একটি শুকনা মরিচ ১০ টাকা! একটি পেঁয়াজ ২০ টাকা!

শেরকর পাড়ায় পৌঁছে গ্রুপের প্রত্যেকেই ক্ষুধায় কাতর। কারবারিকে জিজ্ঞাসা করা হলো রাতে খাবারের কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা? তিনি জানালেন যে জুম চালের ভাত আর পাহাড়ি মুরগী হবে পেঁপে দিয়ে! সবাই উল্লাসে ফেটে পড়লো মুরগীর কথা শোনা মাত্র! তখনো কেউ জানি না যে এখানেও অপেক্ষা করছে কী ভীষণ আক্ষেপ আর বিভীষিকা! অথচ সেই মুরগীর মাংস আর জুম চালের ভাতের আশা ও স্বপ্নে সবার পেটে পাথর বেঁধে রাখা ক্ষুধার সাময়িক সংযম। খুশিতে সবাই রাতের তারা ভরা আকাশ আর হিম হিম ঠাণ্ডা বাতাস উপভোগ করতে চলে গেলাম, আরও একটু উপরে স্কুল ঘরের বারান্দায়।

ফিরে এলাম ঘণ্টাকাল কাটিয়ে সেই মায়াবী আর মোহাচ্ছন্ন নিশ্চুপতা ভেঙে, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম, সবাই গোল হয়ে, কারবারির টং ঘরে। উপরে ঝকঝকে তারা ভরা আকাশ, নিচে পশুদের আবাস ও হাঁক-ডাক, বিভিন্ন উৎকট শব্দ ও গন্ধ মাঝখানে আমরা ক্ষুধা নিবারণে মত্ত।

শেরকর পাড়া থেকে। ছবিঃ লেখক

এলো সেই কাঙ্ক্ষিত পাহাড়ি মুরগীর মাংস পেঁপে দিয়ে রান্না করা! জুম চালের ছোট ছোট লাল ভাত, সবাই যে যার প্লেটে ভাত তুলে মাংস নেবার প্রতিযোগিতা শুরু করলাম, কিন্তু মুখে দিয়ে দেখা গেল, কেউই আর ভাত চিবাচ্ছে না, গিলে ফেলা তো দূরের কথা! সবাই চুপ করে বসে আছে যে যার মতোন! কেন, কারণ কী? আসলে, মুরগী জবাই করার পরে কোনো রকমে পশমগুলো ছাড়িয়ে (বোধহয় ধোয়ওনি!) শুধু মাত্র হালকা লবণ আর পেঁপে দিয়ে সেদ্ধ করে দিয়েছে!

ওতে না ছিল তেল-পেঁয়াজ-মশলা, না ছিল মরিচ! শুধুই লবণ দিয়ে সেদ্ধ করা! এরপর কার কী অবস্থা হতে পারে, আশা করছি কারোই বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়! কিন্তু খেতে তো হবেই, কোনো উপায় নেই না খেয়ে সারা রাত শুয়ে থেকে সকালে তাজিংডংয়ের চূড়ায় ওঠার।

এইবার শুরু আমার খেলা… সবাইকে বহু বহু বার বলা সত্ত্বেও কেউ তার নিজের মতো করে রসদ নিয়ে না আশার মজা নেব আর শোধ তুলবো আমার পানি শেষ করে ফেলার, সারাটা রাস্তা জুড়ে গালাগাল দেবার আর মানসিক যন্ত্রণা দেবার! কীভাবে? বলছি।

এইবার আমি আমার ব্যাগ থেকে প্রথমে শুকনো মরিচ বের করে কুপির আগুনে পুড়িয়ে ভাতের সাথে মেখে মহা আনন্দে খেতে শুরু করলাম, তখন ওটাই পৃথিবীর সব চেয়ে লোভনীয় খাবার, অন্তত আমাদের কাছে! এবার সবাই মরিচ চাইতে লাগলো, আমার এক কথা কাউকে দেব না, সবাইকে বলেছিলাম, কেউ কেন আননি?

কিন্তু তখন মরিচ ওদের চাই-ই চাই! যে কোনো কিছুর বিনিময়ে! সুতরাং আমি দাম নির্ধারণ করলাম, একটা শুকনা মরিচ ১০ টাকা! এবং একদম নগদ পেমেন্ট! হ্যাঁ তাই-ই করেছিলাম! আর সেই সময় ভাতের ক্ষুধার যন্ত্রণা আর ভাতের নেশায় সবাই ওতেই রাজি! ব্যস আমি ব্যবসার ভালো উপায় পেয়ে গেলাম!

আহা শুকনো মরিচের অমৃত! ছবিঃ i.ytimg.com

এরপর বের করলাম পেঁয়াজ! সে তো তখন ভরা জ্যোৎস্নায় ঝুম বৃষ্টির মতো অসম্ভব ও কাঙ্ক্ষিত! সবাই নেবে যে কোনো মূল্যে! সুতরাং দাম নির্ধারণ করলাম একটি পেঁয়াজ ২০ টাকা মাত্র! এবং এখানেও সবাই ওতেই রাজি! এবং কারো কোনো অভিযোগও ছিল না কারণ সবাইকে বার-বার বলা সত্ত্বেও কেউ গুরুত্ব দেয়নি এতটুকুও! যে কারণে সবার কাছে সেই শুকনো মরিচ আর পিঁয়াজ বিক্রি করেই আমার ট্যুরের টাকার অনেকটাই উঠে গিয়েছিল! আহা, কী যে আনন্দ হয়েছিল শুকনা মরিচ আর পেঁয়াজ বিক্রি করে নগদ টাকা পেয়ে, সেটা বলে বোঝানোর মতো নয় আদৌ।

তারপরও সবাই ওই মরিচ আর পেয়াজের গুণে ভরপেট খেয়ে ঘুমোতে গিয়েছিলাম পরের দিনের তাজিংডং জয়ের আনন্দ নিয়ে অবশ্যই আরও কিছুক্ষণ রাতের আকাশের সাথে গল্প করে আর শিশির মেশানো হিমেল বাতাসের পরশ গায়ে মেখে।  

ট্রেকিং এ কাঁচা পেয়াজের আনন্দ! ছবিঃ samakal.com

কিন্তু, কিন্তু ঘুম তো আর আসে না। এত এত ক্লান্ত শরীরেও কেন ঘুম আসে না কারো? সেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল রাতে কেউই ঠিকঠাক ঘুমোতে পারছে না। আর এর অন্যতম কারণ হলো, দিনের চরম গরমের মতো করেই রাতে ঠিক উল্টো কনকনে হাড় কাঁপানো শীত, তার চেয়েও বড় কথা ছিল, যে টং ঘরে ছিলাম সেটির উপরে-নিচে এবং অন্যান্য চারপাশে অনেক ফাঁকা থাকায় অসভ্য আর নির্দয় বাতাসেরা অহর্নিশ ঢুকে পড়ে আমাদের কাঁথার উপর থেকেই তার ছোবল দিচ্ছিল। সেই সাথে ছিল, ছাগল-ভেড়া-শুকর ও হাঁস-মুরগীর ঘ্যনঘ্যানানি আর প্যানপ্যানানির উৎকট গন্ধ ও বিকট সব শব্দ। সুতরাং রাত সেও এক অভিশাপ!

রাতে তো কোনো রকমে তবুও গলা দিয়ে খাবার ঢুকেছিল সবার, না দেখে অন্ধকারে খেয়েছে বলে, কিন্তু সকালে? সকালে সেই খাবার খেতে গিয়ে দেখা গেল, আগের রাতের মুরগী আসলে না ধুয়েই সেদ্ধ করে দিয়েছিল! যেটা রাতে বোঝা গিয়েছিল কিন্তু অন্ধকারে দেখা তো যায়নি! আর তা হলো, মুরগীর মাংসের সাথে তার চামড়া বা পশম তেমনই লেপটে ছিল! সাথে অন্যান্য ত্যাজ্য উপাদানও! যা দেখে কেউই তার পেটের খাবার শত চেষ্টায়ও আর পেটে ধরে রাখতে পারিনি! উগড়েই দিতে বাধ্য হয়েছিলাম!

ওই দেখা যায় তাজিংডং! ছবিঃ লেখক

তখন সবাই আমার শুকনা মরিচ আর পিয়াজের অমৃতের কথা বলতে লাগলো, না হলেও এই সকালের মতো রাতেও যে অভুক্ত থাকতে হতো! আর সেই কষ্টে দুই-একটা উইকেটও পড়ে যেত কিনা কে জানে?

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রেয়সীর কাছে অনুযোগের চিঠি

নবাবগঞ্জের বনেদিয়ানায় উত্তপ্ত দুপুরে ভ্রমসি