সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম নিরিবিলি পিকনিক স্পট

পৃথিবী জুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাকৃতিক ও মনুষ্য নির্মিত দর্শনীয় স্থান। যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সেখানকার মানুষ চায় মনুষ্য নির্মিত সৌন্দর্য উপভোগ করতে আর যেখানে এই সৌন্দর্য রয়েছে সেখানকার মানুষ চায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে যেতে। এটিই মানুষের সাধারণ ধর্ম। সহজলভ্য জিনিসের মূল্য তার কাছে সবসময় সস্তা, হোক তা অপরের কাছে মূল্যবান।

নড়াইল একটি ছোট শহর আর লোহাগড়া তার একটি থানা। সবুজ শ্যামলে ঘেরা এখানকার পথ-ঘাট, নেই কোনো যানজট, নেই কোনো কোলাহল, দিগন্ত জুড়ে ফসলের মাঠ। অন্যান্য শহর থেকে একে এভাবেই আলাদা করা যায়। নড়াইলের মানুষ সারাক্ষণ প্রকৃতির মাঝে ডুবে থাকে, তাই তাদের বিনোদনের জন্য প্রয়োজন হয় মনুষ্য সৃষ্ট মাধ্যমের।

নড়াইল শহর থেকে ১০-১২ কি মি দূরে রয়েছে একটি পার্ক, যা নড়াইলের মানুষের বিনোদনের একটি সর্ব স্বীকৃত মাধ্যম। পার্কটির নাম, নিরিবিলি পিকনিক স্পট। বছরের সব সময়েই এখানে থাকে মানুষের ঢল। তবে শীতকালে ভিড় একটু বেশি থাকে। কারণ, এই সময়ে আশেপাশের জেলা থেকেও অনেক মানুষ এখানে আসে শান্তিতে একটু সময় কাটাতে।

আমি তখন নড়াইলে থাকি। ঘোরাঘুরির পোকাটা তখনও আমার মাথায় বিড় বিড় করে। আর যদি কেউ খুঁচিয়ে দেয় তবে তো কথাই নেই; গিজ গিজ করা শুরু করে। সেদিনও এমন পরিস্থিতি হয়েছিল, বন্ধু অমিতাভ এসেছে ঘুরতে কিন্তু ঘুরতে এসে ঘরে বসে থাকা লোক সে নয়।

তাই দুজনে মিলে প্লান করলাম, কাছের নিরিবিলি পিকনিক স্পটে ঘুরতে যাব। বেরিয়ে পড়লাম ভোর ছয়টায়। আজকে বিগত দিনের ন্যায় ঘুম থেকে উঠতে আর দেরি হলো না। কারণ, সারা রাত জেগে জেগে দুজনে মিলে দর্শনের ঝড় তুলেছি। ভাগ্যিস, ঘরের ছাউনি মজবুত ছিলো! তা না হলে নিশ্চয় সব উড়ে যেত।

বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠে একবারে পার্কের সামনে গিয়ে নামলাম। এখানে কিছু দোকান আছে, সেখান থেকে কিছু খাবার কিনে নিলাম। এই ব্যাপারে অমিতাভ অরণ্য খুবই সচেতন। ভেতরে গিয়ে যদি খাবার না পায়! খাবার নিয়ে তার এমন সিরিয়াসনেসের কারণে মাঝে মাঝেই আমি বলে থাকি, আমি পাণ্ডব পুত্র ভীমকে দেখিনি তবে আমার বন্ধু অমিতাভকে দেখেছি।

পার্কের প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা, কমই আছে। দেরি না করে দুজনে ঢুকে পড়লাম। ঢুকে দেখি চারদিকে কোনো জনমানব নেই, পুরো পার্ক ফাঁকা। পুকুরের পাড় ধরে হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম পার্কের পশ্চিম কর্নারে। এখানে রয়েছে বাগানের পরিবেশ, রয়েছে বিভিন্ন প্রকার গাছ।

যেমন, আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারী, লেবু, মেহগুনি, রবার, পান্থমাধব প্রভৃতি। নিরিবিলির পরিবেশটা যে এতটা নিরিবিলি পাব, ভাবতে পারিনি। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। শুকনো পাতায় ছেয়ে আছে গাছতলা। তার মধ্যে মাঝে মাঝে দু-একটা কাঠবিড়ালির দৌড়াদৌড়ি দেখা যাচ্ছে।

এমন নির্মল পরিবেশ পেয়ে অমিতাভ আর আমি দুজনেই অনেক অভিভূত হয়েছিলাম। সাথে গিটার ছিল তাই পাখির সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে শুরু করলাম সুখের গান। দুই-তিনটা গান শেষ করতেই কিছু লোক এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো। আমরা তাদের চিনি না, তবে এটা বুঝতে পারছিলাম যে, তারা আমাদেরই মতো মন খুলে গাইতে ভালোবাসে। ঘণ্টাখানিক এভাবেই চলতে থাকে। এতক্ষণে ছোটখাটো একটা কনসার্ট হয়ে গেছে বলতে পারেন।

গানের আড্ডায় সেলফি

আস্তে আস্তে লোকজন বাড়তে শুরু করেছে আর সূর্যটাও বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে তাই আমরা পার্কের অন্যান্য আয়োজন ঘুরে দেখার জন্য উঠে পড়লাম। এতক্ষণ যাদের সাথে গান ধরেছিলাম তাদেরই মধ্যে থেকে একজন আমাদের সঙ্গ দিল। তিনি কোনো দর্শনার্থী নয়, এখানকারই লোক। তার বাবা এখানকার কিছু রাইড লিজ নিয়েছে।

সাথে যখন রাইড মালিক রয়েছে, এখন কী হবে সেটা নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন। হ্যাঁ, ঠিক তাই, কোনো রাইডই বাদ দিলাম না। কথায় আছে, বাঙালি ফ্রি পেলে আলকাতরাও খায়। নৌকা, নাগরদোলা, মিনিট্রেন ছাড়াও বেশ কিছু রাইডে চড়েছিলাম আমরা।

এটা বেশ মজার ছিল; Source: অমিতাভ অরন্য

রাইড চড়ার সময় একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা যখন মিনিট্রেনে চড়ে মামদো ভূতের আস্তানায় প্রবেশ করি, তখন অমিতাভ ভয় না পেয়ে হা হা করে হেসেছিল আর তার এই হাসি শুনেই বাচ্চারা ভয় পাচ্ছিল সাথে আমিও। অবশ্য, আমি ওকে সব সময়ই ভয় পাই!

এটাও বাদ দিলাম না; Source: অমিতাভ অরণ্য

পার্কের পূর্ব পাশে রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা। এখানে কিছু পশু-পাখি রয়েছে। উত্তর পাশে রয়েছে ক্রিস্টমাস ট্রি আর ঝাউ গাছে সমৃদ্ধ ওইপেন গাছের বেড়ায় ঘেরা ফুলের বাগান। এখানে গোলাপ, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস, লিলি, গ্লোবল, রজনীগন্ধা, সূর্যমুখী ফুলের সমারোহে মনোরম এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

এছাড়াও নিরিবিলি পার্কে রয়েছে বিভিন্ন মূর্তি, ম্যাজিশিয়ান, রাত্রিযাপন করার জন্য রিসোর্ট, ক্যান্টিন, মিনি চিড়িয়াখানার পিছনের দিকে রয়েছে পিকনিক স্পট।

রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি; Offroad Bangladesh

সব মিলিয়ে এটি সুস্থ বিনোদনের একটি আদর্শ মাধ্যম। আপনিও ঘুরে আসতে পারেন আপনার পরিবার বা বন্ধুবান্ধবদের সাথে নিয়ে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে নড়াইলের বিভিন্ন গাড়ি পাওয়া যায় যেমন, হানিফ, ঈগল, একে ট্রাভেলস, ভাড়া পড়বে ৫৫০-১,২০০ টাকা। ঢাকা থেকে আসা গাড়িগুলো পার্কের সামনে দিয়েই নড়াইল আসে। সুতরাং আপনি লক্ষিপাশা নামতে পারেন। ওখান থেকে ইজি বাইকে করে নিরিবিলি পার্কের সামনে এসে নামা যায়, ভাড়া ৫ টাকা।

কোথায় থাকবেন

লক্ষিপাশা বাজারে কিছু নিম্ন মানের হোটেল রয়েছে চাইলে ওখানেই থাকতে পারেন। আর ভালো চাইলে সরাসরি নিরিবিলি রিসোর্টে থাকতে পারবেন। এছাড়াও নড়াইল মূল শহরে চিত্রা নদীর পাড়ে রয়েছে চিত্রা রিসোর্ট।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশালতার সন্ধানে পতেঙ্গার পথে

একদিনে চন্দ্রনাথ পাহাড় ট্রেকের চন্দ্রকথন