সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ীর গৌরীপুর জমিদার বাড়ি

ময়মনসিংহ থেকে গোরীপুরে ট্রেনে আসার সময় দুই ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তারা বলেছিলেন, ট্রেন স্টেশন থেকে অটোয় করে আমরা গৌরীপুর জমিদার বাড়ি দেখতে পারবো। ভাড়া পড়বে ১০ টাকা করে। গৌরীপুর জমিদার বাড়ি ঘুরে আবার স্টেশনে আসতে হবে। এখান থেকে রামগোপালপুর মন্দির যাব। ওখানকার ভাড়া ১০-১৫ টাকা।

প্রথমেই চোখে পড়বে এই পুকুর। সোর্স: লেখিকা

অটোকে গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে গেলে মৌলভী অটোওয়ালা জানালো, চাইলে আমরা উনার অটো রিজার্ভ নিতে পারি। এখানে অনেকগুলো জমিদার বাড়ি আছে, সবগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে, তারপর এই স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যাবে। ভাড়া নেবে ৩০০ টাকা। রনি ভাই অনেকক্ষণ ধরে দামাদামি করে ২০০ টাকায় রাজি করালো। তারপর শুরু হলো আমাদের গৌরীপুর উপজেলা ভ্রমণ।
সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ীর ভবন। সোর্স: লেখিকা

মোগল ও সুলতানি আমল থেকে শুরু করে রাজা-জমিদার শাসনামলের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অনেক নিদর্শন রয়েছে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। ঐতিহাসিক অনেক নিদর্শনের জন্য এ উপজেলাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে স্থানীয়রা স্বীকৃতির দাবি জানালেও তা আজও মেলেনি। এদিকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় প্রায় ৩০ ঐতিহাসিক নিদর্শন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে।
সোর্স: লেখিকা

গৌরীপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে জমিদার আমলের বহু প্রাচীন দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন। রয়েছে সুনিপুণ কারুকার্যে নির্মিত প্রাচীন ভবন, অনন্ত সাগর, গোলপুকুর, বৃত্তাকার দ্বীপ, রানীর দীঘি, পামবীথি সড়ক, প্রাচীন দুর্গামন্দির, নাট্যমন্দির (বর্তমান ঝলমল সিনেমা হল), গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জমিদার সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ী ভবন, জমিদার ডিকে লাহিড়ীর ভবন (বর্তমান উপজেলা ভূমি অফিস), রামগোপালপুর জমিদার বাড়ির সিংহী দরজা, শান বাঁধানো ঘাট।
এ ছাড়া রয়েছে জমিদার মহারাজা শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী, রাজা কাশী কিশোর রায় চৌধুরী, যুগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, হরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীসহ বিভিন্ন জমিদারের পুরনো ভগ্ন বসতবাড়ি। রিজার্ভ অটো নিয়ে আমরা গেলাম গোরীপুর জমিদার বাড়িতে। জমিদার সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ীর বাড়িটি বর্তমানে সরকারী কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রাচীন অক্ষরে “গৌরীপুর সরকারী কলেজ” লেখা। সোর্স: লেখিকা

কৃষ্টপুরের জমিদার ছিলেন জমিদার সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ী। তার পূর্বপুরুষ জমিদার দেব্যা বাংলা ১২৫০ সালে নিজের বাসভবন সংলগ্ন স্থানে শ্রী শ্রী গোপাল বিগ্রহ মন্দির স্থাপন করেন। পরে সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ী মন্দিরটি বর্ধিত ও সংস্কার করেন।
শ্বেত পাথরের মেঝে, চীনা টাইলস, মার্বেল পাথর ও ঝাড় বাতির সমন্বয়ে মনোরম এই মন্দিরটিতে স্থাপন করেন রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ মন্দির। তখন থেকে প্রতিবছর এখানে রাস পূর্ণিমায় পূজোর আয়োজন হয়।
জমিদার দেব্যা বাংলা ১২৫০ সালে নিজের বাসভবন সংলগ্ন স্থানে শ্রী শ্রী গোপাল বিগ্রহ মন্দির স্থাপন করেন। সোর্স: লেখিকা

দেখতে এসেছিলাম, জমিদার বাড়ি। বাড়ি তো দেখা হলো, কিন্তু ওতে যে প্রাচীন অক্ষরেই “গৌরীপুর সরকারী কলেজ” লেখা। তাহলে কী ভুল জায়গায় চলে এসেছি? কিন্তু জমিদার বাড়ি তো কম দেখিনি, স্থাপত্যকলা দেখে তো কলেজ বলে মনে হচ্ছে না, জমিদার বাড়িই মনে হচ্ছে। তবে?
পরে সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ী মন্দিরটি বর্ধিত ও সংস্কার করেন। সোর্স: লেখিকা

পরে জানতে পারলাম, ময়মনসিংহের উত্তর জনপদের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ১৯৬৪ সালের পহেলা আগষ্ট সাবেক অধ্যক্ষ মিছবা উদ্দিনের নেতৃত্বে তৎকালীন বিদ্যুৎসাহী ব্যক্তিবর্গ গৌরীপুর পৌর শহরের কৃষ্ণপুর এলাকায় জমিদার সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ীর বাড়িতে শুরু করেন এই বিদ্যাপীঠের যাত্রা। জমিদারের দৃষ্টিনন্দন বাড়ি সহ ২২ একর জমির উপর গড়ে ওঠে কলেজ ক্যাম্পাস।
কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন মরহুম মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর অতিক্রান্ত করে কলেজটি আজ একটি বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং ময়মনসিংহ উত্তর জনপদ ও আশেপাশের অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে এই কলেজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ী মন্দিরটিতে স্থাপন করেন রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ মন্দির। সোর্স: লেখিকা

প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থীর কলতানে মুখরিত হয় কৃষ্ণচূড়া চত্বর, কাঁঠালতলা, বটতলা চত্বর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ এ কলেজটিতে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে অনার্স কোর্স প্রবর্তন করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকির এমপি।
যাক, অন্তত কলেজ করাতেই এখনো টিকে আছে। নইলে ঠিকই পড়ে পড়ে নষ্ট হতো। বটগাছ আর আগাছার জঙ্গলের খোরাক হতো। অবশ্য এখনোও যে খুব ভালো অবস্থায় আছে, তা নয়। কয়েক জায়গায় বাড়িটির যথাযথ যত্ন নেবার ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়ে সাইনবোর্ড লাগানো আছে।
পিছন থেকে জমিদারবাড়ির প্রধান ফটক। সোর্স: লেখিকা

বাড়িটির সামনে ঘাসে ঢাকা জায়গা ছাড়াও রয়েছে একটা টলটলে পানির পুকুর। ১৯৬৭ সালে ময়মনসিংহ জাদুঘর নির্মিত হবার পর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ গৌরীপুর জমিদার বাড়ি থেকে হাতির দাঁতের কারুকার্য খচিত সোফা, ২টি শ্বেত পাথরের মূর্তি, চীনা মাটির টব, প্ল্যাস্টার অব প্যারিস সহ অনেক সামগ্রী উদ্ধার করে জাদুঘরে সংরক্ষণ করে। এসব সামগ্রীও জাদুঘরে গিয়ে দেখে এসেছি। যেহেতু জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার অনুমতি নেই, তাই ছবি দিতে পারছি না।
ঘাসে ছাওয়া আঙ্গিনা। সোর্স: লেখিকা

গৌরীপুরের স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন, পর্যটকদের নিরাপত্তা, ভ্রমণে সহযোগিতা এবং থাকার সুব্যবস্থা করার জন্য ১৯৯৮ সাল থেকে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এ অঞ্চলকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালে মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করা হলেও এর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বীরাঙ্গনা সখিনার ইতিহাস, জমিদারের স্থাপত্যশৈলী ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে গৌরীপুর উপজেলাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
সোর্স: লেখিকা

গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক সভায় ঐতিহাসিক স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মর্জিনা আক্তার বলেন, এ উপজেলার ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আশা করি খুব শীঘ্রই গৌরীপুরের এই প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুর যাবার জন্য ট্রেন-বাস দুটোই আছে। তবে ট্রেনে যাওয়াই ভালো। স্টেশন থেকে অটোয় করে গৌরীপুর জমিদার বাড়ি ওরফে গৌরীপুর সরকারি কলেজ।
তথ্যসূত্র
১। ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক নিদর্শন – দর্জি আব্দুল ওয়াহাব
২। ময়মনসিংহের ইতিহাস – কেদার রায়
৩। গৌরীপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য ও কিংবদন্তি – অধ্যাপক আব্দুল মোনায়েম
৪।http://www.jugantor.com/old/bangla-face/2013/08/01/17591
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: ভোলা মাঝির ভোলার চর

ভ্রমণের সময় নিজেকে যেভাবে সুন্দর ও সতেজ রাখবেন