জীবিত অবস্থায় নির্মিত হাজী শাহবাজের মসজিদ ও মাজার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরে বিভিন্ন কাজে যাওয়া হয়েছে অনেকবারই। যেকোনো প্রাচীন স্থাপনাই আমাকে খুব টানে। তাই রিকশায় করে যতবার শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বরের দিকে গিয়েছি, হাতের বামে সাদা রঙের বিশাল একটা স্থাপনার ফাঁকে ফ্যাকাশে লালচে রঙের তিনটি গম্বুজ চোখে পড়েছে। সবসময়ই ভেবেছি, ওখানে হয়তো দাঁড়িয়ে রয়েছে লাল রঙের কোনো মসজিদ। যেহেতু আমি এই এলাকা ভালোভাবে চিনি না, তাই ঠাহর করতে পারিনি মসজিদটির যাবার রাস্তা কোনটা হতে পারে।

প্রবেশদ্বার। সোর্স: লেখিকা

তারপর সেদিন বেরিয়েছিলাম, ঢাকায় যত প্রাচীনতা আছে, খুঁজে বের করবো। টিএসসি থেকে রিকশা নিলাম মুসা খাঁ মসজিদ যাবো বলে। আমার যতদূর জানা ছিল, মুসা খাঁ মসজিদটি কার্জন হলের পাশে। কিন্তু রিকশাওয়ালা আমাকে দোয়েল চত্বর পেরুবার অনেক আগে একটা গলির সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই গলি দিয়া সামনে গেলেই মসজিদ পাইবেন।’
ঢুকতেই চোখে পড়বে এই সাইনবোর্ডটি। সোর্স: লেখিকা

অবাক হলেও দ্বিতীয় কোনো কথা না বলে রিকশা থেকে নেমে গিয়েছিলাম, কারণ তখন আমার চোখে পড়েছে গলির মুখে দাঁড় করিয়ে রাখা সাইনবোর্ডটির দিকে। ওতে লেখা আছে, “হাজী শাহবাজের মসজিদ এই দিকে।”
নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। এক জায়গায় দেখলাম এক মেয়ে ফুল নিয়ে বসে আছে। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এখানে ফুল কিনতে কে আসে?
মেয়েটা আমাকে ডেকে বললো, ‘কোর্টে যাবেন? গেট বন্ধ হয়ে গেছে।’
হেসে বললাম, ‘আমি কোর্টে যাব না।’
মসজিদের সম্মুখভা। সোর্স: লেখিকা

একটু সামনে এগিয়ে যেতেই পেলাম মসজিদের প্রবেশদ্বার। ঢাকা শহরের রমনা এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদটি। মোঘল শাসনামলে শাহজাদা আযমের সময়কালে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মিত হয়। মসজিদটি হাইকোর্টের পিছনে এবং তিন নেতার মাজারের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত। এর চত্বরে হাজী শাহবাজের সমাধি অবস্থিত। এতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে। তিনটি গম্বুজ আছে বিধায় অনেকে মসজিদটিকে তিন গম্বুজ মসজিদও বলেন। রাস্তা থেকে এই গম্বুজগুলোই দৃষ্টিগোচর হয়।
মিনার। সোর্স: লেখিকা

এখন থেকে প্রায় চারশ বছর আগের কথা। এ জায়গাটির ওপর মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন জনৈক সুফি সাধক ও ধনী ব্যবসায়ী। নাম হজরত হাজী খাজা শাহবাজ। তাঁর নামেই বেশি পরিচিত মসজিদটি। শোনা গেছে কোনো এক সময় এই মসজিদে জ্বীনেরাও নামাজ আদায় করতো।
ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুনের মতানুসারে, হাজী শাহবাজ ছিলেন একজন অভিজাত ধনী ব্যবসায়ী, যিনি কাশ্মীর হতে সুবা বাংলায় এসে টঙ্গী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। তৎকালে এখানকার সুবাহদার ছিলেন শাহজাদা মুহম্মদ আজম।
মসজিদের কয়েক জায়গাতেই সাইনবোর্ডে লেখা আছে, “১৬৭৯ সালে তিনি জীবিত থাকাকালেই এই মসজিদ ও নিজের মাজার নির্মাণ করেন।”
কারুকাজ। সোর্স: লেখিকা

মসজিদ ভবনটির স্থাপত্যে উত্তর ভারতীয় মোগল-রীতি লক্ষ্য করা যায়। কালো পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এর মিম্বর এবং চৌকাঠ। মসজিদটি নির্মাণ করা হয় শায়েস্তা খানের আমলের স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে। মসজিদটি দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থে যথাক্রমে প্রায় ৬৭ ফুট দীর্ঘ এবং ২৭ ফুট চওড়া।
মাজার। সোর্স: লেখিকা

চারটি অষ্ট কোণাকৃতির মিনার চোখে পড়ে মসজিদটির চারকোণে। তিনটি প্রবেশপথ আছে পূর্ব পাশের দেয়ালে। আর একটি করে দরজা দেখতে পাওয়া যায় দক্ষিণ ও উত্তর দেয়ালে। প্রতিটি দরজার চৌকাঠ কালো পাথর দিয়ে তৈরি করার কারণ আছে। যাতে জলবায়ুর আর্দ্রতা এগুলোর কোনো ক্ষতি বা সমস্যা করতে না পারে। এজন্য পাথরের আবরণ দেয়া হয় দেয়ালে। তিনটি আকর্ষণীয় মেহরাব দেখতে পাওয়া যায় ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে। দেখতে বেশ সুন্দর প্রধান মেহরাবের অলংকরণ। মুসা খাঁ মসজিদ কিংবা লালবাগ কেল্লার মসজিদের মতোই মসজিদটির স্থাপত্য নকশা।
মাজার বন্দনা। সোর্স: লেখিকা

খাজা শাহবাজের সমাধি দেখতে পাওয়া যায় মসজিদের আঙিনাতেই। অবশ্য এখন আর কেবল সমাধি নেই। সমাধির উপরে সবুজ রঙের মখমল কাপড় বিছিয়ে নিয়ে মাজার হয়ে গিয়েছে। লোকে ওখানে গিয়ে ফুল দিচ্ছে, প্রার্থনা করছে। অবশ্য হাজী শাহবাজ জীবিত অবস্থাতেই নিজের মাজার তৈরি করে গিয়েছেন। আচ্ছা, তিনি কী করে জানলেন, মৃত্যুর পর তিনি এত জনপ্রিয় হবেন? তার কবরকে পূজা করা হবে?
হাজী শাহবাজের মসজিদ। সোর্স: লেখিকা

স্থানীয়রা নানা নামে চেনেন এ মসজিদটিকে। মসজিদটি লাল মসজিদ নামে পরিচিতি পায় কোনো এক সময় এর দেয়ালের রং লাল ছিল বলে। এখানে জ্বীনেরা নামাজ পড়তো বলে কথিত আছে, তাই কেউ একে চেনেন জ্বীনের মসজিদ বলে। কেউবা চেনেন জোড়া মসজিদ নামে। যদিও আশেপাশে এর জোড় হিসেবে আর কোনো মসজিদ দেখিনি আমি।
মসজিদটিকে মানুষ যে নামেই চিনুক না কেন, এটি হাজী খাজা শাহবাজ নামেই বেশি পরিচিত। এর পরিবেশ খুবই নিরিবিলি। মসজিদটি যখন ঘুরে ঘুরে দেখছি, একদম নির্জন না হলেও সুনসান নিরবতা কেমন গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। রাজধানীর শব্দ দূষণের প্রকটতা এখানে নেই।
রাস্তা থেকে হাজী শাহবাজের মসজিদ। সোর্স: লেখিকা

পুরান ঢাকাসহ অনেক দূর-দূরান্ত থেকে এসেও অনেকে এখানে নামাজ আদায় করেন। তবে ক্রমে মসজিদটির ঐতিহ্য ও জৌলুস হারিয়ে যাচ্ছে কালের বিবর্তনে। অযত্ন-অবহেলায় স্থাপনাটির এখন প্রায় জীর্ণদশা। যদিও এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন একটি মসজিদ, তারপরও এর তেমন সংস্কার কাজ চলে না। অনেক জায়গার চুন-সুরকি খসে পড়ছে। অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। আসল লাল রঙ তো হারিয়ে গেছে বহু আগেই। তবে পুরনো স্থাপনার জন্য এই রংটিই আমার বেশি পছন্দ।
ফেরার সময় দেখলাম, ওই মেয়েটির কাছ থেকে কিছু লোক ফুল কিনছে। এই ফুলগুলোই হাজী শাহবাজের মাজারের সামনে দেখে এসেছি। তাহলে এই মাজার বন্দনাকারীরাই এই মেয়েটির ক্রেতা। একটা প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেল তাহলে।
ফুল বিক্রিকারিণী। সোর্স: লেখিকা

রিকশাওয়ালার ভুলে মসজিদটি ঘুরে দেখা হলো, এজন্য ভাড়া বেশি নিলেও তাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। যেহেতু আমি জানতাম না, মসজিদে যাওয়ার রাস্তা কোনদিকে। আমার মতো এমন অনেকেই হয়তো আছে, যারা এর পাশ দিয়ে প্রতিনিয়ত যাওয়া আসা করলেও মসজিদটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। লেখাটি তাদের জন্য।
তথ্যসূত্র
http://www.dailysangram.com/post/67133
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রথম সমুদ্র দর্শনের প্রথম পলক

খুলনার দক্ষিণডিহি: ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির পথে