নীল-হলুদের কমলার গ্রাম হলদিয়ানি

নৈনিতাল, ভিমতাল, তিনতাল, মুক্তেশর, কৌশানীর পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে সবাই বেশ ক্লান্ত বোধ করছিল। অবশ্যই আমি ছাড়া। পাহাড় আর ক্লান্তি সে আমার সাথে যায় না আদৌ। তার উপর যদি পরিবার সাথেই থাকে, তাহলে তো আমি পাহাড়ে এক জনম বোধহয় কাটিয়ে দিতে পারি অনায়াসে। কারণ পাহাড় আর পরিবার একই সাথে থাকলে আর যাই থাকুক আর নাই থাকুক, প্যারাটা অন্তত থাকে না। পাহাড়ে যেটা সবচেয়ে বেশি ভোগায়, সেটা হলো পারিবারিক প্যারা! কিন্তু অন্যান্যরা বেশ একটু ঝিমিয়ে পড়েছে টানা চারদিন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে।

তাই সবাইকে সান্ত্বনা দিতে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই পাহাড় থেকে সমতলে নেমে যেতে হলো। তো কোথায় যাবো এই একদিন? যদিও এই শেষ দিনে আমাদের রানিক্ষেত থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেমেই যেহেতু যাবো তাই একটু কষ্ট আর দূরের পথে হলেও দিল্লী না গিয়ে কেউ কেউ আগ্রা যেতে চাইলো। তাজমহলের শোভা আর রূপের মাধুর্য দেখে পাহাড়ের ক্লান্তি দূর করতে চায়। ঠিক আছে, তবে তাই-ই হোক।

বাড়ির গেটে কমলা গাছ! ছবিঃ লেখক

পরদিন খুব সকালে তাই কৌশানী থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের আগ্রার দিকে রওনা হলাম। যেতে যেতে পথে পড়বে একই পথে আসার সময়ে দেখা আলমোরা, ভিমতাল হয়ে নতুন শহর বা গ্রাম হলদিয়ানি আর কাঠগোদামের উপর দিয়ে আলীগড় থেকে আগ্রা। মাঝে আরও বেশ কিছু ছোট-বড় শহরের দেখা মিলবে। সেগুলো আমাদের ভ্রমণ তালিকার উল্লেখযোগ্য কিছু নয় বলে উহ্যই রাখলাম।

তো এই আগ্রা যাবার দীর্ঘ পথের নানারকম শহর আর গ্রামের মধ্যে আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিল হলদিয়ানির প্রতি। কারণ আমার অল্প জানা মতে এই হলদিয়ানিও একটি উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ গন্তব্য। যদিও সেখানে নামা হবে কি হবে না সেটা নিশ্চিত ছিলাম না। তবুও ওই পথে যাবো সেটাই একটা বিশেষ আনন্দ আর আকর্ষণ ছিল আমার কাছে।

তো আমাদের গাড়ি, আলমোরা, ভিমতাল হয়ে কাঠগদামের পথে চলতে শুরু করেছে। আর এই দুই শহরের মাঝেই পড়বে দারুণ নামের অচেনা সেই শহর বা গ্রামের অল্প কিছু হয়তো। নাম তার হলদিয়ানি। আমি বেশ আয়েশ করে ভিমতালের বিশাল লেক পেরিয়ে আসার পর থেকেই অপেক্ষায় আছি, হলদিয়ানি দেখার জন্য। কিছু সময় পরে একটা অন্য রকম শহরের ছবি ভেসে উঠতে থাকলো, পাহাড়ি পথ থেকে ধীরে ধীরে সমতলের দিকে যেতে যেতে। আর সেটা হলো, কোনো এক পাহাড় ঘেরা ভ্যালীর মাঝে আর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে একই রকম রঙ আর ঢঙের কিছু অনিন্দ্য স্থাপনা। দারুণ লাগলো দেখতে ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝে আর ভাঁজে ভাঁজে এক অন্য রকম ঢঙের নান্দনিক স্থাপনা।

পাহাড়ি ভ্যালীতে নান্দনিক স্থাপনা। ছবিঃ লেখক

ঠিক এমন সময় ছেলের হালকা ক্ষুধা আর পানির পিপাসা লাগায়, সেই চমৎকার পাহাড়ি শহরে কয়েক মিনিটের জন্য থেমে গেলাম। কিছু খাবার, পানি আর ড্রিংকস কেনার জন্য। তো কেনাকাটার জন্য দোকানে গিয়েই জানতে পারলাম এখান থেকেই হলদিয়ানির শুরু। শুনেই দারুণ চমকিত হলাম। তাই ভাবলাম এখনই গাড়িতে না উঠে কিছুটা হেঁটে সামনে যাই। এদিকটা একটু দেখে নেই। তারপর গাড়ি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে সেখানে গিয়ে না হয় চড়ে বসবো।

কেন আর কী কারণে যেন হাঁটা শুরু করলাম তিনজন মিলে। ছেলে, ছেলের মা আর আমি। ভাগ্যিস হাঁটতে শুরু করেছিলাম, আর ভাগ্যটাও এত আর এতই সুপ্রসন্ন ছিল যে হলদিয়ানির একটু নতুন রূপ আমাদের দেখিয়েই দিল পথের মাঝেই। কারণ একটু হেঁটে সামনে যেতেই আমরা তিনজন উপরের দিকে তাকিয়ে “থ” হয়ে থেমে গেলাম! একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপরে একটি বাড়ির গেটের সামনে রাস্তার উপরে ঝুলে পড়া গাছ দেখে। আর “থ” না হয়ে আর কোনো উপায়ই ছিল না যে। কারণ এমন কিছু এর আগে বাস্তবে আমাদের কেউ কোনোদিন দেখেনি।  

অভিভূত কমলার হাসি। ছবিঃ লেখক

সেটা হলো, সেই বাড়ির অল্প উঁচু ইটের পথের উপরে নীল আকাশের মাঝে, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে আছে টকটকে আর টসটসে বিশাল আকারের হলুদ হলুদ কমলা। একটি দুইটি কমলা কোনো কোনো গাছে এর আগে দেখলেও, এমন গাছ ভরা আর থোকা থোকা কমলার গাছ কোনোদিন দেখিনি কেউ। আর সেই সাথে ছিল উপরে বিশাল নীল আকাশ, চারপাশে সবুজ গাছ, লতা পাতা আর পাহাড়। তাদের মাঝে একদম হলুদের ঝাঁক বেঁধে ঝুলে আছে কমলার থোকা। ভাবা যায়, যারা আগে কখনো এমন দেখেনি, তাদের কাছে কী দারুণ আর দুর্লভ একটা দৃশ্য।

বেশ অনেকটা সময় সেই বাড়ির গেটে অনাহূতর মতো কাটিয়ে ছবি তুলে গাড়িতে উঠে বসেছিলাম। মনে মনে দারুণ খুশি লাগছিল একদম দারুণ আর অপ্রত্যাশিত কিছু দেখতে পারার আনন্দে। কিন্তু আমরা জানতাম না যে সামনের বেশ কিছুটা পথে আমাদের জন্য এর চেয়েও অবাক করার মতো আনন্দ আর উচ্ছ্বাস অপেক্ষা করে আছে, পথে-পথে, বাঁকে-বাঁকে আর প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, গেটে, চারপাশে আর ছোট বড় বাগানে।

বাড়ির গেটে কমলা গাছ। ছবিঃ ন্যাশ

কারণ একটু পরে, আমাদের গাড়ি পাহাড়ের উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে, কিছুটা সমতলে চলতে শুরু করতেই দুইপাশের ঘর বাড়ি যেখানে যা চোখে পড়ছে সব বাড়ির সাথে, সামনে, পেছনে এক বা একাধিক কমলার গাছ চোখে পড়ছে! আর শুধু গাছ নয়, সবগুলো গাছে গাছেই থোকা থোকা হলুদ রঙের কমলা হেসে আছে যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে। ঝকঝকে আর মেঘমুক্ত নীল আকাশের মাঝে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা ঝুলে আছে শত শত কমলা। বাড়িতে, বাগানে, পথে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আর যতদূর চোখ যায় শুধু কমলা আর কমলার বাগান।

এমন রঙ, রূপ আর কমলার অবিরত হাসি যারা দেখেনি তাদেরকে এই অনুভূতি বোঝানো খুব কঠিন। আমরা আমাদের গাড়ির জানালার কাঁচ দিয়ে শুধু অপলক তাকিয়েছিলাম, হলদিয়ানির সারি সারি কমলার গাছ, কমলার বাগান আর বাড়িতে বাড়িতে কমলার ঝুলে থাকা অপূর্বতার দিকে। অবাক হয়ে আর অদ্ভুত আনন্দ নিয়ে।

নীল হলুদের হলদিয়ানি। ছবিঃ লেখক

পুরো হলদিয়ানি গ্রাম বা শহর যেন সেজেছিল নীল আকাশের মাঝে হলুদ রঙে, কমলার রঙে রেঙে। যে কারণে আমরা এই গ্রামের বা জায়গার নাম দিয়েছিলাম…

নীল-হলুদের হলদিয়ানি।

হলদিয়ানি বা এই কমলার জগতে যেতে হলে সহজ উপায় হলো, ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে ট্রেন বা প্লেনে কাঠগোদাম। কাঠগোদাম থেকে বাসে বা কারে করে হলদিয়ানি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অপরূপ গ্রিস!

পাহাড় চড়া শেখার হাতেখড়ি: রক ক্লাইম্বিং কোর্স