে-ধীরে, রয়ে-সয়ে আর রসিয়ে রসিয়ে।
এসব একটু করে দেখতে আর স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলতে তুলতেই ১১:৩০ কখন বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। টোটো ড্রাইভারের কাছে ট্রেন ধরবো বলা ছিল তাই সে মনে করিয়ে দেয়াতে এক ছুটে স্টেশন সময় তখন ১১:৩০। ভাবলাম কত না যেন টিকেটের দাম হবে, মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা? গিয়ে দেখি টিকেটের দাম মাত্র ৪০ রুপি, ভ্রমণ সময় ৪-৫ ঘণ্টা। প্যাসেঞ্জার ট্রেন।
নবাবের বাগানবাড়ি। ছবিঃ লেখক

অথচ ভেবেছিলাম বেশ লম্বা পথ বলে হয়তো একটু ভালো গা এলিয়ে দেয়ার মতো ট্রেন হবে। ভালো ক্লাসের একটা টিকেট কাটবো। সেটা আর না হওয়াতে ৪০ রুপি করেই টিকেট কেটে, ঠিক ১১:৪০ স্টেশনে এসে থামা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠে পড়লাম। সিট পেলাম দুজন দু’পাশে।
অল্প সময়ে আর অল্প দেখা হলেও, বাবুদাকে ধন্যবাদ জোর করে হলেও আমাকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে গিয়ে লোভ ধরিয়ে দেয়ার জন্য। কারণ আমি যেভাবে দেখতে চাই সেভাবে না পারলেও, ইতিহাসের অনেক কিছু দেখার, ছোঁয়ার, স্পর্শ করার, অনুভব করার মতো অনুভূতি তিনি তৈরি করে দিয়েছেন। তাই ঠিক করেছি, একবার অন্তত দুইদিন থাকার জন্য হলেও মুর্শিদাবাদ যেতে হবে। ধীরে ধীরে ইতিহাসের অনেক কিছু অনুভব করবো বলে।
যেখানে প্রতিটি ইট, পাথর, খসে পড়া পলেস্তারা, জং ধরা কার্নিশ, ভাঙা বেলকনি, ক্ষয়ে যাওয়া ছাদ সব জায়গায় ইতিহাসের অনেক অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। যারা কথা বলতে চায়, কিন্তু আমাদের ব্যস্ততায় বলার সুযোগ পায় না। তাই এরপর একবার শুধু ওদের ইতিহাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে, শুনতে, বুঝতে, ভাবতে আর স্পর্শ করে অনুভব করতে যাবো, বেশ সময় নিয়ে। যাবই।
বাগানের একাংশ। ছবিঃ লেখক

ফিচার ইমেজ- wikipedia.org

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. এ ধরনের পোষ্ট আমি খুঁজছি। ধন্যবাদ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শিলং, চেরাপুঞ্জি এবং সোনাংপেডেং ভ্রমণ (২৪ জুলাই)

ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ নগরী লন্ডনের যা কিছু অবশ্যই দেখা উচিৎ-(পর্ব ২)