বিদায় ক্ষণে ডুয়ার্স হয়ে শিলিগুড়ির পথে পান্তরে

লাভায় পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেছে। দুপুরের খাবার খাওয়া হয় শেষ বিকালে। খাওয়া শেষে বাইরে বেরিয়ে আসতেই হুট করে একরাশ মেঘ ছেয়ে ধরে লাভা শহরকে। মেঘে ঢাকা লাভার ছবি তুলতে একছুট ছুটল সাইমুন, জয়’দা, বিপু’দা আর সৌরভ ভাই। আমি আর মাসুদ ভাই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। এই ভরপেটে কোথাও যাওয়ার শক্তি ছিল না আমাদের। পাশের একটা মিষ্টির দোকানে গিয়ে আমরা মিষ্টি খেতে খেতে বাকিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

ড্রাইভার মহাশয় বার বার তাড়া দিতে থাকে। অন্ধকার হয়ে আসছে। পাহাড়ি রাস্তায় অন্ধকারে গাড়ি চালানো বেশ বিপদজনক। বাকিরা সেই যে হাওয়া হয়েছে তাদের টিকিটাও দেখা যাচ্ছে না। মোবাইলে নেটওয়ার্কও ছিল না তখন। আবার ঢাল বেয়ে নিচে নেমে বাকিদেরকে ডাকতে যাওয়ার শক্তিও নেই আমার আর মাসুদ ভাইয়ের। তাই অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। কিছুক্ষণ ধরে গজগজ করতে থাকি আমরা। এই ফাঁকে দেখি জয়’দা আর সৌরভ চলে এসেছে। কিন্তু বাকি দুইজনের আসার নাম গন্ধ নাই এখনও। জয়’দাকে ডাকতে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সবে এরই মধ্যে বাকি দুইজনও চলে এসেছে। আর দেরি না করে জীপে উঠি পড়ি।

মেঘে ঢাকা লাভা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

লাভা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত জীপ ভাড়া ৩,৫০০ রুপি। এই ভাড়ার কোনো কম-বেশি হয় না। ওখান কার ড্রাইভারদের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম, এটা একটা সিন্ডিকেট। লাভা থেকে যেদিকে যাওয়া হোক না কেন ভাড়া একই। এখানে ওরা কোনো ওজর আপত্তি শোনে না। আমাদের হাতে আর কোনো অপশন না থাকায় এটাই মেনে নিতে হলো।

লাভা মনেস্ট্রি; ছবি-সাইমুন ইসলাম

ছোট শহর লাভা। শহর না বলে পাহাড়ি গ্রাম বললে খুব দোষের কিছু হবে না। পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই গ্রাম আপনাকে মুগ্ধ করবেই। খুব সুন্দর একটা মনেস্ট্রি আছে এখানে। শেষ মুহূর্তে মনেস্ট্রিতে ঢোকার সুযোগ না হলেও দূর থেকে দেখে মনকে সান্ত্বনা দিয়েছি। থাকার জন্য বেশ কিছু ছোট ছোট হোটেলও আছে।

রেস্টুরেন্টের উপর তলায় হোটেল।

লাভা থেকে কালিম্পং হয়ে শিলিগুড়ি যেতে অনেকটা পথ বেশি ঘুরতে হয়। তাই ড্রাইভার মহাশয় এমন এক পথে আমাদের নিয়ে গেল যেখান দিয়ে কম পথ ঘুরতে হয়। এমনকি সচরাচর কেউ যায় বলে এই পথে আমার মনে হয় না। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে জীপে উঠে বসতেই ঘুমিয়ে গিয়েছি। ঘুম ভাঙতেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম ডুয়ার্সের চা বাগানের রাস্তায়। দুপাশে চায়ের সারি সারি গাছ দেখে প্রথমে বুঝতে পারিনি। রাস্তায় লেখা সাইন বোর্ডের দিকে চোখ যেতেই চক্ষু চড়ক গাছ আমার।

এ আমি কী দেখছি? মাসুদ ভাইকে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, আমরা এখন ডুয়ার্সের রাস্তায় আছি। হিম হিম শীতে চায়ের গন্ধ গায়ে মেখে ডুয়ার্সের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমার কৈশোর জুড়ে ছিল সমরেশ মজুমদারের আনাগোনা। কালবেলা, সাতকাহন পড়তে পড়তে কত বার যে নিজেকে ডুয়ার্সে নিয়ে গেছি তার ইয়ত্তা নেই। আর আজ আধারির মধ্যে দেখতে হচ্ছে বলে খুব আফসোস হচ্ছিল। কেন দিনের আলোতে দেখতে পেলাম না!

শিলিগুড়িতে একরাতের জন্য মাথা গুজেছিলাম এখানে।

ডুয়ার্স নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখন যেন পৌঁছে যাই শিলিগুড়ি। ভাড়া মিটিয়ে জীপ থেকে নামি। মাসুদ ভাই আর বিপু’দা যায় হোটেলের বন্দোবস্ত করতে। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ১০ মিনিটের মধ্যে হোটেলে উঠে যাই। ফর্মালিটি শেষ করে তবেই রুমে ঢুকি। সবাই বেশ ক্লান্ত। ফ্রেশ হতে হতে সাড়ে নয়টার একটু বেশি বাজে। রাতের শিলিগুড়ি শহর দেখতে বেরিয়ে পড়ি সবাই।

রাতের শিলিগুড়িতে আমরা; ছবি- বিপু বিধান

আজ শিলিগুড়িতে আমাদের শেষ রাত। দেখতে দেখতে চার দিন চোখের পলকেই শেষ হয়ে গেল। তাই রাতে জম্পেশ একটা খাওয়া-দাওয়া দেই। যার যা পছন্দ তাই খাওয়া হয়। খাওয়া শেষে হেলতে-দুলতে হোটেলে ফিরে আসি। বিছানায় শরীর দিতেই সকল ক্লান্তি জেঁকে বসে চোখের পাতায়।

বাংলাদেশের নিউ মার্কেটের শিলিগুড়ি ভার্শন হচ্ছে হংকং মার্কেট; ছবি- বিপু বিধান

সকালে ব্যাগপত্র গুছিয়ে হোটেল চেক আউট করে বেরিয়ে পড়ি দিনের আলোয় শিলিগুড়ি শহর দেখতে আর অল্প বিস্তর কেনাকাটা করতে। প্রথমেই সকালের নাস্তা করি আলু পরোটা দিয়ে। তারপর চলে যাই হংকং মার্কেটে। সেখানে টুকটাক ঘোরাঘুরি করি। হংকং মার্কেট অনেকটা আমাদের নিউ মার্কেটের মতো। দামাদামি করে কেনাকাটা করা যায়।

ঐদিন রবিবার থাকায় বেশ কিছু শপিং মল বন্ধ ছিল। এরপর যাই সিটি শপিং মলে। ফিক্সড প্রাইজের মার্কেট, কোনো দামাদামি চলবে না। নামীদামী ব্র্যান্ডের শোরুম আছে এখানে। এখানে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল আমি আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নিতে গিয়েছে।

কোলকাতা সুইটস; ছবি- বিপু বিধান

তবে এখানে একটা জিনিসই আমাদের সাধ্যের মধ্যে ছিল তা হলো কোলকাতা সুইটস। অসম্ভব সুস্বাদু মিষ্টি। প্রত্যেকটা মিষ্টি অসাধারণ ছিল। তবে এর মধ্যে সেরা ছিল গুড়ের রস গোল্লা। এর স্বাদ আসলেই ভুলবার মতো নয়। দামও সাধ্যের মধ্যে থাকায় প্রত্যেকে অনেক খেয়েছে।

শিলিগুড়িতে জম্পেশ রাতের খাবার।

দুপুর হয়ে গিয়েছে। আমাদের হাতে আর তেমন সময় নেই। সন্ধ্যার মধ্যে বর্ডার পার হতে হবে। সাধ্যের মধ্যে যেটুকু কেনাকাটা করার আছে তা বিগবাজার থেকেই করতে হবে। তাই আর সময় ক্ষেপন না করে বিগ বাজারে যাই। এখানে এক ছাদের নিচে সব পাওয়া যায়। সবাই তার সাধ্যমতো পরিবার পরিজনের জন্য কিনে নেই এখান থেকে।

ইচ্ছে ছিল শ্রীলেদার থেকে দুই এক জোড়া জুতা কেনার। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। সময় তখন সাড়ে চারটা। তাড়াতাড়ি একটা অটো নিয়ে ফুলবাড়ি পোর্টে যাই। এপার ওপারের ফর্মালিটি শেষ করে নাস্তা করি। দুপুরে তাড়াহুড়ায় খাওয়ার সুযোগ হয়নি। ভরপেট নাস্তা করে লোকাল বাসে করে পঞ্চগড় শহরে যাই।

বাংলাবান্ধা থেকে লোকাল বাসে পঞ্চগড়।

দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে কাটানো একান্ত মুহূর্তগুলো। কপাল গুনে যেখানেই গিয়েছি সেখানেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পেয়েছি। অনেকে সাধ্য সাধনা করে দেখতে পারে না আর আমরা না চাইতে সব পেয়ে গেছি। ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে। পঞ্চগড় থেকে এখনই ছেড়ে যাবে। মনটা বেশ খারাপ লাগছিল।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে পড়ে গেল।
“ শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে,
হে আরম্ভ, বৃথা তব অহংকার তবে।
আরম্ভ কহিল ভাই, যেথা শেষ হয়,
সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়”

***ফিচার ইমেজ- জামান মাসুদ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডের চাঁদের আলোয় অধরা, মিহি বাতাসে মাধবী

অপরূপ গ্রিস!