হাওর এক্সপ্রেসের গল্প

নেত্রকোনা, দেশের উত্তর-পূর্ব এই জনপথের নাম শুনলেই স্মৃতির কোণে ভেসে আসে গারো পাহাড়ের গল্প। গারো পাহাড়ের নির্জনতায় জেগে থাকা এক সমৃদ্ধ জনপথ৷ তবে ভয়াল রাস্তার করাল থাবায় অনেক পর্যটক একবার গিয়ে কানে মুচলেকা দেয়, এ পথে আর নয়। তবে আমার বা আমাদের কথা ভিন্ন। আমার বড় দাদা সুসং দূর্গাপুরের রাজার কাজী ছিলেন সে কথা আমার দাদা বাবার মুখে শুনতাম। শেকড়ের সন্ধানে বহুবার যাওয়া হয়েছে নেত্রকোনা।

তবে এবারের ট্যুরে ছিল ভিন্নতা। কারণ মনে মনে একটা প্ল্যান ছিল সেটা বাস্তবায়ন হলে গল্পটা অন্য রকম হতো। লেংগুরা বাগড়া দিয়ে আসলো গল্পের মাঝে। যাই হোক, বরাবরের মতো আমার বান্দরবান ট্যুরের সহপাঠীদের সাথে দীর্ঘ দিনের একটা ট্যুর গ্যাপ হয়ে যাওয়ায় তারা ছিল মনঃক্ষুণ্ণ। তাদের বিষন্নতার ৪ মাস কাটাতে নেত্রকোনার ট্রেনের টিকেট কেটে ফেললাম। ১৪-১৬ ডিসেম্বরের বড় বন্ধে পুরো বাংলাদেশ ঘুরতে বের হয়েছে। আমরা না হয় ১৬ই ডিসেম্বর ছিটেফোটা সেই আনন্দে সামিল হলাম।

ছবি- আশিক সারওয়ার

১৫ই ডিসেম্বর হাওর এক্সপ্রেসে শুরু হলো আমাদের দুর্দান্ত যাত্রার। যাত্রা দুর্দান্ত হবার আর একটি কারণ চাঁন মিয়া৷ আর সাথে সঙ্গী হচ্ছেন মনা ও রুবেল ভাই। একজন প্রত্যেক কথায় ‘জাস্ট ওয়াও’ বলার বাতিকে আসক্ত আর একজন বীর সৈনিক শর্ট টেম্পার। জল আর ডাঙ্গার দুই প্রাণীর বন্ধুত্ব কেমনে হলো সেও এক সপ্ত আশ্চর্য। ম্যারাথন বিয়ের দাওয়াত খেয়ে চাঁন মিয়া সাথে মনা ও রুবেল ভাইকে নিয়ে আসছেন ট্রেন ধরতে৷ তিনি এলেন ঠিক পাঁচ মিনিট আগে উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে।

তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে বরাবরের মতো হতাশ করলো না। উত্তেজনার রেশ আধা ঘণ্টা শিডিউল বিপর্যয় ম্রিয়মাণ করে দিল। চাঁন মিয়াকে গাল ভরে ঝাড়িও মারতে পারলাম না। রাত ১২.২০ এ ট্রেন ছাড়লো, আস্তে আস্তে খিলগাঁও মহাখালী পার হয়ে এয়ারপোর্ট আসতে ১টার কাছাকাছি বেজে গেল৷ চলছে হাওর এক্সপ্রেস দীর্ঘ এক রাত্রির গল্প নিয়ে৷ টংগী স্টেশন এসে যাত্রা বিরতির ফাঁকে ভ্রাম্যমাণ মানুষের ভীড়ে দেখা যায় কিছু অভুক্ত মুখ৷ কুকুর ছানাকে জড়িয়ে পরম মমতায় শুয়ে আছে মানব শিশু। সফেদ চাঁদনির আলোয় চিক চিক করছে তাদের মুখ। ক্ষুধা জগতের কোনো প্রাণীকে ছাড় দেয় না। এখানে বাতাস ধাক্কা খায় না সুরম্য ভবনের পোক্ত দেয়ালে, হু হু করে কাঁপিয়ে যায় বাস্তুহারা প্রাণীদের। প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর।

একা বের হলে ট্রেনে আমার গল্পের বই পড়ার অভ্যাস আগে ছিল। এখন সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে৷ বই উদাসীন চাঁন মিয়া জীবনে একটি বই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছিল, সেটি সৈয়দ মুজতবা আলীর শবনম। এ এক অবাক বিস্ময়কর ব্যাপার৷ প্রেম মানুষকে কত কিছু করায় ভাবতে ভাবতে পায়ে জ্বালা অনুভব করলাম। আঁধারে মশার শাস্ত্রীয় সংগীতের ধ্বনিতে মুখরিত হাওর এক্সপ্রেস৷ হাতে শরীরে কামড়ানোর জায়গা না পেয়ে নিষ্ঠুরভাবে পায়ে জেঁকে বসেছে৷ চান মিয়াও দেখলাম পা চুলকাচ্ছে৷ মশার কামড়ে ব্যতিব্যস্ত আমি খেয়াল করলাম চাঁন মিয়া এক অভূতপূর্বভাবে মশার কামড় থেকে রক্ষা পাবার কৌশল আবিষ্কার করে ফেলেছেন। বাইকার হ্যান্ড স্লিভস যা আমরা অনেকেই ট্রেকিং, সাইকেলিং, হাইকিংয়ের সময় ব্যবহার করি রোদ থেকে বাঁচতে। যে কোনো ট্যুরে গেলে আমার ব্যাগে হ্যান্ড স্লিভস এক জোড়া থাকবেই। চাঁন মিয়া স্লিভস নিয়ে এসেছে। মশার জ্বালায় তাহাই হাত মোজা হিসাবে পায়ে পরে নিল। বাড়তি অংশ স্যান্ডেলে গুজে দিল। বাঙালির বুদ্ধি বড় ক্ষুরধার। আমিও পরে নিলাম স্লিভস মোজা।

সোর্সঃ আশিক সারওয়ার

চলছে হাওর এক্সপ্রেস সুখ দুঃখের গল্প নিয়ে৷ জয়দেবপুর পেরিয়ে গফরগাঁ এসে থামলো ট্রেন। ময়মনসিংহ জংশনের ঠিক আগের স্টেশনেই এর অবস্থান। হাওরে আজ লোক উঠেছে বিস্তর। ট্রেন যেন আজ চলন্ত গল্পের ডালি সাজিয়ে বসে আছে। আমার পাশের সিটে বসে ছিল খেটে খাওয়া মানুষটা স্বপ্নালু ঘুমু ঘুমু চোখে। তার পাশের মানুষটা ঘুমের জ্বালা সইতে না পেরে ফ্লোরে বসে বসে ঘুমাচ্ছে।

প্রকৃতি যেন যে কোনো পরিস্থিতিতে এদের স্বপ্ন দেখার অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এদের স্বপ্নগুলো খুবই ক্ষুদ্র। গোলপী চুলের এক যুবক সেই এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। কথার ধরন দেখে বোঝা যায় নতুন বিয়ে, তাই কী রঙিন স্বপ্নে গোলাপী বেধেছে চুলে। এই চুল টুপিগুলো আজ যুব সমাজে খুব প্রচলিত। বিশেষ করে ট্রেনে উঠলে চুল টুপির দুই একজন মিলেই যাবে।

সোর্সঃ সমকাল

ট্রেন আবার চলতে শুরু করলো ঝিক ঝিক শব্দের সুর তুলে৷ ঘুম আর জাগরনের এক অদ্ভূত জগতে ঝুলে আছি৷ ট্রেন ছুটে চলছে তার আপন গতিতে। হঠাৎ গতির তারতম্য দেখে বুঝে গেলাম ময়মনসিংহ জংশনে এসে গেছি৷ ট্রেন থেকে এবার একটা বিরাট অংশ মানুষ নেমে যাচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর মুখ জ্বলজ্বল করছে। এতক্ষণ পর বিধাতা যেন তাদের পানে চেয়ে তাকালো। ক্ষিপ্রগতিতে দখল হয়ে যাচ্ছে সিটগুলো। আমার চোখ যেন আটকে গেল ট্রেনের জানালায়।

শীতের রাতে কর্মব্যস্ত ময়মনসিংহ জংশন। ট্রেন স্টেশনগুলো কখনও ঘুমায় না। গল্প নিয়ে জেগে থাকে পথিকের চোখে। মানুষের ওঠা নামার মাঝে জীবনের তাল লয় খুঁজে পাওয়া যায়৷ হকারদের কোলাহলে স্টেশন মুখরিত। ভ্রাম্যমাণ হকার জানালার কাছে আসছে নানান লোভনীয় মুখরোচক খাবারের পসরা নিয়ে। সুযোগ সন্ধানীরা প্ল্যাটফর্মে নেমে সিগারেটের ফিল্টারে উষ্ণতা খোঁজার প্রয়াসে ব্যস্ত৷ সব কিছু ছাপিয়ে মাঝ রাতের ট্রেন যেন নিয়ে এলো এক নিঃসঙ্গ প্রেমের গল্প৷ কারণ এরপরের স্টেশন গৌরিপুর জংশন৷ যেখানে শব্দের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের “গৌরিপুর জংশন” পড়ে চলে এসেছিলাম কোনো মানুষীর হাত ধরে৷

সোর্সঃ আশিক সারওয়ার

ট্রেনের হুইসেল আমাকে ফিরিয়ে আনলো আবার বাস্তবে, আবার চলা শুরু হলো পথের। এত মানুষের মাঝেও আমি নিঃসঙ্গ। গৌরিপুরের যত কাছাকাছি আসছি তত যেন স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ছি। এক মায়াময় যাত্রার বিরতি নিতে ট্রেন এসে থামলো গৌরিপুর জংশনে। গৌরিপুরে শীতের আগমনে বইছে শীতল হাওয়া। প্ল্যাটফর্মের এক কোনায় নীল শাড়ি পরে চিন্তিত ভঙ্গিতে হাঁটছে রুপা। যেন হিমুর জন্য তার এক জনমের অপেক্ষা। ব্যাপারটি কাকতলীয় হলেও এই মাঝরাতে আমি নীল শাড়ী এক মায়াবতীর সংস্পর্শে এলাম। হ্যালুসিনেশন ভেবে কল্পনার রাজ্যে লাল নীল বেগুনী স্বপ্ন দেখছিলাম। তাকে এক যুবকের হাত ধরে ট্রেনে উঠতে দেখে মনটা বলে উঠলো-

সুরঞ্জনা, ঐখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা ঐ যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা ,
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে

রূপা, সুরঞ্জনারা এভাবেই চলে যাবে। প্রেমহীন যুবক অতি মায়া নিয়ে তাদের অপেক্ষায় বসে থাকবে। কারণ স্টেশনটা যে “গৌরিপুর জংশন”। কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি বিজড়িত জংশন। ট্রেন ছুটতে লাগলো আবার রূপা হিমুদের পিছে ফেলে নতুন গন্তব্যে৷ এবার শ্যামগঞ্জ স্টেশন পার হয়ে ভোর সাড়ে পাঁচটায় এসে থামলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য নেত্রকোনা স্টেশন। স্টেশনে নেমে এবার আড়মোড়া ভাঙলাম৷ আমরা অভিযাত্রীর দল তৈরি হলাম নতুন রোমাঞ্চকর যাত্রার অভিপ্রায়ে।

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. বেশ লাগলো। মনে হোল আমিও সাথি হয়ে গেছিলাম রাতের ” হাওড়ের “। অনেক ধন্যবাদ। পরের রোমাঞ্চের অপেক্ষাই রইলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিলাবনী পাহাড়ে জুমারিং-র‍্যাপ্লিং ক্লাসের বৃত্তান্ত

দায়িত্বশীল ভ্রমণ সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানতে হবে