হাজারিখিল ট্রি এক্টিভিটির আদ্যোপান্ত

আমরা ছোটদের গাইড বইয়ে দেখি অনেক সময় লেখা থাকে “একের ভেতর সব” বা “একের ভেতর অনেক”। এতে সবার সুবিধাই হয়। একটি বই কিনলো আর সব বিষয়ের সমাধান একসাথে পেয়ে গেল। আর যদি ভ্রমণের ক্ষেত্রে এরকম কোনো জায়গা পাওয়া যায় যেখানে আপনি ট্রেকিং করবেন, ট্রি এক্টিভিটি করবেন, চা বাগান দেখবেন আর আদর্শ গ্রামের স্বাদ নেবেন- এমন হলে তো আর কথাই নেই। তাই না?

তাহলে চলুন আর দেরি না করে এমন একের ভিতর সব হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য থেকে আপনাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। যেখানে আসলে আপনি চা বাগানে ঘুরে বেড়াতে পারবেন, ফরেস্ট অফিসের ট্রি এক্টিভিটি করতে পারবেন এবং হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হয়ে ঝর্ণা থেকেও ট্রেকিং করে আসতে পারবেন। আবার সাথে দেখতে পাবেন একটি সাজানো গোছানো আদর্শ গ্রাম।

সবুজের সমারোহ।  ছবি : শাম্মা 

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় এই হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। তো হাতের কাছেই এমন সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে আমরাও কোনো এক সকাল বেলা বেরিয়ে পড়লাম দল বেঁধে। যদিও সবাইকে এক করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আগে কখনো ফটিকছড়ি যাওয়া হয়নি বলে যাওয়ার রাস্তাটাকে অাপন মনে উপভোগ করলাম।

হঠাৎ করেই ঘন মেঘে যখন আকাশটা ঢেকে গেল তখন আমরা হাজারিখিলের কাছাকাছি। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি ঝুম বৃষ্টিতে সব ওলটপালট করে দেবে। তখন চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিলো সমতল চা বাগানের সাথে আকাশের এমন মিতালি দেখে। বলতে গেলে এই চা বাগান আর আকাশ তখন একাকার। গাড়ি থেকেই আমরা যখন এমন পরিবেশ উপভোগ করে করে সামনের দিকে যাচ্ছিলাম তখন বন্ধু জাকির চিন্তিত তার জুতো জোড়া নিয়ে।

গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে যে যার গন্তব্যে ছুটছে ।  ছবি : শাম্মা 

আমাদের উচ্ছ্বসিত অবস্থা আর আগে কখনো যাইনি তা সিএনজি ড্রাইভার জেনে সেও সুযোগ বুঝে একটা কোপ মেরে দিল। ফরেস্ট অফিস বলে সে আমাদের নামিয়ে দিয়েছে হাজারিখিল বাজারে। কিন্তু ভাড়া নিয়েছে ফরেস্ট অফিসের। কিন্তু পরে দেখলাম সে আমাদের উপকারই করেছে। হাজারিখিল বাজার থেকে অভয়ারণ্য যেতে যে পথ এতে আমরা খুঁজে পেয়েছি একটি পরিপাটি গ্রাম।

বনবিভাগের পরিত্যক্ত ঘর।  ছবি : শাম্মা 

চায়ের দোকানে বসে আড্ডাপ্রিয় মানুষগুলো অবাক পানে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। বিড়বিড়িয়ে বলছে হয়তো কিছু। রাখাল তার গরু নিয়ে ছুটছে মাঠের পানে। জমিতে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছে কৃষক। তার সময় নেই আমাদের দিকে তাকানোর। সব মিলিয়ে হেঁটে যাওয়ার অল্প পথটুকুও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

ট্রি এক্টিভিটির পূর্বপ্রস্তুতি।  ছবি :মোমেন 

বেড়ানোর জায়গা যেহেতু বেশ কয়েকটা তাই আপনাকেও পরিকল্পনা মতো চলতে হবে এবং সময়মতো সব করতে হবে। প্রথমে গিয়েই তাই আপনার ট্রি এক্টিভিটি সেরে ফেলা উচিত।

অভয়ারণ্যে প্রবেশ গেটের ডানপাশেই রয়েছে সে চমকপ্রদ রোমাঞ্চ। আর ট্রি এক্টিভিটি করতে গেলে তাদেরকে জনপ্রতি ১০০ টাকা দিতে হবে। পাঁচ স্টেপের এই চ্যালেঞ্জ প্রথম দেখাতেই আপনি বিমোহিত ও উত্তেজিত হতে পারেন। হুট করেই নিজেকে সাহসী প্রমাণ করতে যাবেন না। তাদের দেওয়া জ্যাকেট আর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা শুনে তারপর শুরু করবেন। দেখতে যতটা সহজ মনে হয় আসলে কিন্তু অত সহজ না।

তবে নিয়মমতো করলে ভালোভাবে সব স্টেপ পার হওয়া যায় এবং অনেক সুন্দর একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। যেমনটা আমরা পেয়েছি। একেকটা স্টেপ পার হচ্ছি আর মনে হচ্ছে জীবনের বিরাট কিছু অতিক্রম করতে যাচ্ছি, আনন্দে, উচ্ছাসে তখন ভরে উঠবে মন। আর ভয়ের কোনো কারণ নেই, যেখানেই আপনি আটকে যাবেন সেখান থেকেই তাদের উদ্ধারকারী দল আপনাকে নামিয়ে আনবে। যেমনভাবে নামিয়ে এনেছে আমাদের শাম্মাকে।

চলছে অগ্নিপরীক্ষা।  ছবি : মোমেন 

যদি রাতে থাকতে চান তাহলে বন বিভাগের আওতাধীনে তাবুর ব্যবস্থা আছে, প্রতি তাবুতে ২ জন করে থাকতে পারবেন, তাবু জন প্রতি ১৫০ টাকা ভাড়া, পুরো তাবুতে ২ জন করে থাকা যায়।। পুরো তাবু নিলে ৩০০ টাকা ভাড়া পড়বে। আপনারা চাইলে রাতে নিজেরা বারবিকিউ করতে পারবেন অথবা বন বিভাগের লোকদের বললে তারাই বারবিকিউ করে দেবে। চারপাশের গহীন জঙ্গলে রাত্রিযাপনে নিশ্চিত বিমোহিত হবেন আপনি।

যাক, ধরে নিলাম আপনি থাকছেন না রাতে। তাহলে ট্রি এক্টিভিটি শেষ করে চলে আসুন আবার ফরেস্ট গেইটে। সামনে একটি খাবার দোকানে দুপুরের খাবারের অর্ডার করে চলে যান ট্রেকিংয়ে।

অপরুপ রাঙাপানি চা বাগান।  ছবি :শাম্মা

এবারে আপনার অনুভব করার পালা, কেন অভয়ারণ্য বলা হয়েছে। হিমশীতল পানিতে সামনের দিকে এগুতে প্রতি কদমেই পাবেন রোমাঞ্চকর পরিবেশ। চারদিকে গাছপালায় ঢেকে থাকার বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করতে পারবেন আপনি। মন ভালো করার জন্য এমন পরিবেশের বিকল্প নেই। আবার মাঝেমধ্যে জোঁকের ভালোবাসার বন্ধনেও অাবদ্ধ হয়ে যেতে পারেন। পাখির ডাক, ঝিরিতে দুই এক প্রজাতির মাছের দেখা, ঠাণ্ডা শীতল পানি আর পাহাড়ের উচুঁ নিচু পথ মিলিয়ে এক ভিন্ন স্বাদ পাবেন নিশ্চিত।

দুপুরের খাবার খেতে খেতে আমরা সেরে নিলাম বিশ্রাম পর্বটি। ততক্ষণে আদিবাসী চা শ্রমিকরা বাগানের দিকে দল বেঁধে যাওয়া শুরু করেছে। আর দিনের সকল আলো তখন চা বাগানে। চা শ্রমিকদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও তাদের মনে এক অজানা ভয়ের কারণে ভালোভাবে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। তাদের বিরক্ত না করে ঘুরে বেড়ান নিজের ইচ্ছেমতো।

 চা গাছের সাথে সখ্যতা।  ছবি : শাম্মা 

বিশাল চা বাগানের চারদিকে যত তাকাচ্ছি ততই বিমোহিত হচ্ছি। কী অপরূপ! অমায়িক সুন্দর! আমরা চা বাগানে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম একটি ছোট ছড়া। দিনের শেষ পদচিহ্নটা ওখানেই রেখে চলে এলাম।

যেভাবে যাবেন:

আপনি যদি চট্টগ্রাম থেকে যেতে চান তবে প্রথমে অক্সিজেন থেকে ফটিকছড়িগামী বাসে বিবিরহাট বাস স্ট্যান্ডে নামুন। সেখান থেকে লোকাল সিএনজি করে হাজারিখিল বাজারে নামলে ভাড়া জনপ্রতি ৩৫ টাকা আর যদি ফরেস্ট অফিসে নামেন তাহলে ৪০ টাকা লাগবে। ফরেস্ট অফিসে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই ট্রি এক্টিভিটি করার জায়গা দেখিয়ে দেবে। ৫ স্টেপের এই চ্যালেঞ্জের জন্য জনপ্রতি ফি ১০০ টাকা।

আর যারা ঢাকা বা দেশের যেকোনো শহর থেকে আসতে চান, তারা চট্টগ্রাম শহরে আসার পর লালখান বাজার ফ্লাইওভার দিয়ে অক্সিজেন যেতে পারবেন বা দুই নম্বর গেইট থেকে অক্সিজেন যেতে পারবেন বা মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন যেতে পারবেন।

প্রচ্ছদ ইমেজ : মোমেন উদ্দিন 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যে কারণে বন্ধ করা হচ্ছে সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন

রাঙামাটির পেদা টিং টিং: সাধারণের মাঝে এক অসাধারণ রেস্তোরাঁ!