গুলমার্গের ঘোড়া ও ২,১০০ রুপির আলপিনের খোঁচা!

২,১০০ রুপির আলপিন আমার বুকে বেঁধেছিল গুলমার্গে গিয়ে!

বলেন কী ভাই? আপনি কি মানুষকে গাধা পেয়েছেন? নাকি অবোধ অবুঝ বা পাগল যে বললেন ২,১০০ রুপির আলপিন আপনার বুকে বেঁধেছে! আর সেই আলপিনের ব্যথা সয়ে, জীবিত ফিরে এসে আমাদেরকে গল্পও শোনাচ্ছন?

ফাইজলামি রাখেন মিয়া!

ভ্রমণ গল্প, তার সাথে ২,১০০ রুপির আলপিনের কী সম্পর্ক? আর তাছাড়া ২,১০০ রুপির আলপিন হয় নাকি কখনো!

খুব অদ্ভুত একটা শিরোনাম, তাই না?

চলুন একটু সময় নষ্ট করে গল্পটা পড়ি বা শুনি, তাহলেই বুঝতে পারবেন ২,১০০ রুপির আলপিন কাকে বলে, কত প্রকার আর কী কী এবং কিভাবে? তখন আপনিও হয়তো স্বীকার করবেন বা নিজেই কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবেন ২,১০০ রুপির আলপিন কী। আর তাতে করে ভবিষ্যতে আপনার লাভ বৈ ক্ষতি হবে না সেটা হলফ করে বলতে পারি।

তো চলুন গল্পটা শুনি এবার।

গুলমার্গ। ছবিঃ তুষার

কাশ্মীর যাবার পরিকল্পনার শুরু থেকে অনলাইন আলোচনা, ইনবক্স পরামর্শ, ফোনে উপদেশ, আর একদম শেষে হাউজ বোটের মালিক পই পই করে বলে দিয়েছে, গুলমার্গে গিয়ে যেন ঘোড়ার মালিক বা দালালের খপ্পরে না পড়ি। এটা একটা বাজে খরচ, এখানে যা করার নিজেরাই করতে পারবো। কারো কোনো রকম সাহায্য লাগবে না, কোনো কারণেই ঘোড়া নিতে হবে না। খুব সাবধান, নিজেদের কাজ নিজেরাই করে নেবে।

সেভাবেই খুব শক্ত মনোবল আর সাহসিকতার সাথে গুলমার্গের ঠিক আগে শেষ চড়াই আর শেষ পাহাড়ের ভ্যালীতে ওঠার সময় গাড়ি ধীর হতেই এক গাইড অনেকটা জোর করেই আমাদের গাড়িতে উঠে পড়লো। এবং উঠে পড়েই গাড়ির জানালাগুলো লাগিয়ে সবাইকে একটা মানসিক ধাক্কা দিল না জানি কী না কী হয়?

এবার খুব সাবধানে, বিশেষ ভঙ্গিমায় আর ভয় আতঙ্ক ধরানো ছল-চাতুরীতে সবাইকে ঘোড়া নেবার উপকারিতা না নেবার অপকারিতা, আর ওখানকার গাইড ও দালালদের নানা রকম ভয় দেখিয়ে মানসিকভাবে প্রায় সবাইকে ঘোড়া দিতে রাজি করিয়ে ফেলল! সেটাও সারাদিনের জন্য আর ইচ্ছামতো ঘোড়ায় ঘোরার লোভ দেখিয়ে! আমি মনে মনে প্রলাপ গুনছি যে হায়রে ধরাটা খেয়েই না যাই, সবাই যেন কঠোর থাকতে পারে ঘোড়া নেবে না সেই পণ করে। তখনও গাইডকে কোনো কিছু বলা হয়নি।

ঘোড়ার সওয়ারি। ছবিঃ লেখক

এরই মাঝে আমাদের চার পরিবারের এক জনের মিসেস বলে উঠলেন, জীবনে একবারই কাশ্মীর এসেছি, আর জীবনে আসা হয় কি না হয়, এত খরচ করবে একটু ঘোড়ায় না চড়লে কী হয় বল?

ব্যস, আর যাবে কোথায়? এই কথা বলে তিনি অন্য ভাবিদের দিকে তাকাতেই, তারাও একই রকম সম্মতি আর ইচ্ছার কথা চোখ আর অভিব্যক্তিতে বোঝাতে লাগলেন। এখন আমরা আর কী করতে পারি, এই একটি ঘোড়ায় চড়া মাত্র ৭০০ টাকার জন্য কথা শুনতে হবে নাকি? আর কারণে বা অকারণে নানা রকম অতৃপ্তির খোঁটার মধ্যে তখন তো এটা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম খোঁটা হিসেবে সবার আগে চলে আসবে!

তাই অনেকটা নিমরাজী হয়েই সবাইকে রাজী হতে বাধ্য হতে হলো, মানসিক আর আর্থিক অসঙ্গতি নয় বাঁধা সত্ত্বেও। বৌদের কাশ্মীর এসে প্রথম আর একমাত্র চাওয়া বলে কথা, এ আর কে ফেলতে পারে বলুন!

বরফে মোড়ানো গুলমার্গ। ছবিঃ লেখক

এই থেকে আমার বুকে আলপিনের খোঁচা লাগতে শুরু করলো ধীরে ধীরে যেটা ২,১০০ রুপির বিশাল এক আলপিনে পরিণত হতে লাগলো! আর একটু ছোট আলপিনের খোঁচাতেই যে পরিমাণ পেইন হয়, সেখানে ২,১০০ রুপির আলপিনে কতটা পেইন আর অসহ্য ছটফটানি যন্ত্রণা হতে পারে ভাবতে পারেন?

আচ্ছা ভালো কথা একটা ঘোড়ার ভাড়া মাত্র ৭০০ রূপী হলে আমার কীভাবে ২,১০০ রুপির ঘোড়া বা আলপিনের খোঁচা লাগলো?

ভাইরে আমি অংকে খুব কাঁচা হলেও এই টাকার অংকে, বিশেষ করে ভ্রমণে বেরিয়ে টাকার হিসেবে খুব না একটু বেশীই ভালো বুঝলেন। নইলে কি ২,০০০ টাকায় মিরিক, ৪,০০০ টাকায় রিশপ-লাভা আর ৫,০০০ টাকায় সান্দাকফু ঘুরে আসতে পারি?

কারণ একটা ঘোড়ার ভাড়া ৭০০ টাকা হলেও আমাকে যে তিন তিনটা ঘোড়া নিতে হবে! ভাবতে পারেন? তিনটা ঘোড়া নেয়া মানে এক টানে ২,১০০ রুপির আলপিনের খোঁচা লাগা! শুধু বুকে নয় কলিজায়! এখানে শুধু চিনচিনে ব্যথা হয় না, অনবরত রক্তক্ষরণ হয়। সেটাও যখন দেখা গেল আমি ঘোড়া নেব না বলাতে কাউকেই দেবে না বলে দিল! এমনকি বাপ-বেটার এক ঘোড়া নিলেই কাউকে ঘোড়া দেবে না বলে মানসিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করলো! অগত্যা অন্য সবার কথা ভেবে আমাদের তিন জনকেই তিনটা ঘোড়া নিতেই হলো। মানে ২,১০০ টাকার আলপিনের খোঁচা লাগতে শুরু করলো অনবরত!

গুলমার্গের সমতলে ঘোড়ায় চড়ে। ছবিঃ লেখক

সেই ২,১০০ রুপির আলপিনের খোঁচা ধীরে ধীরে আরও গভীরে বিঁধতে লাগলো যখন, ২০ মিনিটের গণ্ডোলা রাইডের কাছে নিয়ে গিয়ে, পরে আবার নেমে আসার পরে মাত্র ৩০ মিনিট কোনো অরণ্য, পাইন বন বা পাহাড়ি রোমাঞ্চকর রাস্তায় রাইড না দিয়ে, মিহি পিচ ঢালা রাস্তায় ঘোড়ায় চড়িয়ে বা হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে এসে নামিয়ে দিয়ে পুরো সবাইকে এক একটা বলদ বানিয়ে ছেড়ে দিল!

আমার মাথায় তখন আগুন জ্বলছে, গায়ের রক্ত ২,১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচায় ঠিকরে বের হচ্ছে, হাত-পা নিশপিশ করছে কিছু একটা করে শোধ তোলার জন্য! এত সহজে আমি ছেড়ে দেবার পাত্র নয় মামু! আমাকে ২,১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচা দেবে আর আমি শুধু খেয়ে হজম করবো সেটা ভাবলে বড় ভুল করেছ! আমি ২,১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচা খেলে তোমাকেও সুঁইয়ের গুঁতো আমি দেবই দেব!

শালারা জীবনে কাউকে ছেড়ে কথা কইলাম না, হিসেব ছাড়া যে কাউকেই এক কানাকড়ি ছাড় দেয় না তাকে ২,১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচা দিয়ে মিটিমিটি হাসবে আর ভেড়ার কাবাব দিয়ে পেট পুরে খেয়ে দাঁতে সুখের টুথপিক লাগাবে সে কী করে ভাবলে?

ঘোড়ায় চড়ার আনন্দ। ছবিঃ লেখক

তাই আমিও একখানা বেশ শিক্ষা দিয়েছিলাম আর ওদের কাছ থেকেই আদায় করেছিলাম জীবনের অন্যতম আর এখন পর্যন্ত করা সেরা অ্যাডভেঞ্চারটি, যেটার রোমাঞ্চ ছাড়িয়ে গেছে আমার জীবনের সকল রোমাঞ্চকেও!

তাই এই গল্প পড়েও যারা বুঝবেন না তাদেরকে বলছি, গুলমার্গে অযথা ঘোড়া নিয়ে একটা পয়সাও নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। যদি সেটা করেন, তো শেষে আমার মতো আলপিনের খোঁচা খাবেন!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অভিযান কেওক্রাডং

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়