শীতের হিমালয় ও ব্যাকপ্যাকিং চেকলিস্ট

শীতের মৌসুমে আমরা অনেকেই দেশের বাইরে ঘোরার জন্য, ট্রেকিং বা পর্বত আরোহনে গিয়ে থাকি। দেশের কাছাকাছি হিমালয় থাকায় বেশীরভাগ সময়ে হিমালয়ের দিকেই ছুটে যাই। কিন্তু আমাদের দেশের শীতের তাপমাত্রা আর হিমালয়ে শীতের তাপমাত্রার কিন্তু আকাশ পাতাল ব্যবধান। অনেকেই হিমালয়ের শহরগুলোর তাপমাত্রা না জেনেই স্বাভাবিক শীতের পোশাক নিয়ে গিয়ে বিপাকে পড়েন।

আর বাজেট ট্রিপে এই বিপাকে, নিমেষেই শেষ হয়ে যেতে পারে বহু দিনের স্বপ্নের হিমালয় সফর। মাথায় রাখতে হবে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ শীতের থেকেও হিমালয়ের পাহাড় বা গ্রামগুলোতে সারা বছর একটু বেশী শীত থাকে। গ্রাম বা শহরে না হয় একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কিন্তু পাহাড়ে, দূর্গম পরিবেশে গেলে কী করবেন?

হিমালয়ের চেকলিস্ট। ছবি সূত্রঃ Hemalayantrekkers

ভারত, নেপাল, ভুটান দেশগুলো আমাদের দেশের কাছাকাছি। এবং এই দেশগুলো জুড়েই হিমালয়ের অবস্থান। এই অঞ্চলের তাপমাত্রা হুট হাট করেই নেমে যেতে পারে -৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত, বা কিছু সময়ে তারও কম। তাই ট্রেকিং বা ভ্রমণে গেলে অবশ্যই শরীরের প্রত্যেক অংশের জন্য আলাদা করে পোশাকের ব্যবস্থা করেই দেশ ছাড়তে হবে।

যেমন ধরুন, শীতে আমরা যে পোশাক পরে থাকি সেগুলো বাংলাদেশী আবহাওয়ার জন্য তৈরি হয়। তাই সর্বোচ্চ ৪-৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আমরা সাবলীল অনুভব করি। কিন্তু হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যন্ত নেমে যায় বলেই ওই অঞ্চলের মানুষের শীত পোশাক আলাদা হয়ে থাকে। পা থেকে মাথা অব্দি এই পোশাকগুলো, একটু সচেতন হয়ে সাথে রাখলেই আপনার ভ্রমণ হতে পারে নিশ্চিন্ত।

পায়ের যত্নে:

কী ধরনের জুতো আপনার প্রয়োজন তা নির্ভর করবে, আপনি কোনো রিল্যাক্স ট্রিপে যাচ্ছেন নাকি ট্রেকিং বা ক্লাইম্বিংয়ে যাচ্ছেন। ট্রেকিংয়ে গেলে অবশ্যই আপনাকে বি বা সি টাইপ ট্রেকিং বুট সাথে নিয়ে যেতে হবে এবং সাথে মোটা উলের দুই জোড়া মোজা। যা অবশ্যই স্নো ও ওয়াটার প্রুফ হতে হবে। তাহলে প্রচন্ড ঠাণ্ডায় এগুলো আপনার পা গরম রাখবে।

অন্যদিকে রিল্যাক্স ট্রিপে গেলে মোটা লেয়ারের স্নিকার জুতা নিয়ে যেতে পারেন সাথে উলের মোজা অথবা ইনার মোজা দুই জোড়া করে সাথে নিলে ভালো হয়। দুই জোড়া মোজা সব সময় আপনার বাড়তি নিরাপত্তার কাজে দেবে। কোনো কারণে ভিজে গেলে বা অতিরিক্ত নোংরা হয়ে গেলে অন্য মোজা জোড়া ব্যবহার করতে পারবেন।

 পায়ের যত্নে বুট। ছবিসূত্রঃ Dethaclon.in

ডাউন ক্লথিং:

সাধারণ ট্রিপে একটি বেইস লেয়ার, সাধারণ কোনো ইনার ও অন্যান্য বাতাস প্রতিরোধী প্যান্ট নিয়ে যাবেন। কিন্তু ট্রেকিংয়ের জন্য আপনাকে অত্যধিক সতর্ক থাকতে হবে। কম পক্ষে ২-৩টি ভিন্ন লেয়ার অবশ্যই আপনাকে নিয়ে যেতে হবে। প্রথম লেয়ার হিসেবে সিনথেটিক বেইস লেয়ার, তার উপর ফ্লপি, কম ওজনের কোনো ট্রাউজার এবং সর্বশেষ উইন্ড ব্রেকার।

উইন্ড ব্রেকার মূলত তীব্র শীতল বাতাস প্রতিরোধের জন্য কাজে দেবে। কেনার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে সেটি যেন ওয়াটার ও স্নো প্রুফ হয়। আপনার ট্রেকিং রুটে যদি অতিরিক্ত বরফপাতের সম্ভাবনা থাকে তাহলে হাঁটু পর্যন্ত বরফ রোধী স্নোগার্ড নিতে ভুলবেন না। হাইপোথার্মিয়া এড়াতে অবশ্যই সবগুলো লেয়ারের ব্যবস্থা করেই ট্রেকিংয়ে বের হতে হবে।

ডাউন ক্লথিং। ছবিসূত্রঃ takemetohimalaya.com

আপার ক্লথিং:

সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ চেকলিস্ট থাকবে এই অংশে। আপার ক্লথিংয়ের লেয়ার আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে ৫-৬ বা তার বেশী লেয়ারও হতে পারে। তবে সাধারণত যে লেয়ারগুলো অবশ্যই নিতে হবে তার প্রথমেই আসে থার্মাল। থার্মাল মূলত এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যা আপনার শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে এবং শরীরের তাপমাত্রাকে বাইরে বের হতে দেয় না।

থার্মাল ব্রিদেবল হওয়ায় ভেতরে উৎপন্ন ঘাম বাষ্পাকারে বাইরে বের হয়ে আসে। এর পর ফ্লিস জ্যাকেট বা সহজে বলা যায় উলের হালকা পাতলা সোয়েটার। ট্রেকিংয়ে যাবার সময়, ওজন সব থেকে বড় বিষয়- যেখানে সব কিছু আপনাকেই বহন করতে হবে।

লেয়ার ক্লথিং। ছবি সূত্রঃ The Himalayan Club

তাই যত কম ওজনের পোশাক সাথে নিতে পারবেন ততই সুবিধা পাবেন। এরপরের লেয়ার হিসেবে থাকে ডাউন জ্যাকেট বা ফেদার জ্যাকেট। ফেদার জ্যাকেট মূলত পাখির বড় পালক দিয়ে তৈরি তাই দেখতে বেশ মোটা এবং ওজনে হালকা হয়। অপরদিকে ডাউন জ্যাকেটগুলো ছোট ছোট পালকের তৈরি বলে আয়তনে খুবই ছোট, ওজনে হালকা ও ফেদারের তুলনায় বেশী শীত সহ্য করতে পারে।

তবে কিছু কিছু ডাউন জ্যাকেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, কোন ডাউন কত ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা নিতে পারবে তা উল্লেখ করে বিক্রয় করে। তাই প্রয়োজন মতো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ডাউন বা ফেদার কেনাকাটা করতে সুবিধা হয়।

হাতের যত্নে থার্মালগ্লাভস। ছবিসূত্রঃ Marmot

ট্রেকিংয়ে হাতের যত্নে দরকার ভালো গ্রিপ যুক্ত থার্মাল হাতমোজা। স্নো ও ওয়াটার প্রুফ হাতমোজা আপনার হাতকে রক্ষা করবে তীব্র ঠাণ্ডা থেকে ও ট্রেকিং পোলের ভালো গ্রিপের জন্য সাহায্য করবে। রিল্যাক্স ট্রিপের চেকলিস্ট এখানেই শেষ হলেও ট্রেকিং ট্রিপের এখনো কিছু লেয়ার বাকি।

হিমালয়ের পাহাড়ে হুট করেই নেমে আসতে পারে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। এর জন্য সাথে একটি ফ্লপি জ্যাকেট সাথে রাখতে পারেন। যেগুলোর উপরে আবার উইন্ড ব্রেকার ও বৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকলেও একটা পঞ্চো রাখতে পারেন জরুরী মুহূর্তের জন্য।

ব্যাকপ্যাক, টুপি ও অনান্য:

ট্রেকিংয়ে গেলে অবশ্যই টেকনিক্যাল ব্যাকপ্যাক নিয়ে যাবেন এবং ট্রেকিংয়ের ডিউরেশন অনুযায়ী কত লিটারের ব্যাকপ্যাক প্রয়োজন সেটা মাথায় রেখে ব্যাকপ্যাক বাছাই করবেন। অযথা বিশাল বড় বা একদম ছোট ব্যাকপ্যাক নিলে ট্রেকিংয়ের ব্যাঘাত ঘটবে।

মাথার জন্য উলের কান টুপি ও সান ক্যাপ রাখবেন। অতিরিক্ত বাতাসের জন্য ব্যালাক্লাভা রাখতে পারেন। অতি উচ্চতায় কান এবং নাক যত কম ঢেকে ট্রেকিং করতে পারবেন তত দ্রুত এক্লিমাটাইজ হতে পারবেন।

প্রয়োজনীয় টুপি। ছবিসূত্রঃ Rahul Bharma

অতিরিক্ত কোনো কিছুই ট্রেকিংয়ের সময় বহন করবেন না। এছাড়া সাথে নিজস্ব মেডিসিন, অতিবেগুনী রশ্মি থেকে চোখ রক্ষার জন্য পোলারয়েড সানগ্লাস, সূর্যের প্রখর রোদ থেকে চামড়ার সুরক্ষায় সানস্ক্রিন সাথে রাখবেন।

যেখানে ট্রেকিংয়ে যাবেন আগে থেকে জেনে শুনে যাওয়ার চেষ্টা করবেন দিনে ও রাতে সেখানকার তাপমাত্রা কেমন থাকতে পারে। জেনে বুঝে স্লিপিং ব্যাগ, স্লিপিং ম্যাট ও তাবু সংগ্রহ করুন।

লোডিং আর আগে ব্যাগেরম্যাপিং। ছবিসূত্রঃ Marmot

শীত অল্প হলে বিশাল পুরু কোনো স্লিপিং ব্যাগ নেয়া অযথা হবে বা সাধারণ কোনো স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে যাবার পর অতিরিক্ত তাপমাত্রা নেমে গেলে জীবনের ঝুঁকিতে পড়তে হবে। তাই আবহাওয়া জেনে বুঝে এগুলো সংগ্রহ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এছাড়া ট্রেকিং পোল, হেড ল্যাম্প, ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, পাওয়ার ব্যাংক ও অন্যান্য দরকারি জিনিস নিজের মতো করে গুছিয়ে নেবেন।

যে সকল বিষয়ে সতর্ক থাকবেন:

প্রচণ্ড শীতে অনেকের ধারণা থাকে অ্যালকোহল তাদের শরীর গরম করবে। কিন্তু এটা ভুল ধারণা। ট্রেকিংয়ের সময় যখন আপনি বন্য পরিবেশে অবস্থান করছেন তখন অ্যালকোহল গ্রহণ আপনার শরীরের ভেতরের অংশে উষ্ণতার সংকেত দেয় মাত্র। কিন্তু বাইরে তাপমাত্রা তখন একই রকম থাকে।

কিছু সময়ের জন্য শরীরে বেশী উষ্ণতা অনুভব করে যখন একের পর এক লেয়ার খুলতে থাকবেন তত দ্রুত ঠাণ্ডা আপনাকে কাবু করে ফেলবে। অসতর্ক হবেন না পোশাকের ব্যাপারে। বরফে বা পানিতে কোনো লেয়ার ভিজে গেলে দ্রুত পরিবর্তন করে ফেলার চেষ্টা করুন। তাবুর ভেতর বিশ্রামের জন্য সব সময় স্লিপিং ম্যাট ব্যবহার করুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুই দিন এক রাতের ছোট ট্রিপে ঘুরে আসুন হাওরের রানী অষ্টগ্রামে

প্রসঙ্গ, ট্রেকিং বুট ও প্রকারভেদ বিষয়ক