ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অনিন্দ্য সুন্দর গ্রাম ঘাটেরকোণায়

ঠিক হয়েছিল, এপ্রিলের শেষদিকে চারদিনের লম্বা ছুটিতে আমরা সেন্টমার্টিন যাব। প্ল্যান প্রোগ্রাম চলছে, হঠাৎ করেই আমাদের বন্ধুবৃত্তের সবার দাদা সারোয়ার জানালো, এক তারিখ তার বিয়ে। গ্রুপচ্যাটে রীতিমতো আহাজারি পড়ে গেল। এই বন্ধটাতেই বিয়ে করতে হলো সারোয়ারকে? আমাদের সেন্টমার্টিন পরিকল্পনা বানচাল করাই বুঝি তার উদ্দেশ্য?

কী আর করা? বন্ধুর বিয়ে বাদ দিয়ে তো আর সেন্টমার্টিন যাওয়া যায় না! বিয়েতে যাওয়ার তোড়জোড় চলতে থাকলো। যাবার দিন, সকাল থেকেই ঝুম বৃষ্টি! আমার এই বন্ধুবৃত্তের সাথে বেড়াতে গিয়েছি, আর বৃষ্টি হবে না, তা কি হয়? প্রত্যেকবারই প্রচণ্ড বৃষ্টি থাকে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনোই আমাদের বেড়ানোয় বাঁধা দিতে পারেনি।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপন্ন হয় এই ময়মনসিংহে। সোর্স: লেখিকা

লম্বা সরকারী ছুটি হওয়ায় বাস-ট্রেন কোনো জায়গার টিকিটই সহজ প্রাপ্য নয়। তার উপরে সড়ক পথে ঢাকা-গাজিপুরের বিখ্যাত জ্যাম তো আছেই। সবকিছু বিবেচনা করে ট্রেনের টিকিট কাটা হলো।
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ট্রেন। এয়ারপোর্ট এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি আর মানুষের ভিড় দেখছি। এতো মানুষ ঠেঙ্গিয়ে কী করে ট্রেনে উঠবো?

তেরোজনের সার্কেলে আমরা তিনজন মেয়ে। সার্কেলের তিনজন ট্রেনেই আছে, আমাদের সিটের দখল নিয়ে রেখেছে। তারপরেও ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে সিট পর্যন্ত যাওয়ার পর্যন্ত প্রচণ্ড রকম হেনস্তার শিকার হয়েছি আমরা তিনজন।

পায়ে চলা পথ। সোর্স: লেখিকা

সিটে বসার পর ট্রেনে আগে থেকে সিট দখল রাখা তিন বন্ধুর উপর খুব রাগ হলো। ভেতরে এমন জঘন্য অবস্থা, অথচ ওরা সাহায্য করলে আমরা অনায়াসেই জানালা দিয়ে ঢুকে যেতে পারতাম। খুব একটা সমস্যা হতো না। অন্তত যে দুর্ভোগ পেরিয়ে এসেছি, তার তুলনায় এইটুকু সমস্যাকে কোনো সমস্যা বলেই মনে হতো না। এই চিন্তাটা ওদের মাথাতেই আসেনি।

ময়মনসিংহের কেওয়াটখালি পৌঁছাতে সময় লাগলো চার ঘণ্টা। এরমধ্যেই রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। ওখান থেকে আবার গৌরীপুর যেতে হবে। গৌরীপুর বলতে গেলে ময়মনসিংহের শেষ সীমানায়। আরোও অনেক দূর যেতে হবে।

চা খেয়ে সিএনজি আর ল্যাগুনার সংকর জাতীয় এক ধরনের ভটভটি গাড়িতে চেপে বসলাম গৌরীপুর যাওয়ার জন্য। ব্রহ্মপুত্র ব্রিজ পেরিয়ে কিছুক্ষণ শহুরে রাস্তা ধরে চলার পর মফস্বলের রাস্তা ধরলো ভটভটি।

এই বাড়িটির সাথে হুমায়ূন আহমেদের ‘বৃষ্টি বিলাস’এর অদ্ভুত মিল দেখতে পাচ্ছেন? এটি কিন্তু কোনো বৃষ্টি বিলাসের উদ্দেশ্যে বানানো হয়নি। গ্রামের খুব সাধারণ অথচ অসাধারণ একটা ঘর। সোর্স: মেহজাবিন

রাতের পথচলা মানেই মুগ্ধতা। আরোও যদি হয় নিস্তব্ধ-নির্জন পথ, তাহলে তো কথাই নেই। দুই একটা সিএনজি-ভটভটি হুশহাশ করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আর তেমন কোনো যানবাহন নেই রাস্তায়। মসৃণ রাস্তা আর রাস্তার দুই ধারে বিস্তৃত ধানক্ষেত।

রাতের আঁধার নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে না একবিন্দুও। কারণ আকাশদীপ পূর্ণচন্দ্র নিজের সমস্তটা ঢেলে দিচ্ছে প্রকৃতিতে। এক জায়গায় ভটভটি একটু থামলো। ওখানটায় রাস্তার পাশে প্রকাণ্ড এক বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের চিরল চিরল পাতার ফাঁক বেয়ে গলে গলে পড়ছে চাঁদের আলো। আহা! কী মোহনিয়া সেই দৃশ্য। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে দুটো বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে গেল।

“বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠিছে ওই!”
“হাতভর্তি চান্দের আলো, ধরতে গেলে নাই!”

ধু ধু করা ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে জয়নাল হঠাৎ জুলহাসের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, ‘ওই ভবিষ্যৎ বিসিএস ক্যাডার, বল তো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ধান কোথায় উৎপন্ন হয়?’
জুলহাস বিসিএসের জন্য খুব পড়ছে। তাই একটু খোঁচা দেওয়া, আর কী!
ও আগ্রহহীন গলায় নির্দ্বিধায় বলল, ‘জানি নাহ!’
জুলহাসকে হারাতে পেরে হয়তো একটু মজা পেল জয়নাল। ‘যেখানে আছিস, সেখানেই। ময়মনসিংহেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ধান উৎপন্ন হয়।’

ঘাটেরকোনা আনন্দ স্কুল। সোর্স: লেখিকা

ব্যাপারটা যেন এরপর থেকেই বেশি দৃষ্টিগোচর হলো। সারা বাংলাদেশেই ধান উৎপন্ন হয়। তাই যেকোনো জেলায় গেলে বিস্তৃত ধানক্ষেত আমরা দেখিই। কিন্তু এখানটায় সত্যিই অবারিত ধানক্ষেত। এরপর পুরো পথেই খেয়াল করেছি, রাস্তার দুই ধারে যতদূর চোখ যায়, কেবল ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত। কিছু বাড়িঘর আছে, কিন্তু অনেকদূর পর পর একেকটা বাজার।

ঘাটেরকোণা গ্রামে যাওয়ার জন্য আমাদের তেমনই একটা বাজারে থামতে হলো। ততোক্ষণে মধ্যরাত হয়ে গেছে। এরপর হাঁটতে হবে। বেলে মাটির বেশ চওড়া রাস্তা। দিনের বেলায় সিএনজি অটো চলাচল করে। রাত বেড়ে যাওয়ায় এখন আর কোনো যানবাহন নেই। তাই দুই পা-ই সম্বল।

সারোয়ারদের বাড়ির সামনেই এই বেগুনী রঙের কচুরিপানা ফুলে ছেয়ে যাওয়া পুকুরটি। সোর্স: লেখিকা

আমরা মহা উদ্যমে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথমদিকে রাস্তার দুইধারে ঘরবাড়ি। কিছুক্ষণ হাঁটার পর কয়েকজন এগিয়ে গেল সামনের দিকে। পিছন থেকে সজল তাদের বললো, ‘ডানদিকে যা!’ তারা ডানদিকে ঢুকে যেতেই আমরা দ্রুত পায়ে তাদেরকে পেরিয়ে সামনে চলে গেলাম।

নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ওরা যখন অপরিচিত লোকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো, ততোক্ষণে আমরা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছি। বেচারাদের বোকা বানাতে পেরে আমরা হাসিতে ফেটে পড়লাম। কিছুদূর যাওয়ার পর ঘরবাড়ি কমে এলো।

খোলা রাস্তা আর রাস্তার দু’ধারে যতদূর দেখা যায় বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। ধু ধু সেই প্রান্তরে চাঁদের আলোয় জোনাক পোকা মিটিমিটি আলো ছড়াচ্ছে। ক্রমাগত ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডেকে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে কোলাব্যাঙ। হঠাৎ হঠাৎ পেঁচার ডাক যেন পিলে চমকে দিচ্ছে। ওসব গায়ে-মনে মেখে নিয়ে আমরা হাঁটছি আর হাঁটছি।

ঘাটেরকোনা গ্রামের আনন্দ স্কুলের উঠোন। সোর্স: লেখিকা

বাড়িতে এসে যখন পৌঁছেছি, তখন অনেক রাত। পরদিন সবাই মিলে যাব মেয়ের বাড়ি। বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে আমরা মেয়েরা আলাদা। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখি, রাতে আমাদের জন্য বিরিয়ানি করা হয়েছে। এক লোকমা মুখে তুলেই বুঝলাম, এই বাড়ির রান্না বেশ মজার। রাস্তাতেই প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। কিন্তু এতোক্ষণে খিদে মরে যাওয়ায় খুব বেশি খেতে পারিনি। তবে স্বাদটা যেন এখনো মুখে লেগে আছে।

ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় সকালে উঠতেই ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়তে হলো অনেক লোকের রান্নাবান্না আর হৈহুল্লোড়ের আওয়াজ শুনে। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি রান্না নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত। ব্যাপক আয়োজন।

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী জামাই খাবার। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

অবাক হয়ে ভাবছি, বিয়ের দিন সকাল সকাল ছেলের বাড়িতে এত খাবারদাবারের আয়োজন কীসের! আজকে তো মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান। এই বাড়িতে যে কয়জন মেহমান আছে, তাদের জন্য এত আয়োজন করার তো কিছু নেই।

বিয়েবাড়িতে সকালে সাধারণত একটা খিচুড়ি রান্না করে মাংস দিয়ে, ওটা করলেই তো হতো। তাছাড়া বাড়িতে মোট লোক আছে ৫০ জনের মতো। আমরা ছাড়া বাকি সবাই নিজের লোক। বাকি মেহমানরা এখনো আসেনি। তাহলে কি আমাদের জন্যই এতো কিছু? বন্ধুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীরে দোস্ত, এতো আয়োজন কিসের?’

সে মুচকি হেসে বললো, ‘তোদেরকে একটা বিশেষ খাবার খাওয়াবো।’

বিশেষ খাবারের কথা শুনে বললাম, ‘কাহিনী কী, খুলে বল।’ আবারোও মুচকি হাসি হেসে সে চম্পট মারলো। এই বাড়িতে ছেলে আর মেয়ে একসাথে থাকা নিষেধ। রাতের পর আমাদের বাকি বন্ধুদের সাথে আর দেখাই হয়নি।

অগত্যা ওর বোন হ্যাপির কাছে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত আয়োজন কীসের?’
হ্যাপি বললো, তোমরা তো আশপাশ ঘুরে দেখতে চেয়েছিলে। চলো ঘুরে আসি। আমরা একবাক্যে রাজি। বিভিন্ন ঝামেলায় সকালের ওই বিশেষ খাবার তৈরি হতে দেরি হবে। এই ফাঁকে আমরা নুডুলস, সেমাই, মিষ্টি খেয়ে গ্রামটা ঘুরে দেখতে বের হলাম।

ঘাটের কোনার আনন্দ স্কুলের সামনের গোলাপের ঝাড়। সোর্স: লেখিকা

বের হয়েই দেখি আমাদের বাকি বন্ধুরা সব পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সাথে, ‘কী খবর, ঘুম কেমন হলো’ টাইপ প্রশ্ন করে পুকুর ঘাট থেকে সরে গেলাম। কারণ, ছেলেদের সাথে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা সারোয়ারের মামা বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। গ্রামের অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করার পর হ্যাপি জামাই খাবারের আদ্যন্ত বলতে শুরু করলো।

‘আমাদের ময়মনসিংহে বিয়ের দিন সকালে ছেলের বাড়িতে খুব মজা হয়। কাদা ছোঁড়াছুড়ি, রঙ মাখামাখি চলে। অন্যেরা তো করেই, বরকেও কাদায় ফেলে প্রায় গোসল করিয়ে দেওয়া হয়। তারপর বরকে জলচৌকিতে দাঁড় করিয়ে গোসল করানো হয়।

গোসল করানোর পর বরের দুলাভাই বরকে কোলে করে নিয়ে আসে উঠোনে। ওখানে বড়সড় শীতলপাটি পেতে রাখা হয়। বাড়ির সবাই এসে জড়ো হয় এখানে। বিশাল বড় এক পাতে জামাই খাবার দেওয়া হয়। জামাই খাবারে থাকে পোলাও, আস্ত কবুতরের ফ্রাই, আস্ত চিকেন ফ্রাই, বিভিন্ন ধরনের বড়া, বিভিন্ন ধরনের ঝাল পিঠা, চালকুমড়োর পাতা দিয়ে ইলিশ মাছের বড়া, চ্যাপা শুঁটকি ভুনা, বিভিন্ন প্রকারের ভর্তা, ভাজিসহ আরোও অনেক কিছু।’

‘সবাই মিলে এক পাতে খাবারটা খুব আনন্দ নিয়ে খায়। আশেপাশের বাড়ির বাচ্চারা হয়তো দেখতে আসে। যে বাচ্চারা দেখতে আসে, মাখানো খাবার তাদের এক লোকমা করে খেতে দেওয়া হয়। তারাও খুব আগ্রহ নিয়ে খায়। আমার মনে আছে, আমি নিজেও ছোটবেলায় এই জামাই খাবার খাওয়ার জন্য আশেপাশের পরিচিতদের বিয়ে বাড়িতে চলে যেতাম। কী মজা লাগতো খাবারটা!’

কাড়াকাড়ি করে খাওয়া হচ্ছে জামাই খাবার। সোর্স: মেহজাবিন

‘কিন্তু এই বাড়ির আবহাওয়া এখন বদলে গেছে। ওরকম উৎসবের কিছুই হবে না। হঠাৎ করেই পরিবারটা খুব বেশি ধর্মপরায়ণ হয়ে পড়েছে। তোমরা তো দেখছোই, বাড়ির অবস্থা। আগে কিন্তু এরকম ছিল না। অথচ এখন যেন এসব হৈহুল্লোড়ের কথা কল্পনাই করা যায় না এখানে।

কথা বলতে বলতেই ধানক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যাচ্ছি। ধানক্ষেত ছাড়াও বেশ কয়েকটা ব্যাপার খুব চোখে পড়লো। ধানক্ষেতের আল ছাড়া এক চিলতে বেশি জায়গা থাকলেই গেরস্থরা আনারস লাগায়। জমির উঁচু পাড়ে তেমনই আনারসের সারি দেখতে পেলাম। দেখেই খুব লোভ লাগলো। কিন্তু পাকেনি তখনো। তাই আর খাওয়াও হয়নি।

জমির উঁচু পাড়ে তেমনই আনারসের সারি। সোর্স: লেখিকা

রাজধানীর পার্ক কিংবা নামিদামি অফিস-বাড়ির সামনের শোভাবর্ধনের জন্য আয়োজন করে সাদা ফুলের গাছ লাগায়। অথচ এই অজপাড়াগাঁয়ের ঝোপঝাড়ে অনাদরেই সেসব গাছ জুড়ে ফুল ফুটে রয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে আরো সামনে এগুতেই একটা স্কুলের সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম।

ভাবলাম, স্কুলটা কেমন দেখে যাই। সাইনবোর্ডের দেখানো পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে অবাক হয়ে ভাবলাম, কোথায় স্কুল? এটা তো একটা বাড়ি। একটা উঠোনের চারপাশ জুড়ে কয়েকটা ঘর। তাহলে স্কুলটা কোথায়? জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল, এটা গতানুগতিক স্কুলের মতো নয়। গোলাপঝাড়ওয়ালা বাড়িটার একটা রুমেই স্কুলের কার্যক্রম চলে। এখন স্কুল বন্ধ।

আমাদের দেখে কয়েকজন গৃহিণী বেরিয়ে এলো ঘর ছেড়ে। নতুন মানুষের প্রতি বাংলার গ্রামের মহিলাদের সীমাহীন আগ্রহ। আমরা কার বাড়ি আসছি, কী হই, কবে আসছি- এসব প্রশ্নের উত্তরের জবাব দিলো হ্যাপিই। বিব্রতকর পরিবেশ ছেড়ে আমরা চলে আসতে চাইলাম, কিন্তু পিছন থেকে তারা প্রবল বেগে ডাকাডাকি শুরু করলো, যেন তাদের ঘরে গিয়ে বসি, কিছু খেয়ে যাই।

এই জায়া-জননীরা তো শহুরে মানুষের মতো আত্মকেন্দ্রিক না যে, পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে জানতে পারবে না। এদের দেখলে বাঙালিদের অতিথিপরায়ণতার স্বরূপ বোঝা যায়। সৌজন্যের হাসি হেসে, কোনো মতে পাশ কাটিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

পা বাড়াতেই সামনে পড়লো দশ বাচ্চাসহ এক মা মুরগি। সে ভেবেছে, আমরা তার বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি করবো। তাই তেড়ে এসে ঠোকর মারতে চাইলো। যখনই বুঝতে পারলো আমরা তার বাচ্চাদের জন্য বিপদজনক নই, আস্তে করে নিজের সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ধানক্ষেতে নেমে শস্যকণা খুঁজতে শুরু করলো।

দশ বাচ্চাসহ এক মা মুরগি। সোর্স: লেখিকা

এখানকার এক বাড়ির বেড়ায় ডিম ফুটে বেরিয়ে আসার পর ডিমের যে খোসাগুলো থাকে, তা একটা নারকেলের শলাকার মধ্যে গেঁথে রাখা হয়েছে। এই ব্যাপারে গ্রামের কিছু কুসংস্কার আছে। দেশি মুরগি পালনকারী এই গ্রাম্য মহিলারা ভাবে, ডিমের এক-একটা খোসা শলা দিয়ে গেঁথে ফেললো মানে, মুরগির বাচ্চার শত্রু কাক, চিল, সাপ, গুইসাপ ইত্যাদি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করলো!

ডিম ফুটে বেরিয়ে আসার পর ডিমের যে খোসাগুলো থাকে, তা একটা নারকেলের শলাকার মধ্যে গেঁথে রাখা হয়েছে। সোর্স: মেহজাবিন

হাঁস-মুরগির সাথে সাথে একটা-দুটো গরুও পালে কিছু গেরস্থ। তাদের বাড়িতে খড়ের গাদা, গরুর গোয়াল আর গরুর খাবারের জন্য সিমেন্টের বিশালাকার পাত্র আছে। গরুর খাবারের এই পাত্রকে স্থানীয়রা ‘নাইন্দা’ ডাকে।

গরুদুটো যেন বুঝতে পেরেছিলো, তাদের ছবি তোলা হচ্ছে। সোর্স: মেহজাবিন

কিছুক্ষণ ঘুরে আমরা সারোয়ারদের বাড়িতে ফিরে এলাম। প্রায় এগারোটা নাগাদ জামাই খাবার প্রস্তুত হলো। তখন আমরা বিয়েবাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি। ছেলে আর মেয়েদের আলাদা পরিবেশন করা হলো। আমাদের তিন-কন্যার জন্য এক পাত্রে এনে দেওয়া হলো জামাই খাবার। খাওয়া শুরু করার আগে আমরা কয়েকবার করেই বলে ফেললাম, ‘এখন তো এত খাবার খেতে পারবো না। কিছু কমিয়ে রাখুন।’

ওরা হেসে বললো, ‘খাওয়া শুরু করো। যতটুকু খেতে পারো, খাও।’ কবুতরের মাংস দিয়ে খেতে শুরু করলাম। প্রথম গ্রাস মুখে দিয়ে মনে হলো, “আহ! এ তো অমৃত!” এরপর কখন যে তিনজনে রীতিমতো যুদ্ধ করে খাবারটা খেয়ে শেষ করেছি, নিজেরাও জানি না। প্রত্যেকটা আইটেম খুবই সুস্বাদু। চেটেপুটে খেয়ে শেষ করেছি। বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার আগেই এক দফায় খেয়ে নিয়েছি পেট পুরে।

ঝোপঝাড়ে অনাদরে গাছ জুড়ে সাদা ফুল ফুটে রয়েছে। সোর্স: মেহজাবিন

তাই বলছি, ময়মনসিংহের কোনো ছেলের বাড়িতে বিয়ের দাওয়াত পান, যেভাবেই হোক চলে যান। খেয়ে আসুন সুস্বাদু জামাই খাবার। আর গ্রাম বাংলার এই রূপের সাথে পরিচয় না থাকলে, তাও দেখে আসুন স্বচক্ষে। হয়তো গ্রামকেন্দ্রিক এই বাংলাদেশে এসব অভিনব কিছু নয়, কিন্তু এরকম প্রত্যন্ত গ্রাম আর গ্রামের মানুষজন আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
ফিচার ইমেজ- মেহজাবিন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইটাখোলা মুড়া: ধ্যানী বুদ্ধ অক্ষোভ্য-অমিতাভ মূর্তি সম্বলিত মন্দির

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহের কুঠিবাড়ী