হিমালয়ে লুকানো অনন্য গ্রাম: তোশের গল্প

হিমালয়ে পাহাড়ের আড়ালে লুকানো গ্রামগুলো এক অনন্য বিস্ময়। শত শত বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে পাহাড়ের অনেক গহীনে লুকানো এসব গ্রামের মধ্যে তোশ একটি। হিমাচলে প্রদেশের কুল্লু ডিস্ট্রিকের ক্যাসোল থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরেই এই গ্রামটি রহস্যের অন্য নাম। সুবিশাল পাহাড় পর্বতে ঘেরা এই গ্রামটিতে আমার ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল একবার।

ক্যাসোলে রেস্টের একটি দিনে একা দল ছাড়া হয়ে তোশ ঘুরতে চলে যাই পার্বতী ভ্যালির গভীরে। দূরত্ব কম হলেও খুব কম সংখ্যক গাড়ি তোশের দিকে যায় ক্যাসোল থেকে। তাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমি গাড়িতে চেপে বসি মানিকারানের উদ্দেশ্যে। ক্যাসোল থেকে আট কিলোমিটার দূরে মানিকারান পৌঁছে থমকে যাই মানিকারানের রূপ দেখে। তবুও সামনে পথ বাকি বলেই বেশীক্ষণ থাকতে পারলাম না।

চলতি পথে ঘোড়ার পাল। তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ জান্নতুল উর্মি 

বেশ ভালো রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ করেই রাস্তার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল। খুব বাজেভাবে রাস্তার পাশ দিয়ে নেমে গেছে হাজার ফিট খাঁদ। প্রথমবার হিমালয়ের এই রাস্তায় চলতে গেলে বুকে কাঁপুনি দেবে যে কারো। রাস্তার পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজের গালিচায় ঘেরা আকাশ ছোঁয়া পাহাড়।

আর মাঝে মাঝেই রাস্তার নিচে নদীর ওপাশে বিশাল আকৃতির ঝর্ণাগুলো আছড়ে পড়ছে নদীর অতলে পাথরগুলোর উপর। বুকে ভয় থাকলেও এই পাহাড়, আকাশ, নদী আর ঝর্ণার বন্য শব্দে বয়ে চলার অনুভূতিগুলো দিয়ে যাচ্ছিলো আরো গহীনে যাবার সাহস।

সবুজের গালিচা। তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ জান্নতুল উর্মি 

ঘণ্টা দুয়েক পর তোশের কাছে একটা কাঠের ব্রিজের কাছে নেমে পড়লাম। ব্রিজের নিচে তীব্র শব্দে বয়ে চলেছে পার্বতি নদী। আর ঝুলন্ত ব্রিজটার ওপাশেই পাহাড়ের গায়ে জায়গা দখল করে আছে তোশ গ্রামটি। বর্ষার সবুজ পাহাড়ের মধ্যে এই গ্রামের রূপ দেখলে মন ভরে যায় প্রতিটি মুহূর্তে। হাঁটতে হাঁটতে গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে সুবিশাল পর্বতমালা যেন আগলে রেখেছে গ্রামটিকে।

দূরের কালো রঙের পাথুরে পাহাড়গুলোতে বরফ নেই বললেই চলে। গ্রামের মানুষ ছুটে চলেছে কাজের জন্য। ভোর সকালে কিছু খেয়ে না আসায় খিদে লেগে গেল। একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে মোমো অর্ডার করে বারান্দায় বসেই দেখতে লাগলাম খোলা আকাশের নিচে সবুজ পার্বতি ভ্যালির এই সুন্দর গ্রামটি।

বিশাল গ্লেশিয়ারের মায়া। তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ জান্নতুল উর্মি 

চারদিকে অসংখ্য পর্বত আর গ্লেসিয়ার দেখা যায় এই গ্রাম থেকে। তোশ গ্রামটি ২,৪০০ মিটার অর্থাৎ ৭,৯০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। এর চারদিকে বেশ কিছু গ্লেসিয়ারের মধ্যে পাপাসুরা, হোয়াইট সালি, দেভাচান উল্লেখযোগ্য। গ্রাম থেকে বিশাল পর্বতের এই গ্লেসিয়ারগুলো আগেই দৃষ্টি কাড়বে সবার। তোশ নদীটি পার্বতি নদীর সাথে এই গ্রামের পাশেই মিলিত হয়েছে বলে উত্তাল নদীর সৃষ্টি হয়েছে এখানে।

একটু দূরেই গান বাজনা শোনা যাচ্ছিল। তোশে হিমালয়ান জীবন যাপনের স্বাদ নিতে অনেকেই ছুটে আসেন পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে। অনেকে বসে হুক্কো সাজেন, পাশে বসে কেউ নাম না জানা বাদ্য যন্ত্রে সুর তুলছেন আবার আনমনে কেউ গান গেয়ে চলেছেন যে সুর পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে গ্রামে। এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি।

তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

গ্রামের আনাচে কানাচের ঘরগুলো কাঠ আর পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি। অনেক মানুষ কৃষি কাজ করেন, অনেকেই আবার হোটেল ব্যবসার সাথে জড়িত। তবে বেশীর ভাগ মধ্যবিত্ত লোকেরা গরুর দুধের পনিরের ব্যবসা করে জীবন চালান এই কঠিন পরিবেশে।

এখানে বেশ কিছু ধূমপানের আলাদা জায়গা রয়েছে, এছাড়া হোটেল, রেস্টুরেন্ট আর হোমস্টে চোখে পড়ল বেশ কিছু। বুঝলাম ইচ্ছে করলে বেশ কম খরচে থাকা যায় সুন্দর এই গ্রামটিতে। হাঁটতে হাঁটতে কিছু মন্দির চোখে পড়ল। মানিকারানের মন্দিরগুলোর মতোই সুন্দর কাঠের কাজগুলো যেন উজ্জ্বল হয়ে আছে সবুজ পাহাড়ের মাঝে।

শিব মন্দির। তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের উপরের দিকে চলে এলাম। একটি দলের কন্ঠে পিংক ফ্লয়েডের গানের শব্দ খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম বিশাল এক পাইন গাছের নিচে জমেছে গানের আসর। হিন্দি বা ইংরেজিতে ভালো একটা ধাতস্ত হয়ে পারিনি তখনো। তাই পাশে বসে গান শুনে ফেরত এলাম নিচের দিকে। অন্য পথে ফেরায় সুন্দর একটা ঝর্ণা চোখে পড়ল। ক্ষীরগঙ্গা নাম মনে হয় ঝর্ণাটার।

পাশেই মোটা মোটা পাইন গাছের সারির মধ্যে নিজেকে একা আর বন্য মনে হচ্ছিল। কয়েক মুহূর্তের এই অনুভূতি যেন পৃথিবীর সব সুখের সমান লাগছিল। ঝির ঝির করে বয়ে চলা শীতল বাতাস রক্ত প্রবাহে তীব্র বন্যতা আর নিস্তব্ধতার শিহরণ দিয়ে যাচ্ছিল। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে এসেছে হিমালয়ের গভীরে এই গ্রামে।

মেঘ ভিড় করে পাহাড়ের বনে। তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ জান্নতুল উর্মি 

মেঘে ঢেকে আসতে শুরু করলে আমি পাইন বন থেকে বের হয়ে গ্রামের দিকে ফিরে আসি। শিরশির করতে থাকা শরীরে তখন আলোর ছোঁয়া পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠলাম। পাহাড়ের পাশে ঘাসের গালিচায় একা বসে বসে বিশাল পর্বতের সারি দেখতে দেখতে কখন সময় পেরিয়ে গিয়েছে জানি না।

নামতে নামচে চোখে পড়ল স্থানীয়দের অনেকেই গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে, দর্শনার্থীরা এদিক সেদিক ঘুরছে, ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা শীতে লাল হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে খেলায় মত্ত।

তোষ নদী। তোশ, কুল্লু , হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক 

আর টিপ টিপ করে বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে। থেকে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো কিন্তু পুরো দল তখন ক্যাসোলে অপেক্ষা করছে। সারাদিন একা একা ঘুরে আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। গ্রাম থেকে নেমে কাঠের ব্রিজ পার হয়ে আমি গাড়িতে উঠে বসলাম। পেছনে পড়ে রইল গান বাজনা, খাবার, কর্ম ব্যস্ত হিমালয়ের লুকোনো সুন্দর গ্রামটি।

রুট ও খরচের খসড়া

কলকাতা থেকে ট্রেনে যেতে হবে পাঞ্জাবের জালান্দার সিটি অথবা চন্ডিগড়। ট্রেনে খরচ পড়বে শ্রেণী ভেদে ৬৭৫ থেকে ৩,২০০ রূপি। এই জায়গাগুলো থেকে পেয়ে যাবেন ক্যাসোল বা মানিকারানগামী বাস বা ট্যাক্সি। বাস ভাড়া ৪৫০-১,০০০ রূপি, ট্যাক্সি ভাড়া ৮,০০০-১০,০০০ রূপি।

ক্যাসোল থেকে তোশ যেতে হলে  ট্যাক্সি ভাড়া করে যেতে হবে। শেয়ারে গেলে ৬০০ রুপি দরকার হবে যাওয়া ও আসা সহ, আর পুরো ক্যাব ভাড়া করে গেলে পড়বে যাওয়া আসা ৬,০০০ রুপি।  খাবার খরচ বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য প্রতিদিন ৪০০ রূপি। হোটেলের ভাড়া গড়ে ৩০০ – ১,০০০ রূপি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উত্তাল সমুদ্রে সেন্ট মার্টিন

নুব্রাভ্যালী ও ক্যামেল সাফারির গল্প… (পার্পল ড্রিম-৩৫)