ভেনাসের ভাস্কর্য সম্বলিত হলদে পাড় মেরুন রঙের শশীলজ

ময়মনসিংহ ঘুরতে গেলে প্রথমেই যে জায়গাটির নাম আসে, তা হলো মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর পালক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণকৃত দ্বিতল ভবন ‘শশীলজ’। ভালুকা থেকে ভোর সকালে বের হবার সময় আমাদের পরিকল্পনার প্রথমে ছিল, আঠারো বাড়ি জমিদার বাড়ি ঘোরার। কিন্তু ভালুকা থেকে ত্রিশাল আসার পর জানতে পারি, ময়মনসিংহ থেকে আঠারো বাড়ি যাবার কোনো লোকাল যানবাহন নেই। সিএনজি ভাড়া করে যেতে হবে। সিএনজি ভাড়া শুনে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! ১,৮০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছে! ময়মনসিংহ পুরোটা ঘুরতেও তো এত টাকা লাগবে না। অগত্যা, পরিকল্পনার পরিবর্তন। ঠিক হলো, এখন শশীলজ যাবো।

ভেনাসের ভাস্কর্যসম্বলিত হলদে পাড় মেরুন রঙের শশীলজ। সোর্স: লেখিকা

ত্রিশাল থেকে আবার বাস ধরতে হলো ময়মনসিংহ আসার জন্য। বাস থেকে নেমে অটোয় চড়ে বসলাম। কয়েক পাঁক এদিক ওদিক ঘুরে অটোওয়ালা শশীলজ পেরিয়ে যাচ্ছিল। আমি তখন রাস্তার দুইধার দেখছি। শশীলজ লেখা বিশাল গেটটা দেখে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘ওই তো শশীলজ!’
সবে নয়টা বিশ। শশীলজের গেট খোলে দশটায়। এখন কী হবে? চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকব গেটের সামনে? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রাস্তা পেরুলাম। তখনই একজন গেট খুলে বেরিয়ে এলো। সাথে সাথে আমরা গার্ডকে পাকড়াও করলাম। গলায় সবটুকু মধু ঢেলে বললাম, ঢাকা থেকে এসেছি আমরা, দয়া করে যেন ঢুকতে দেওয়া হয়। লোকটা প্রথমে রাজি না হলেও রনি ভাইয়ার মালিশকৃত তেলের বদৌলতে পরে রাজি হলো। কিন্তু ঢোকার সাথে সাথেই বললো, আগে যেন পেছন দিকে চলে যাই। কর্তৃপক্ষ দেখতে পেলে সমস্যা হবে। প্রবেশপথের একধারে শশীলজের ইতিহাস লেখা স্তম্ভ দেখতে পেলাম। চট করে ওটার ছবি তুলে পিচঢালা রাস্তা ধরে লজের পেছনের দিকে পা বাড়ালাম।
তোরণদ্বার। সোর্স: লেখিকা

ময়মনসিংহের রাজবাড়ি বলতে মহারাজ সূর্যকান্ত নির্মিত দৃষ্টিনন্দন শশীলজ কটেজকেই বোঝায়। তিনি কিন্তু রাজা ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই ছিলেন মহারাজা। আলাপশিং পরগনার চার আনা রাজ্য ছিল তাঁর। আজ যাকে লোকে মুক্তাগাছা নামে চেনে, সেখানে ছিল তাঁর বাড়ি। তাঁর পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদের নবাবদের প্রিয় পাত্র ছিলেন। নবাবদের প্রশ্রয়ে তাঁদের রাজ্য বেশ ভালোই চলছিল। পলাশীর আম্রকাননে বাংলার সূর্য ডুবলে আলাপশিং পরগনায়ও আঁধার ঘনায়। তবে ব্রিটিশরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দিলে আলাপশিংয়ে সূর্য আবার উদিত হয়।
মহারাজা সূর্যকান্ত সংস্কৃতিসেবী মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন থিয়েটারের পৃষ্ঠপোষক। বঙ্গভঙ্গ রোধ আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। অনেক জনহিতকর কাজ করেছেন।
বিশালাকার শশীলজের পাশের দিক। সোর্স: লেখিকা

গঙ্গাদাস গুহ রোডে জেলা পরিষদ ভবনের বিপরীতে এর বিশাল উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে বাড়িটির দিকে তাকালে সবুজ গাছ-গাছালির সমাবেশে অদ্ভুত সুন্দর নারী ভাস্কর্যসহ হলদে পাড় মেরুন বাড়িটি যে কাউকে চমকে দেয়। বিশাল এ বাড়িটিতে আছে অসংখ্য দুর্লভ বৃক্ষের সমারোহ। যেমন: নাগালিঙ্গম, জ্য অর্জুন, জামরুল-বকুল, রাঁধাচূড়া, গোলাপ-কামিনী ইত্যাদি। নাগালিঙ্গমের ফল নাকি হাতির পছন্দের খাবার। শশীলজের পেছনেই ছিল সত্যজিৎ রায়ের দাদা উপেন্দ্রকিশোরের দুর্লভ ভবন। এখন ওটা ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। ১৯৫২ সাল থেকে শশীলজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের একমাত্র সরকারি মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ। এখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শশীলজের পিছনের দিকে সবুজ ঘাসের আঁচল পাতা উঠোন। সোর্স: লেখিকা

শশীলজ ও এর সাথে জড়িত জমিদারদের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত গল্পটি খুব করুণ। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণআচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উত্তরসূরি রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী ছিলেন নিঃসন্তান। অথচ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সম্পত্তি সংরক্ষণে একটি ছেলে সন্তানের ভীষণ প্রয়োজন ছিল তার। কোনো উপায় না দেখে তিনি দত্তক ছেলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নেন রঘুনন্দন। মৃত্যুর আগে তিনি তার হাতে জমিদারির দায়িত্ব অর্পণ করেন।
জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি। সন্তানহীন অবস্থায়ই তার অকালমৃত্যু হয়। গৌরীকান্তের বিধবা স্ত্রী বিমলা দেবী দত্তক নেন কাশীকান্তকে। দীর্ঘ রোগযন্ত্রণায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় কাশীকান্তও পরলোকগমন করেন। তার বিধবা স্ত্রী লক্ষ্মী দেবী পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে চন্দ্রকান্তকে দত্তক নেন। বংশটায় লোকের কুনজর ছিল কি না, কে জানে! চন্দ্রকান্তও অতি দ্রুত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে হাল ছাড়লেন না লক্ষ্মী দেবী। পুনরায় দত্তক নেন তিনি। দ্বিতীয় দত্তক নিলেন পূর্ণচন্দ্র মজুমদারকে। পরে মহাসমারোহে লক্ষ্মী দেবী দত্তক ছেলের নতুন নাম রাখেন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। তিনি ছিলেন দীর্ঘ শাসনকর্তা।
সাদা রঙের শাণ বাঁধানো ঘাটের অপরিসর পুকুরখানি। সোর্স: লেখিকা

প্রায় ৪১ বছর জমিদারি পরিচালনার সময় অনেক জনহিতকর কাজ করেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। উন্নত শিক্ষার বিদ্যাপীঠ আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। উনবিংশ শতকের শেষের দিকে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থল বর্তমান বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে ৯ একর জমির ওপর একটি অসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন সূর্যকান্ত। নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তক ছেলে শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হয় শশী লজ। মহারাজা সূর্যকান্ত লজটিকে খুব জাঁকালো করে বানাতে চেয়েছিলেন। সে সময় তিন লাখ টাকা খরচ করে প্যারিস থেকে আনানো হয়েছিল মিউজিক্যাল স্টেয়ারবক্স (পা রাখলে সংগীত বাজে) লাগানো হয়েছিল লজে।
দ্বিতল স্নানঘর। সোর্স: লেখিকা

লালচে ইট আর হলুদ দেয়ালের এ ভবনটি ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়। মহারাজা খুব কষ্ট পেলেন ওতে, বিশেষ করে ওই সংগীত সোপানটির জন্য। এরপর ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুনভাবে শশী লজ নির্মাণ করেন তৎকালীন জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। জার্মান গথিক আর ইসলামী স্থাপনা রীতির মিশেল ঘটানো হলো এর মধ্যে। সুদূর ইতালি থেকে আনানো হলো ভেনাসের মর্মর মূর্তি। বসানো হলো রঙিন ফোয়ারার মাঝে।
১৯১১ সালে সৌন্দর্যবর্ধনে তিনি কিছু সংস্কার কাজ করেন। তার উদ্যোগে শশী লজ হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন একটি বাড়ি। শশী লজের মূল ফটকে রয়েছে ১৬টি গম্বুজ। ভেতরে প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে একই রকম দেখতে ঝাড়বাতি। সাধারণ বসতঘর ছাড়াও আছে নাচঘর, স্নানঘর। স্নানঘরে আছে একটি সুড়ঙ্গ। ধারণা করা হয় এই সুড়ঙ্গপথেও আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মূল ভবনের পেছন ভাগেও রয়েছে স্নানঘর। বাড়ির পিছনে একটি দৃষ্টি নন্দিত জলাশয়ের পাশের এই স্নানঘরটি দোতলা। বাংলাদেশের অনেকগুলো জমিদারবাড়ি ঘুরেছি, কিন্তু এরকম দোতলা স্নানাগারের এমন আভিজাত্য দেখিনি। প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ইতিহাসস্তম্ভে লেখা না থাকলে বুঝতেও পারতাম না, এই ঘরটি স্নানের জন্য ব্যবহার করা হতো! এখানে বসে জমিদারের স্ত্রী পাশের পুকুরে হাঁসের খেলা দেখতেন। পুকুরের ঘাট মার্বেল পাথরে তৈরি।
শুভ্র দোতলা স্নানঘরটির সামনের দিক। সোর্স: লেখিকা

শশী লজের মূল ভবনের সামনে বাগানের মাঝখানে আছে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্নানরত একটি মূর্তি। বর্তমানে এই মূর্তিটির কাছাকাছি যেতে দেওয়া হয় না। দেখতে হলে দূর থেকেই দেখতে হবে গ্রিক দেবীকে।
পাশেই রয়েছে পদ্মবাগান। শশী লজের ভেতরে বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়। সেই রঙ্গালয়ের এক পাশে বিশ্রাম ঘর। বিশ্রাম ঘরের পর কাঠের মেঝেযুক্ত হলঘর। হলঘরের পাশেই বর্ণিল মার্বেল পাথরে নির্মিত আরেকটি ফোয়ারা। অবশ্য এখন আর এসব দেখার কোনো উপায় নেই। বাইরে থেকে শশীলজের সৌন্দর্য দেখেই তৃপ্ত হতে হবে।
মূল বাড়িটি একটি উঁচু প্লাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে। সোর্স: লেখিকা

ভবনটির পেছনে আসার জন্য পিচঢালা রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। একজায়গায় দেখলাম জামগাছ। জামতলায় বিছিয়ে রয়েছে জাম। খুঁজে পেতে কয়েকটা আস্ত জাম তুলে নিয়ে মুখে পুরে নিলাম। জাম খেতে খেতেই লজের পিছনে চলে এলাম। প্রথমেই চোখে পড়লো সাদা শান বাঁধানো ঘাটের অপরিসর একখানা পুকুর। জলাশয়ের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি জরাজীর্ণ ঘাট রয়েছে। তার দক্ষিণ পাশেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র দোতলা স্নানঘরটি। দ্বিতল স্নানঘাটটির শুভ্রসৌন্দর্য সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ। এখানটায় একচিলতে উঠান আছে। সবুজ ঘাসের আঁচল পাতা রয়েছে সেই উঠোনে।
যেখানেই প্রাচীনত্ব থাকবে, সেখানেই আমার পদচিহ্ন ফেলে আসব। সোর্স: লেখিকা

দেশ বিভাগের সময় শশীলজ ফেলে গৃহস্বামী চলে গেলেন কলকাতায়। ক্রীড়ামোদী শশীকান্ত অক্সফোর্ডে পড়েছিলেন। তাই দেশভাগের পর তাঁর আর এই বাংলাদেশে পড়ে থাকার উপায় ছিল না। ফলে শশীলজ দেখাশোনা করার কেউ ছিল না।
শশীলজের প্রধান তোরণ। সোর্স: লেখিকা

অনাদরে, অযত্নে শশীলজের দেহ থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করলো। দেবী ভেনাসের গায়ে জন্মাতে থাকল শৈবাল, ছত্রাক। একাত্তরের যুদ্ধেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই নান্দনিক স্থাপত্যটি। ২০১৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের অধীনে নেওয়ার পর এটি সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী এ বাড়িটির দায়িত্বে রয়েছেন।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোয় করে শশীলজ। অটো ভাড়া ১০ টাকা।
তথ্যসূত্র :
http://www.kalerkantho.com/amp/print-edition/oboshore/2016/02/20/326851
http://www.samakal.com/mymensingh/
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্বের সুন্দর কয়েকটি খাল

ভরা বর্ষায় আমিয়াখুম অ্যাডভেঞ্চার সাথে কাইক্ষাং ঝর্ণা