গোড়ার মসজিদ: বারোবাজারের ৫০০ বছরের পুরনো এক অনন্য স্থাপত্য

বেশ কিছুদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েও গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে উঠতে পারছিলাম না। তারপর একদিন ভাবলাম, সুযোগের অপেক্ষায় থাকলে কখনোই সুযোগ হবে না। তারচেয়ে বরং সুযোগ বের করে রওনা দিতে হবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। এক রাতে ঢাকার শ্যামলী থেকে যশোরগামী বাসে চেপে বসলাম। পদ্মা নদীর আরিচা ঘাটে ৩ ঘণ্টার জ্যাম সহ পরদিন সকাল আটটায় পৌঁছে গেলাম বাড়িতে।
বাড়িতে এসে যেন মহা শান্তি। মায়ের হাতের রান্না খাবো। গ্রামের চায়ের দোকানে আড্ডা দেব। পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হবে। আরো কত কী! কিন্তু সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়? মায়ের হাতের রান্না খাওয়া হলো। গ্রামের চায়ের দোকানে আড্ডা হলো। কিন্তু সব বন্ধুকে আর একত্রে পাওয়া গেল না।

বারোবাজারের গোড়ার মসজিদ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

না পাওয়ারই কথা। কেননা আমার মতো সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। তাছাড়া এমন নয় যে, এটা কোনো বিশেষ ছুটির সময়। সুতরাং এ যাত্রায় বন্ধুদের আড্ডা ছাড়াই কাটাতে হলো। তারপর টানা দুইদিন ব্যস্ত। পারিবারিক কাজ সেরে পরিকল্পনা করলাম আমার বাড়ি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার উত্তরে বারোবাজারের গোড়ার মসজিদ দেখতে যাব।
এই মসজিদের গল্প বহু মানুষের কাছে শুনেছি। চমৎকার স্থাপত্যশৈলী আর ভাবগাম্ভীর্যের এই মসজিদ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন, অথচ আমি এখনো এই মসজিদ দেখিনি!
পরদিন সকালে আমার খুব প্রিয় একজন চাচা, ডাক্তার বিল্লাল হোসেন আর আমি বাইকে চেপে রওনা দিলাম ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের উদ্দেশ্যে। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কে যশোর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তরে এবং ঝিনাইদহ থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বারোবাজারের অবস্থান।
বারোবাজারের গোড়ার মসজিদের দক্ষিণ পার্শ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

বারোবাজার শুধুমাত্র এই একটি মসজিদের জন্য বিখ্যাত নয়। এটি বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নস্থল। সুলতানী আমলের অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বারোবাজারের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেই অর্থে বলা যায়, সুলতানী আমলে বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি ছিল এই বারোবাজার। আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বারোবাজার থেকে পার্শ্ববর্তী তিন চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রচুর দীঘি ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা রয়েছে।
ডাক্তার বিল্লাল হোসেন বাইক চালাচ্ছেন, আর আমি পেছনে বসে দু’দিকের অবারিত সবুজ প্রান্তর দেখছি। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের প্রাচীন গাছগুলো রাস্তার উপর নুয়ে পড়ে যেন আমাদের কুর্নিশ করছে। হঠাৎ মেঘের ডাকাডাকি। মুহূর্তেই ঝমঝম বৃষ্টি। আমার প্রকৃতি দেখায় ছেদ পড়ল। চুড়ামনকাঠি বাজার পার হয়ে সাতমাইল বাজার পৌঁছে আমরা একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম।
বারোবাজারের গোড়ার মসজিদ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

চায়ের দোকানে চলতে থাকা টিভিতে আরব্য রজনীর বিখ্যাত উপন্যাস আলিফ লায়লার বাংলা ডাবিংকৃত চলচ্চিত্রায়ন দেখে আমরা দুজনেই নস্টালজিক হয়ে পড়লাম। মনে পড়ল আমাদের শৈশবে বিটিভিতে এই আরব্য রজনীর গল্প দেখতে প্রতি শুক্রবার টিভির সামনে ভিড় জমাতাম!
আমরা দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। তারপর চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বৃষ্টি থেমে গেল। এই বৃষ্টি যেন আমাদের চা-বিরতির জন্যই এসেছিল। যাই হোক, তারপর আবার রওনা করলাম। দ্বিতীয় বৃষ্টি আমাদের আবার ভেজাল। তবে এবারও রক্ষা। কেননা ততক্ষণে আমরা বারোবাজার পৌঁছে গেছি।
রেললাইন পার হয়ে স্থানীয় হাটের মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকের রাস্তা বেয়ে আমরা চললাম বারোবাজার ইউনিয়নের বেলাট দৌলতপুর গ্রামে। এই গ্রামেই দৃষ্টিনন্দন গোড়ার মসজিদ অবস্থিত।
খুব বেশি দূর যেতে হলো না আমাদের। বারোবাজার থেকে বাইকে চেপে মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম গোড়ার মসজিদের দরজায়। আধুনিককালে নির্মিত টাইলস বসানো দরজা দিয়ে প্রবেশ করে সরু রাস্তা বেয়ে মাত্র ২০ কদম হাঁটলেই চোখে পড়বে ঐতিহ্যবাহী গোড়ার মসজিদ।
বারোবাজারের গোড়ার মসজিদে প্রবেশ পথ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

পাঁচ শত বছর পুরনো আশ্চর্য এই মসজিদ প্রথমবার দেখে আমি বাইক থেকে নামার কথাই ভুলে গিয়েছিলাম! তারপর বিল্লাল চাচার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। ক্যামেরা বার করে ক্লিক, ক্লিক; প্রথমেই কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম।
তারপর পা বাড়িয়ে যতই মসজিদের কাছে যাচ্ছি মনে হচ্ছে আমি যেন পাঁচশত বছর পেছনে ফিরে যাচ্ছি। এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই চমৎকার মসজিদটি প্রথমবার দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। বর্গাকৃতির এই মসজিদটির দেওয়াল জুড়ে চমৎকার কারুকাজ। লাল পোড়ামাটির বিশাল দেহ নিয়ে ৫০০ বছরের ঐতিহ্য বুকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে।
এই মসজিদের নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। তবে কিংবদন্তী আছে, গোড়াই নামে একজন সুফি এই মসজিদে বসবাস করতেন। মসজিদের সামনে আবিষ্কৃত একটি কবরকে সুফি গোড়াইয়ের কবর বলেই ধারণা করা হয়। সুফি গোড়াইয়ের নাম অনুসারে এই মসজিদকে গোড়ার মসজিদ বলে ডাকা হয়। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন, আনুমানিক পাঁচশত বছর পূর্বে হোসেন শাহ এবং তার পুত্র নসরৎ শাহের আমলে কোনো এক সময় এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।
বারোবাজারের গোড়ার মসজিদের ভিতর। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

স্থানীয়রা বহু বছর ধরে বারোবাজারের আশেপাশে অনেকগুলো উঁচু উঁচু ঢিবি দেখে আসছিল। এক সময় স্থানীয়দের মনে কৌতুহল জাগে, এই ঢিবির মধ্যে কী আছে? কৌতুহল থেকেই স্থানীয় মানুষজন একটা একটা করে মাটির ডিবি খুঁড়ে মসজিদগুলো আবিষ্কার করতে শুরু করে। তারই অংশ হিসেবে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মাটির ঢিবি খনন করে এই চমৎকার মসজিদটি আবিষ্কার করেন।
আগের দিনে ভবন নির্মাণ করতে রড সিমেন্ট ব্যবহার করা হতো না। তাই এ ধরনের স্থাপনার দেওয়ালগুলো থাকত অনেক পুরু। এই মসজিদের দেয়ালও কমপক্ষে ৫ ফুট পুরু এবং বর্গাকৃতির। এই মসজিদে তিনটি দরজা রয়েছে, যার মধ্যে মাঝখানের দরজাটি সবচেয়ে বড়। এছাড়া মসজিদের ভেতরে শুধু পূর্বপাশের দেওয়াল বাদে বাকি তিনটি দেওয়ালে চারটি কালো পাথরের স্তম্ভ পাওয়া গেছে।
বারোবাজারের গোড়ার মসজিদের দীঘি। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

মসজিদের দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য পোড়ামাটির নকশা এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। এছাড়া মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে একটি বিশাল দীঘি। মসজিদ থেকে দীঘি পর্যন্ত বাঁধাই করা ঘাট ছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খননকাজ পরিচালনার সময় দীঘি এবং মসজিদের মাঝে ভাঙা ইটের সন্ধান পাওয়া যায়, যা থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। মসজিদের পূর্বদিকে অবস্থিত এই দীঘি থেকে ওযু করে মুসল্লিরা বাঁধানো ঘাট বেয়ে পূর্ব দিক থেকে মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং নামাজ আদায় করতেন।
মসজিদটিতে এখন নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়। স্থানীয় লোকজন কমিটি গঠন করে মসজিদটি পরিচালনা করেন। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের পাশে একটি ছোট্ট ঘর করা হয়েছে; ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং পরিচালনা পরিষদের বৈঠকের জন্য।
বারোবাজারের গোড়ার মসজিদের দেয়ালের কারুকার্য। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান।

গোড়ার মসজিদ পরিদর্শনে গিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম ৫০০ বছর পূর্বে এই অঞ্চল কতটা সমৃদ্ধ ছিল। আপনারা চাইলে একঝলক ঘুরে আসতে পারেন বারোবাজারের গোড়ার মসজিদ থেকে। আগেই বলেছি বারোবাজারে গোড়ার মসজিদ ছাড়াও আরো অনেকগুলো মসজিদ রয়েছে। পরবর্তীতে আপনাদের সেসব মসজিদেও নিয়ে যাওয়ার আশা রাখছি।

কীভাবে যাবেন

বারোবাজার পরিদর্শনের জন্য দুভাবে ঢাকা থেকে যেতে পারেন। ঢাকার শ্যামলী, কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে যশোর, খুলনা. সাতক্ষীরা বা বেনাপোলগামী এসি বা নন-এসি কোনো বাসে চেপে প্রথমে পৌঁছাতে হবে যশোর। তারপর যশোর থেকে যশোর-ঝিনাইদাহ মহাসড়ক ধরে বারোবাজার পৌঁছে স্থানীয়দের কাছে জানতে চাইলেই গোড়ার মসজিদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।
এছাড়া ঢাকার গাবতলী থেকে কালীগঞ্জ-ঝিনাইদহের কোনো চেয়ারকোচ বা সেমি চেয়ারকোচ বাসে চেপে ঝিনাইদহ পৌঁছতে হবে। ঝিনাইদহ থেকে দক্ষিণ দিকে কালিগঞ্জ। তারপর কালিগঞ্জ থেকে আরো দক্ষিণে বারোবাজার পৌঁছে স্থানীয়দের কাছে জানতে চাইলেই গোড়ার মসজিদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।
ফিচার ইমেজ- মোস্তাফিজুর রহমান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: নড়াইলের ঘাটে ঘাটে পড়ে আছে ইতিহাস

সুন্দরবন ভ্রমণ: বাঁদরের কামড় খাওয়ার গল্প