জমিদার আনন্দ কিশোরের বাসভবন ও দুর্গামন্দির

ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুরের দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। আমাদের ভাগ্যটা ভালোই বলতে হবে কারণ, গৌরীপুর যাওয়ার ট্রেনটি প্লাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছে। আড়াইটায় ছাড়বে। টিকিটের দাম শুনে শিহানের চক্ষু ছানাবড়া। মাত্র ১২ টাকা। তবে টিকিটের গায়ে লেখা ১১ টাকা। আমরা সানন্দেই ১২ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে মোটামুটি ফাঁকা দেখে একটা বগিতে উঠে বসলাম।

প্রধান ফটকের বর্তমান হাল। সোর্স: লেখিকা

গৌরীপুর নেমেই আগে একটা খাবার হোটেলে ঢুকলাম। বেলা চারটা বাজে, পেটের মধ্যে ছুঁচো নাচছে। আশেপাশের হোটেলগুলোর মধ্যে এটাই নাকি একটু ভালো। খাবারের আইটেম শুনে ভাতের সাথে চিকেন আর ডাল ভুনা অর্ডার করলাম। সাথে হাফ লিটার কোক। রনি ভাই কী যেন বললো ওয়েটারের কানে কানে, আমাদের চারজনের খাবার বিল এলো মাত্র ১৬৫ টাকা। ওয়েটারের হাতে ৩০ টাকা গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে।
ট্রেনে দুই ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তারা বলেছিলেন, ট্রেন স্টেশন থেকে অটোয় করে আমরা গৌরীপুর জমিদার বাড়ি দেখতে পারবো। ভাড়া পড়বে ১০ টাকা করে। গৌরীপুর জমিদার বাড়ি ঘুরে আবার স্টেশনে আসতে হবে। এখান থেকে রামগোপালপুর মন্দির যাব। ওখানকার ভাড়া ১০-১৫ টাকা।
জমিদার বাড়ির এই পাশটা সবার জন্য উন্মুক্ত। সোর্স: লেখিকা

ভদ্রলোক দুজন উপযাচক হয়ে আমাদের গৌরীপুর মহিলা কলেজ সহ আরোও কিছু বিদ্যাপীঠ ঘুরে নেবার জন্যও সুপারিশ করেন। সবগুলোর নাম শুনিনি। একটা সম্ভবত ছিল গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়। আমি ফস করে বলে ফেললাম, স্কুল-কলেজ দেখার কী আছে? তখনো জানি না, গৌরীপুরের এসব স্কুল কলেজগুলো হয় জমিদারের নিজের বানানো, নয়তো স্বয়ং জমিদারদের বাস ভবনই।
জানেন না হয়তো, ট্রেনে পরিচিত হওয়া দুই ভদ্রলোকও। কারণ উত্তরে তারা বললেন, এই বিদ্যাপিঠগুলোও দেখতে বেশ সুন্দর। কিন্তু এটা বললেন না যে এগুলো জমিদার বাড়িরই অংশ। সম্ভবত তাঁরা নিজেরাও জানতেন না।
সমাজ কর্ম বিভাগের পিছনের ঝোঁপ জঙ্গলে। সোর্স: লেখিকা

অটোকে গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে গেলে মৌলভী অটোওয়ালা জানালো, চাইলে আমরা উনার অটো রিজার্ভ নিতে পারি। এখানে অনেকগুলো জমিদার বাড়ি আছে, সবগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে, তারপর এই স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যাবে। ভাড়া নেবে ৩০০ টাকা। ট্রেনে পরিচিত হওয়া ভদ্রলোকদের সাথে আলাপ না হলে অটোওয়ালার “অনেকগুলো জমিদার বাড়ি” থাকার খবরটা হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ভাবতাম, ধান্ধাবাজ। কারণ, আমরা জেনে এসেছি গৌরীপুরে দুটো জমিদার বাড়ি আছে। অনেকগুলোর কথা জানতাম না।
ট্রেনের ভদ্রলোক দুজন সরাসরি বিদ্যাপীঠগুলোকে জমিদার বাড়ি বলে উল্লেখ না করলেও ধারণা করে নিয়েছিলাম। রনি ভাই অনেকক্ষণ ধরে দামাদামি করে ২০০ টাকায় রাজি করালো। তারপর শুরু হলো আমাদের গৌরীপুর উপজেলা ভ্রমণ। কুরআনে হাফিজ অটোচালক আমাদের প্রথমেই নিয়ে এলেন গৌরীপুর মহিলা কলেজ তথা জমিদার আনন্দ কিশোরের বাসভবনে।
অন্দরমহলে বাংলা বিভাগ। সোর্স: লেখিকা

গৌরীপুরের আদি জমিদার শ্রী কৃষ্ণ রায় চৌধুরী ‘মহারাজ’ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ফলে গৌরীপুর জনপদটির নামের পূর্বে ‘রাজ’ যুক্ত হয়ে “রাজ গৌরীপুর” নামে পরিচিতি লাভ করে। গৌরীপুর এর আগেও একবার এসে ঘুরে গিয়েছি, এখানকার স্থানীয় এক বন্ধুর অতিথি হয়ে। অথচ গৌরীপুরের রাজকীয়তা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি তখন। ওরা কেউ কিছু জানায়নি।
বাংলা বিভাগের বিপরীত দিকে পরিত্যক্ত দালান। সোর্স: লেখিকা

শহরের মধ্যে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে পড়লো, তা হলো একটা দেয়াল লিখন। কিছুক্ষণ পর পরই দেখতে পাচ্ছি লেখাটা,
“গৌরীপুর জেলা চাই”।
দেখে খুব মজা পেলাম। নোয়াখালী বিভাগ চাওয়ার পর এখন গৌরীপুর জেলা, মজা পাবারই তো কথা।
কলেজের জন্য নতুন ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। সোর্স: লেখিকা

রাজবাড়ির জমিদারদের পূর্বপুরুষ আনন্দ কিশোরের বাসভবনটিই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে গৌরীপুর মহিলা কলেজ হিসেবে। মহিলা কলেজের রাস্তায় এলে প্রথমেই চোখে পড়বে জীর্ণশীর্ণ ফটক। যদিও কালের থাবা এর রাজকীয়তা নষ্ট করে দিতে পারেনি। এক নজর দেখেই বোঝা গেছে, এটিই ছিল আনন্দ কিশোরের বাসভবনের প্রধান ফটক। কিন্তু দ্বার রুদ্ধ। ভেতরে যাবার উপায় নেই। পাশে যেখান দিয়ে ঢোকা যাবে, সেখানটায় নোটিশ লেখা, “ছাত্রী হোস্টেল। বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ।”
তাই আমরা ঘুরে সমাজকর্ম বিভাগের সামনে দিয়ে বাড়িটির পিছনের দিকে গেলাম। আগাছার জঙ্গলে যতদূর হাঁটা গেল, হেঁটে হেঁটে প্রাচীন স্থাপনাটির গায়ে পরগাছার দাপট দেখলাম। এটুকু দেখে মন ভরলো না। ভেতরটা দেখার জন্য মন আকুপাকু করছিলো। তাই ছাত্রী হোস্টেলের সামনে একজন শিক্ষককে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভেতরটায় ঘুরে দেখা যাবে?’
তিনি অনুমতি দিলেন।
দুর্গা ও নাট মন্দির। সোর্স: লেখিকা

মূলত বাড়িটির যে কক্ষগুলো টিকে আছে, ওগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে কলেজের কাজে। বাকিগুলো পড়ে আছে অনাদরেই। শিক্ষকটি আমাদের সিঁড়ি দেখিয়ে জানালেন, চাইলে আমরা উপরেও উঠতে পারি। যেহেতু ছাত্রী হোস্টেল, আর আমাদের গ্রুপে বেশ কজন ছেলে আছে, তাই আমিই মাথা নেড়ে বিনয়ের সাথে উপরে যাবার প্রস্তাব এড়িয়ে গেলাম। নইলে পুরাতন বাড়ির ছাদে যাবার সুযোগ পেলে কী কখনো ছাড়ি?
মন্দিরটির পাশে কারুকাজখচিত বাড়ি। সোর্স: লেখিকা

মহিলা কলেজের কাছেই রয়েছে দুর্গাবাড়ি পূজা মন্দির। দুর্গাবাড়ি ও নাটমন্দিরটির পুনঃসংস্কারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন মুক্তিযোদ্ধা ডঃ ক্যাপ্টেন মজিবুর রহমান ফকির। মন্দিরটির পাশে কারুকাজখচিত একটি বাড়ি দেখলাম। এটি কী কাজে ব্যবহৃত হতো, জানতে পারিনি। মন্দিরের সীমানা ভেতরে হওয়ায় ঢুকে দেখা যায়নি।
বর্তমান গৌরীপুর প্রেসক্লাব। সোর্স: লেখিকা

মন্দিরের ঠিক সোজাসুজি একটা দরজা মতোন আছে। ওটা পেরিয়ে সামনে যেতেই নিকট অতীতে সংস্কারকৃত আরোও একটি দালান দেখতে পেলাম, গোলাপি-টিয়া রঙ করা। দালানের কারুকাজ দেখে বোঝা গেল এটিও আনন্দ কিশোরের জমিদার বাড়িটির অংশ ছিল। বর্তমানে এটি গৌরীপুর প্রেসক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৩ সালে গৌরীপুর প্রেসক্লাবের বর্ধিত ভবনের উদ্বোধন করা হয়।
প্রেসক্লাব ভবনের তাজ। সোর্স: লেখিকা

এখান থেকে ঘুরে একটা চত্বর পেরুলাম। নাম বঙ্গবন্ধু চত্বর।  এই চত্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য বানানো আছে। এছাড়াও আছে চমৎকার একটি স্মৃতিসৌধ।
স্মৃতিসৌধ। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুর যাবার জন্য ট্রেন-বাস দুটোই আছে। তবে ট্রেনে যাওয়াই ভালো। স্টেশন থেকে অটোয় করে গৌরীপুর মহিলা কলেজ।

বঙ্গবন্ধু চত্বর। সোর্স: লেখিকা

তথ্যসূত্র: গৌরীপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য ও কিংবদন্তি – অধ্যাপক আব্দুল মোনায়েম
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রেয়সীর কাছে একটি খোলা চিঠি

এক নজরে একটি জেলা: ভোলা মাঝির ভোলার চর