গোমুখ অভিযান: মুশৌরির পথে, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে

ভ্রমণে আমার একটি নিজস্ব সূত্র হলো নিজের প্রথম যে গন্তব্য সেই পথে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া। যদি কোনো কারণে প্রথম গন্ত্যব্যে পৌঁছে না যাওয়া যায় তাহলে দ্বিতীয় গন্তব্য বা প্ল্যান বিতে যাওয়া। আমি কখনোই একটা প্ল্যান নিয়ে ভ্রমণে বের হই না। সব সময় আমার দুটি বা তিনটি প্ল্যান করা থাকে। যেন একটা না হলে অন্যটা করতে পারি। একদম হতাশা যেন আমাকে গ্রাস করে না ফেলে। আর একদম কিছুই না পাওয়ার চেয়ে অল্প কিছু সুখ স্মৃতি নিয়েও যেন ফিরে আসতে পারি।

তো দেরাদুন বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে জানতে পারলাম আমার প্রধান এবং প্রথম গন্ত্যব্য গাংগোত্রীর সরাসরি কোনো গাড়ি নেই। তার আগের, মানে প্রায় অর্ধেক দূরত্বের উত্তর কাশী যাবার যে একটা মাত্র বাস সেটাও ছেড়ে গেছে ভোর সাড়ে পাঁচটায়। তার মানে আজকে উত্তর কাশীও আর সরাসরি যাওয়া যাবে না। তাহলে এখন উপায় কী অন্তত উত্তরকাশী পর্যন্ত যাওয়ার? বাস স্ট্যান্ডে জিজ্ঞাসা করায় একটা বাস দেখিয়ে দিলেন, যে বাসে ঘণ্টা দেড়েক যাওয়ার পরে একটা যায়গা খিশউলি বা এমন খটমট কোনো একটা জায়গা থেকে উত্তর কাশী যাবার বাস পাওয়া গেলেও যেতে পারে, তবে সেটাও নিশ্চিত নয়।

মুশৌরির পথেঃ ছবিঃ লেখক

কিন্তু আমার অতশত বোঝার সময় নেই। আগে যতদূর সম্ভব যাওয়া যায় যাবো তারপর আর কিছু না পেলে তখন দেখা যাবে কী করা যায়? তাই উঠে পড়লাম সেই বাসেই। বেশ মিহি একটা সকালে নতুন একটা শহরের স্টেট বাসে করে চলেছি শান্ত শীত শীত সকালে। এই বাসের প্রথম গন্তব্য হলো অনেক অনেক নাম শোনা আর একটি ভীষণ জনপ্রিয় আর দারুণ লোভনীয় একটা জায়গা মুশৌরি। বাস প্রায় ১০ মিনিট সমতলে আর শহরের মোড়ে মোড়ে চলার পরে পথের দুইপাশে কুয়াশার চাদর সরিয়ে পাহাড়ের সারি চোখে পড়ল প্রথমবারের মতো। তার মানে সামনেই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে চলতে যাচ্ছে আমার বাস।

পথে যেতে যেতেই রাজপথের দুইপাশে ফুটপাথ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম আর ভাবছিলাম পথের দুইপাশে আসলে কি ফুটপাথ নাকি পার্ক? ছোট বড় গাছ, মাঝে মাঝে বসার জন্য স্টিল ও ইট পাথরের রঙিন বেঞ্চ, ফুলের টব, পানির ফোয়ারা আর সবুজে সবুজে ঘেরা! মোট কথা একটা পার্কের যেসব অনুষঙ্গ থাকা উচিৎ তার সবই আছে, কিন্তু সেসব এই ফুটপাথে কেন? মনের মধ্যে জিজ্ঞাসারা উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করছিল। কিন্তু সেই জিজ্ঞাসা চাপা পড়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস সমতল ছেড়ে পাইন বনে আচ্ছাদিত পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে চলতে শুরু করাতে।

পাহাড় ও আঁকাবাঁকা পথ। ছবিঃ সংগৃহীত

এই পথের পাহাড়গুলো যেন একটু বেশীই খাড়া আর বেশ ছোট ছোট পাহাড়ের পিঠ কেটে কেটে বানানো হয়েছে গাড়ি চলার পথ। যে কারণে গাড়ি যখন বাঁক নেয় তখন এতটাই হেলে পড়ে যে প্রায় সিট থেকে ছিটকে পড়ে যাই যাই অবস্থা। এভাবে একবার ডানে হেলে আর একবার বায়ে হেলে পড়তে পড়তে, পাহাড়ের গায়ে বেয়ে বেয়ে, পাইনের বনের মাঝ দিয়ে কখন যেন পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে আমরা প্রায় মুশৌরির কাছাকাছি চলে এসেছি। পথের মাইল ফলকে তেমনই লেখা দেখালো। আপাতত অপেক্ষা কখন বাস মুশৌরি পৌঁছাবে। কত নাম শুনেছি এই পাহাড়ি শৈল শহরের, কত ছবি দেখেছি, কতজনের কাছে অল্প বিস্তর গল্প শুনেছি আর আজ এখন সেই শহরের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি। আর হয়তো কয়েকটা পাহাড়, কয়েকটা বাঁক, একটু হেলে পড়া, সামনে ঝুকে যাওয়া বা পেছনে ছিটকে যাওয়ার মতো হুটহাট রোমাঞ্চের পরে।

বাস এবার পাহাড়ের গা থেকে পিঠের পথ ধরে এঁকেবেঁকে চলতে শুরু করেছে। কারণ নিচে অনেক অনেক ছোট ছোট পাহাড়ের মেলা দেখা যাচ্ছে। পাহাড় আছে দুই চোখের সবটুকু দৃষ্টিসীমার মধ্যেই। সামনে, পেছনে, ডানে, বামে আর উপরে, নিচেও। আর সেই সব পাহাড়ে পাহাড়ে অবধারিতভাবে ওড়াউড়ি করছে কোথাও মেঘ, কোথাও কুয়াশা আর কোথাও মেঘ-কুয়াশার আলিঙ্গন। যে কারণে এই বর্ষার শেষেও পথের বাঁকে বাঁকে নানা আকার আর আকৃতির ছোট মাঝারী ঝর্ণার বয়ে চলা। কোনোটা পথের পাশ দিয়ে, কোনোটা পথের মাঝ দিয়ে আর কোনোটা দুই পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে। আর সেই সাথে রয়েছে পাহাড়ে পাহাড়ে মেঘ কুয়াশার লুকোচুরি। মানে কোনটা যে মেঘ আর কোনটা যে কুয়াশা সেটা বোঝা মুশকিল অনেকটা।

মেঘ ও কুয়াশার আলিঙ্গন। ছবিঃ সংগৃহীত

এসব পাহাড়, পাহাড়ে পাহাড়ে উড়ে বেড়ানো মেঘ, পাহাড়কে জড়িয়ে ধরা কুয়াশা দেখতে দেখতে কখন যেন চলে এসেছি মুশৌরিতে। বাসের হেল্পারের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। এখানে ১০ মিনিটের বিরতি। তারপর বাস আবার তার গন্তব্য মানাং বা এমন কোনোদিকে রওনা হবে। যেটা সারাদিনের পথ। কিন্তু এই বাসে আমার গন্তব্য আর মাত্র ৩০-৪০ মিনিট। তারপর সেখান থেকে উত্তর কাশী যাবার বাস যদি পাই তো সেদিকে যাবো। নইলে নতুন করে আমার গন্তব্য নির্ধারণ করে সেদিকে যাবার জন্য অন্য কোনো বাহন ধরতে হবে।

মুশৌরির ১৫ মিনিটে একটু ফ্রেশ হওয়া, হালকা চা আর কেক বিস্কিট খাওয়া হলো এক পাহাড়ের ছাদে বসে। পাহাড়ের ছাদ বলতে ওই বাসস্ট্যান্ডটা এমন জায়গায় বানানো যেখান থেকে নিচে কোনো গাছ বা মাটির ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায় না, শুধু দূরে পাহাড়ের হাতছানি ছাড়া। যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়ের ডাক। ঠিক যেন এক পাহাড়ের ছাদে বসে বা দাঁড়িয়ে অন্য পাহাড়গুলোকে দেখে যাওয়া। ১৫ মিনিট পার হতেই বাস স্টার্ট দিল তার গন্তব্যে যাবার উদ্দেশ্যে। ঝটপট হাতের গরম চা শেষ করে উঠে পড়লাম বাসে। অনেক আশা নিয়ে যদি উত্তর কাশীর বাসটা পেয়ে যাই, তাহলে আজকেই অনেকটা এগিয়ে যেতে পারবো। আমাকে আর নতুন কোনো গন্তব্যে যাবার পথ খুঁজে বের করতে হবে না।

পাহাড়ের ঢালে, গাড়ির অপেক্ষায়। ছবিঃ লেখক

মুশৌরি যেতে হলে ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে প্লেন বা ট্রেনে দিল্লী হয়ে বা সরাসরি দেরাদুন। দেরাদুন থেকে বাস বা কারে এক থেকে দেড় ঘণ্টার পথ মুশৌরি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভ্রমণের সময় ক্যামেরা ও গিয়ার নির্বাচন সম্পর্কিত টিপস

নো ম্যান্স ল্যান্ডের চাঁদের আলোয় অধরা, মিহি বাতাসে মাধবী