রাজাদের জাদুঘর নামে খ্যাত হাসন রাজার জাদুঘর

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে সুরমা নদী। সুরমার পাশ ঘেঁষে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়ের পাহাড় শ্রেণী। সেই পাহাড়ি আচ্ছাদনে ঘেরা সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে হাসন রাজার বাড়ি। সুনামগঞ্জের এই বাড়িটিতেই হাসন রাজা জন্মেছেন ১৮৫৪ সালে। সে সময়ের লক্ষ্মণশ্রী ও কৌড়িয়া পরগণার অভিজাত জমিদার আলী রাজার পুত্র হাসন রাজা। ষোড়শ শতাব্দীতে এরা অযোদ্ধা থেকে এদেশে এসেছিলেন। এই বাড়িতে বসেই হাসন রাজা রচনা করেছেন অসামান্য সব বাংলা গান।

হাসন রাজার নিজের বাড়িতেই কীভাবে জাদুঘর গড়ে তোলা হলো তার একটা ইতিহাস আছে। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে এই বাড়িতে একটি মেলা আয়োজন করা হয়েছিল। নাম ‘হাসন ফকিরের মেলা’। তখন থেকেই হাসন রাজার বাড়ি ও তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী দেখতে মানুষজনের আগ্রহ বাড়ে। তা জানতে পেরে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ‘হাসন একাডেমি’র জন্য অনুদান দেন ২৫ হাজার টাকা। তারপর থেকেই এটি জাদুঘর হিসেবে পরিচিতি পায়।

হাসনের আলোকচিত্র; source: শাওন

৩০ টাকা করে টিকিট কেটে জাদুঘরে ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়লো হাসন রাজার একটি প্রমাণ সাইজের আলোকচিত্র। ১৯১৪ সালে তোলা এই ছবিটি কলকাতার একটি স্টুডিও থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। আমাদের দলের সাথে আরো একটা দল এসেছিল জাদুঘরটি দেখতে। হাসনের আলোকচিত্রটির সামনে দাঁড়াতেই পিছন থেকে শুনতে পেলাম, কেউ একজন ইংরেজি উচ্চারণে বাংলায় বলছেন, ‘হাসনকে দেখে নিন। বেশিরভাগ মানুষই হাসন রাজা বলতে যাকে চেনে, তিনি হলেন অভিনেতা হেলাল খান। হাসন রাজার চরিত্রে অভিনয় করায় আসল হাসন রাজার মুখাবয়ব যেন হারিয়ে গেছে মানুষের মন থেকে। হাসন রাজার চেহারায় শিশুসুলভ একটা আভিজাত্য আছে। দেখে নিন!’

আমাদের চোখে অবশ্য রাজার চেহারায় শিশুসুলভ কিছু ধরা পড়েনি। বরং মনে হয়েছে, তিনি অতিমাত্রায় সুরা পান করতেন। কারণ তার সবগুলো ছবিতেই দেখা যাচ্ছে চোখের নিচের মাংসপেশি ফোলা। মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপ হলেই এমনটা দেখা যায়।

পিছন ফিরে দেখলাম একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন একপাশে। তার সামনে একটা হারমোনিয়াম। তিনি আবারো ইংরেজি উচ্চারণে বললেন, ‘আমি হাসনের চতুর্থ প্রজন্ম। হাসন রাজা আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন। আপনারা কি আমার কাছে হাসনের ইতিহাস শুনতে চান?’

সবাই সায় দিলো।

হাসনের বংশধর; source: শাওন

তিনি গানে গানে হাসনের ইতিহাস বলতে শুরু করলেন। খানিকটা গল্প বলেন, তারপর হারমোনিয়াম বাজিয়ে হাসন রাজার বিভিন্ন গানের বিভিন্ন কলি গেয়ে ওঠেন। ওনার কথা শুনে অনেক কিছু জানতে পারলাম হাসনের বাবা মারা যাওয়ার পর হাসনের মায়ের আবার বিয়ে হয়েছিল তারই স্বামীর চাচাত ভাইয়ের সাথে।

হাসন তার মায়ের দ্বিতীয় ছেলে। আর হাসনের মায়ের আগের স্বামীর এক ছেলে ছিল। নাম দেওয়ান ওবায়েদুর রাজা। হাসনের তিন ভাইয়ের মধ্যে উনি ছিলেন বড়। দেওয়ান ওবায়েদুর রাজা মারা যাওয়ার পর রাজা হন হাসন।

মানুষটি আরো অনেক কিছু বলেছিলেন, সবকিছু মনে নেই। শুরুতে উনি বলেছিলেন, ‘আমি যে প্রেজেন্টেশন দেবো, এই প্রেজেন্টেশনের উপর আপনারা মার্কিং করবেন।’ রুদ্র ফিসফিস করে বললো, ‘উনি তো নিজের পরিচয়ই দেননি, মার্ক পাওয়ারই তো যোগ্য নন।’

আমি চাপা ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম। একদম শেষে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

‘হাসনের বংশধর হলে আপনার একসেন্ট ফরেনারদের মতো কেন?’

তিনি হেসে জানালেন, দীর্ঘদিন ইংল্যাণ্ডে থাকার ফলাফল এটা।

হাসনের বাড়ির মানচিত্র ; source: শাওন

আমরা এরপর জাদুঘরটা ঘুরে দেখলাম আর ছবি তুললাম। এই জাদুঘরে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা নেই। লম্বা আলোকচিত্রটি ছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা হাসনের আট-নয়টি ছবি আছে। আরো আছে তাঁর ভাই, বোন, পূর্বপুরুষদের ছবি আর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। তবে কেবল এসব ছবি নয়, জাদুঘরটির বিশেষত্ব হলো, হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জিনিসপত্র।

যে টেবিল-চেয়ারে বসে হাসন রাজা গান রচনা করতেন সেই টেবিল-চেয়ার। কোনো রাজা বা ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে দেখা করার সময় একটি বিশেষ পোশাক পরতেন। সেই রঙিন আলখেল্লাটি আছে কাঁচের বাক্সে। কিন্তু সাধারণত হাসন সাদাসিধে পোশাক পরতেন। তিনি সব সময় সাদা ধুতি লুঙ্গির মতো করে পরতেন। সঙ্গে সাদা গেঞ্জির ওপর চাদরের মতো করে আরেকটি ধুতি গায়ে জড়িয়ে রাখতেন।

এছাড়াও আছে ছোট জগের মতো দেখতে পানি পরিশোধন পাত্র। এই ফিল্টারটি হাসন পেয়েছিলেন তাঁর এক নায়েবের কাছ থেকে। উইলিয়াম লিটল নামে এই ইংরেজ নায়েব ১৯০২ সালে অস্ট্রিয়া থেকে এটি এনে উপহার দিয়েছিলেন। হাসন রাজার পারিবারিক তলোয়ারও আছে জাদুঘরে।

হাসনের বোন; source: শাওন

সবচেয়ে আগ্রহ পেয়েছি একটি মাটির হাঁড়ি দেখে। হাঁড়ির সাথে একটা বর্ণনাকারী কাগজে লেখা আছে এর ইতিহাস। এই হাঁড়িতে ব্রিটিশ কয়েন জমাতেন হাসন রাজা। তারপর কলস থেকে মুঠোভরা কয়েন নিয়ে শিশুদের মধ্যে তা ছিটিয়ে দিতেন। এই কাজটায় নাকি তিনি খুবই আনন্দ পেতেন।

এগুলো ছাড়াও জাদুঘরে আছে হাসন রাজার চায়ের টেবিল, দুধ খাওয়ার পাত্র, বাটি, দুধ দোহনের পাত্র, পানদানি, হাসন রাজার ব্যবহৃত কাঠের খড়ম, শেষ বয়সে ব্যবহৃত লাঠি, মোমদানি, পিতলের পানির কলস, নিজের হাতে লেখা গানের লেমিনেটিং কপি। আছে কিছু বাদ্যযন্ত্রও—ঢোল, করতাল, মন্দিরা ইত্যাদি। জমিদারির কাজে ব্যবহৃত ক্যাশবাক্সটিও রয়েছে। আর আছে হাসনের প্রিয় কোড়া পাখিটির ছবি। কোড়া পাখি যে হাসনের অসম্ভব প্রিয় ছিল, তা বোঝা গেল বেশ কয়েকটি ছবি দেখে।

হাসনের ভাই; source: শাওন

জাদুঘর ঘুরে আমরা হাসনের বাড়ির আশেপাশেও ঘুরে দেখেছি। হাসনের থাকার ঘর, রাজবাড়ির রাজকীয় প্রবেশদ্বার আর পুকুরটিও দেখেছি। পুরো বাড়িতেই প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে। শুনশান শান্তিময় একটা পরিবেশ বিরাজ করে হাসন রাজার বাড়িতে।

কীভাবে যাবেন

প্রথমে আপনাকে যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে। ঢাকা থেকে সড়ক পথে সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। সায়দাবাদ থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনা পরিবহন, মামুন পরিবহনের নন এসি বাস যায় সুনামগঞ্জ। ভাড়া এসি ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা। সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে সাহেববাজার ঘাট পর্যন্ত রিকশায় যেতে পারবেন।

সাহেব বাড়ির ঘাটের পাশেই হাসন রাজার জাদুঘর। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১০ কিলোমিটার আর সিলেট রেল স্টেশন থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাসন রাজার বাড়ি।

হাসনের পয়সার রাখার সেই মাটির পাত্র; source: শাওন

কোথায় থাকবেন

সুনামগঞ্জে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,০০০ টাকার মধ্যে থাকার জন্যে হোটেল ভাড়া পাবেন।

কয়েকটি হোটেলের নাম ও অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছি;

হোটেল নূর-পূর্ববাজার স্টেশন রোড।

হোটেল সারপিনিয়া- সোজা পৌঁছে যেতে পারেন রূপবান মুড়ায়। একই সাথে দেখে আসতে পারবেন- লতিকোট মুড়া, ইটাখোলা মুড়া এবং ময়নামতিতে শালবন বৌদ্ধ বিহার এবং জাদুঘর রোড।

হোটেল নূরানী, পুরাতন বাস স্ট্যান্ড ।

হোটেল মিজান, পূর্ব বাজার।

হোটেল প্যালেস, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন রোড।

সুরমা ভ্যালী আবাসিক রিসোর্ট।

Feature Image – শাওন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশি পর্যটকরাও যেতে পারবেন সিকিম, অরুণাচল ও লাদাখ!

প্রাচীন ঢাকায় হেঁটে হেঁটে সারাদিন