সবুজে সাজানো কাশ্মীরের গুলমার্গ ভ্রমণ

কাশ্মীর ভ্রমণের প্রথম দিনের সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা আর রাত ছিল শুধুই ডাল লেকের মুগ্ধতা, হাউজ বোট ভিন্নতা আর সিকারায় ভেসে বেড়ানোর জন্য বরাদ্দ। সেই গল্প কিছু করেছি। আর দ্বিতীয় দিনটি ছিল গুলমার্গের জন্য বরাদ্দ। গুলমার্গের সবুজ গালিচা, রোপওয়ে বা গণ্ডোলায় চড়ে ১,৪০০+ ফুট উঁচু পাহাড়ের বরফের চূড়া, আর বিভিন্ন হিন্দি সিনেমার শুটিং লোকেশন দেখার জন্য।
বেশ একটা ঝলমলে সকালেই আমরা, আমাদের নির্ধারিত টেম্পো ট্রাভেলারে চেপে বসলাম আয়েশ করে। শ্রীনগর থেকে শহর ছাড়িয়ে সমতলের রাস্তা ধরে শাঁ শাঁ করে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি ৬০ কিলোমিটার দূরে গুলমার্গের পাহাড়ি পথ আর বরফে ঢাকা পাহাড় চুড়ার দিকে। পথে পড়েছে নানা রকম ফুল-ফলের সাজানো দোকান, নানা রকম সবিজি আর মাঝে মাঝে আমাদের দেশের মতোই ধান ক্ষেত সমৃদ্ধ সমতলভূমি।

সবুজের চাদর চারদিকে!ছবিঃ লেখক

প্রায় ৪০ মিনিট চলার পরে আমাদের গাড়ি বামে বেশ নির্জন আর একটু অন্য রকম ঝকঝকে একটা রাস্তায় চলতে শুরু করলো। সেই সাথে একটু পর পর ছোট ছোট বাজারের মতো লোকালয়ে চোখে পড়তে লাগল নানারকম বেকারি আইটেমের মহাযজ্ঞ। প্রথম প্রথম তেমন একটা পাত্তা না দিলেও, একটু পরে এক জায়গায় আসমাদের গাড়ি কিছুটা ধীর গতি নিতেই বিশেষভাবে চোখ আটকে গেল ওদের নানা রকমের, ধরনের, রঙের, আকারের বেকারি আইটেমগুলোর দিকে। এমন করে সাজানো আর এতটা লোভাতুর করে বানানো যে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হলাম। এবং ড্রাইভারকে বলে রাখলাম, ভালো একটা জায়গা দেখে যেন আমাদের গাড়ি থামানো হয়, যেন আমরা এসব কিনে নিতে পারি।
গাড়ি চলছিল তার নিজের গতিতে। একটু পরে ঝকঝকে রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে দূরে উঁচু পাহাড়েরা উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলো, অদ্ভুতভাবে সাদা বরফের মুকুট মাথায় দিয়ে তারা আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। আর তার চেয়েও বেশী মনোমুগ্ধকর লাগতে লাগল রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট নানা রঙে সেজে থাকা, আর নানা আকারের বর্ণিল দোতলা বাড়িগুলো। দারুণ নান্দনিক কারুকাজ, কাঠের অসাধারণ সব ফ্রেম, বিশাল বিশাল কাঁচের জানালা, রঙিন সব ঢেউ খেলানো উঁচু-নিচু বাড়ির নানা রকম ছাদ আর সেসব বাড়ির বারান্দা, বেলকনি বা সবুজ গালিচায় ইচ্ছেমতো রঙিন ফুলের ছড়াছড়ি।
সবুজে সাজানো সবকিছু! ছবিঃলেখক

এসব দেখতে দেখতেই আমরা এক সময় গুলমার্গের বড় রাস্তা শেষ করে, ছোট, পাহাড়ি, উঁচুনিচু আর ঢেউ খেলানো রাস্তার মুখে এসে বিশ্রামের জন্য বা বেকারির নানা রকম খাবার কিনতে থামলাম। আমাদের চার পরিবারের সবাই কমবেশী নানা স্বাদের বিস্কিট, কেক, পেটিস আর শুকনো খাবার কিনে নিলাম। সেই সাথে প্রথম পাহাড়ি উপত্যকার কিছু ছবি তো অবশ্যই।
আমাদের গাড়ি আবারো চলতে শুরু করল। এবার সামনের ১৪ কিলোমিটার শুধুই পাহাড়ের গা, পা আর পিঠ কেটে, কেটে বানানো মিহি, ঢেউ খেলানো রাস্তা দিয়ে আকাশের পানে উঠে যাওয়া। চারপাশে সবুজ বনভুমি, পাইনের ঘন অরণ্য, সবুজ ঘাসের গালিচা, বুনো ফুলে সেজে থাকা আঁকাবাঁকা রাস্তা, নানা নাম না জানা পাখির কিচিরমিচির, অবাক করা কোকিলের পরিচিত সুমধুর সুর!এই সব বন, পাহাড়, ফুল আর পাখির অনিন্দ্য মোহে মোহাচ্ছন্ন হয়ে, মিহি পিচ ঢালা পাহাড়ি, ঢেউ খেলানো পথে হেলতে, দুলতে আমরা পৌঁছে গেলাম একদম যেন শিল্পীর হাতে আঁকা সবুজে সাজানো কোনো পাহাড়ি ভ্যালীতে।
সবুজ পাইনের বন, ছবিঃ লেখক

যার চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাহাড়, মনকাড়া সবুজ ঘাসে মোড়ানো, ফাঁকে ফাঁকে দুই বা তিন পাহাড়ের ভ্যালী। পাহাড়ে পাহাড়ে কোথাও সবুজ ঘাস, কোথাও পাইনের অরণ্য, কোথাও নানা রকম সাদা, হলুদ আর বেগুনী-গোলাপি ফুলের ইচ্ছেমতো বিচরণ। কোথাও পাইন কাঠের পাটাতনে বানানো বাড়ির বারান্দা, কোথাও নানারকম পাথরে বানানো প্রাকৃতিক কারুকাজের মজবুত কটেজ, তবে সব বাড়ির বারান্দা বা সবুজ লনে আছে নানা রঙবেরঙের ফুলের সমাহার, যেন কেউ নিজ হাতে ছবি এঁকে রেখেছে! এতটাই গোছানো আর ছিমছাম।
পুরো গুলমার্গের ভ্যালী জুড়ে শুধু সবুজ ঘাসের মায়াবী আকর্ষণ, পাইন বনের রোমাঞ্চকর আকর্ষণ, কাঠ আর পাথরের কারুকাজের বাড়িগুলোর অন্য রকম মোহাচ্ছন্নতা, ফুলের বনে হারিয়ে যাবার ইচ্ছা, মেঘ আর কুয়াশায় লুকোচুরি খেলে, দারুণ আরামের মিষ্টি রোদে শুয়ে শুয়ে চা বা কফির স্বাদ নেবার লোভ সামলানো মুশকিলই নয় অসম্ভবও বটে।
তাই সেই অমোঘ আকর্ষণে নিজেদের সমর্পণ করা হলো কিছু সময়ের জন্য, সবুজে সাজানো গুলমার্গের বর্ণিল পাহাড়ি উপত্যকায়। চা-কফি, ছবি তোলা আর নানা রকম গল্প করে। নিমেষেই যেন কেটে গেল অনেকটা সময়। ওদিকে এরই মধ্যে আমাদের গণ্ডোলা রাইডের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। তাড়া পড়েছে এসব আয়েশ ছেড়ে সামনে আরও রোমাঞ্চকর ১৪,০০০ ফুট উপরে বরফের রাজ্যে যাবার, রোপ ওয়ে বা গণ্ডোলাতে চড়ে। তাই উঠতেই হলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও। সামনেই যে অনেকের জীবনের প্রথম বরফ দেখার, বরফ ছোঁয়ার, বরফ নিয়ে খেলার, বরফ ছুঁড়ে মারার আর বরফে গড়াগড়ি খেয়ে নিজেকে হারিয়ে ফিরে পাবার অনন্য আহ্বান আর অনবদ্য রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছে।
সবুজের সমারোহ, ছবিঃ লেখক

সেই গল্প আর একদিন হবে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে ট্রেন-বাস বা বিমানে কলকাতা-দিল্লী-শ্রীনগর হয়ে জীপ বা কারে করে গুলমার্গ। শ্রীনগর থেকে গুলমার্গের গাড়ি ভাড়া নেবে ২,২০০ থেকে ৩,২০০ পর্যন্ত। নির্ভর করবে কতজনের জন্য উপযুক্ত গাড়ি আপনি নেবেন। ভালো হয় ৪/৬/৮ জনের গ্রুপ করে গেলে। তাতে করে গাড়ি আর হোটেল দুই জায়গাতেই অনেক সাশ্রয় করতে পারবেন।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উত্তরার কাঁচকুড়ায় একবেলা

মেঘালয়ে মেঘবিলাস : শিলং শহরের কড়চা