গোমুখ অভিযান: শিবলিঙ্গ ও থমকে যাওয়া মুহূর্তে

ভুজবাসার সোনার সকালে সোনার পাহাড় দেখতে দেখতে পাহাড়ি ট্রেইল ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম গোমুখের দিকে, হিম হিম শীত আর কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় সোনা ঝরা উষ্ণ রোদের পরশ গায়ে মেখে মেখে। আগেই বলা হয়েছে যে প্রাথমিক তথ্যমতে ভুজবাসা থেকে গোমুখের দূরত্ব জানা ছিল চার কিলোমিটার। শুধু আমার নয়, এই সকালে আমি যে আর্জেন্টাইনদের পিছু নিয়েছিলাম তারাও তেমন জানে আর তাদের গাইডরাও সেরকম তথ্যই সবাইকে দিয়েছে বা জানিয়েছে।

ভুজবাসা থেকে গোমুখের চার কিলোমিটার পর্যন্ত খুব কঠিন কোনো ট্রেইল বা ট্রেক নেই এটা জানা ছিল। নেই তেমন ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বাঁক বা পাহাড়ে চড়াই অথবা নেই ঝুরো মাটি বা পাথরের পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে যাওয়ার মতো শুষ্ক কিন্তু পিচ্ছিল কোনো ট্রেক।

আর্জেন্টাইন ট্রেক টিমের পিছনে পিছনে। ছবিঃ লেখক

তাই সকলেই বেশ হেলেদুলে চলছিলাম একেক জনের পিছনে আর একজন করে ধীরস্থিরভাবে। পাহাড়ের কাঁধের উপরে সরু ট্রেইল, কিন্তু ডানে বা বামে তেমন খাঁদ বা উঁচু পাহাড় থেকে পাথর ছুটে আসার মতো কোনো ঝুঁকি ছিল না। তবে মাঝে মাঝেই পুরো পথ জুড়ে পড়ে থাকা ছোট বড় নানা আকারের পাথরের পড়ে থাকা পথ চলতে বেশ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। বাম পাশের পাহাড় খুব ধীরে ধীরে উঠে গেছে উপরে আকাশের দিকে। আর ডান পাশে অনেকটা সমতল ভূমির মতো ভ্যালী পেরিয়ে গঙ্গার ছুটে চলা পাহাড় আর পাথরের বাধা ডিঙিয়ে। নদীর ওপারে পাহাড়ের সিঁড়ি উঠে গেছে আকাশের সীমানায়।

সূর্য তখন পুব আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠেছে, সোনালি আভা হারিয়ে গিয়ে বরফে জড়ানো পর্বত চূড়াগুলোতে আগুনের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। ধূসর আকাশ হয়ে উঠেছে ঝলমলে নীল, মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে নিজ আলোয় থেকে আকাশের পানে ছুটে যাচ্ছে সাদা সাদা নরম কোমল মেঘেদের ছোট ছোট দল। আর দূরে বয়ে চলা গঙ্গার রিনিঝিনি গান তখনো শুনিয়ে চলছিল তার সুরেলা সুর। যে সুর অনন্তকাল ধরে সে তুলে চলেছে, চলছে আর চলবে। যে সুরে সুরে মাতিয়ে রাখে এই ট্রেকের সকল ট্রেকারদেরকে, ভুলিয়ে রাখে আর ক্লান্তি দূর করে তার গান শুনিয়ে।

ভাগীরথী গ্রুপ। ছবিঃ লেখক

এই পথে চলতে চলতে সামনে ধূসর সাদা পাহাড় সারির দিকে হাঁটছিলাম, একে একে তিনটি চূড়া একটু একটু করে সামনে এগিয়ে আসছে বা আমরা ওদের পায়ের কাছে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ওই তিনটি চূড়াকে একসাথে ভাগীরথী গ্রুপ বলা হয়। যে পাহাড়ের বরফ গলেই গোমুখ বা গঙ্গার উৎপত্তি বলে কথিত আছে বা ধরে নেয়া হয়। ওদিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম আর ভাবছিলাম এই তো আর দুই বা তিন কিলোমিটার পরেই তো ওদের কাছে পৌঁছে যাবো। এই সুখ ভাবনা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই একটা সময় দেখি আমাদের ঠিক সামনে একটা বেশ বড় পাথর বা পাহাড়ের ক্ষয়ে যাওয়া অংশ বিশাল একটা স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যার ঠিক শীর্ষেই মাথা তুলে সকালের প্রথম আলোর পরশ মেখে মিটমিট করে হাসছে শিবলিঙ্গ।

জাস্ট ওই পাহাড়ের দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভ দেখলাম আর দেখলাম তার উপরে শিবলিঙ্গ, এর পরের ঘটনাটুকু ঘটে গেল মুহূর্তেই। তখন আমি আর আমার মাঝে ছিলাম না নিশ্চিত ভাবেই। বোধ শুন্য হয়ে, অন্য কোনো কিছু না ভেবেই এক দৌড়ে উঠে গেলাম সেই পাথরের স্তম্ভ বা ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের অংশ বিশেষে যা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে শিবলিঙ্গকে মাথায় করে। শুধু এইটুকু মনে আছে যে ওই পাহাড় বা পাহাড়ের অংশ বিশেষ বা বিশাল দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের চূড়ায় দৌড়ে ওঠার আগে একজনকে আমার ক্যামেরাটা দিয়ে বলেছিলাম- প্লিজ ক্লিক সাম ফটো।

সুখ পাহাড়ের শীর্ষে! ছবিঃ লিলিয়ানা

এরপর আমি শীর্ষে! আহ কী যে এক শিহরিত অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পাথরের শীর্ষে আবার দারুণ বসার মতো কিছু জায়গাও পেয়ে গেলাম। আগে কিছুক্ষণ পাগলামি করলাম, নেচে গেয়ে, নিজের মতো করে উদযাপন করে আর উচ্ছ্বসিত হয়ে। তারপর কিছুটা সময় বসে বসে শিবলিঙ্গ দেখলাম অপলক তাকিয়ে। সূর্যের আলোর কমা বাড়ার সাথে সাথে তার রূপের পরিবর্তন ঘটছিল একটু পরপর। সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম আর নিজেকে নিজের এমন সৌভাগ্যের জন্য বিধাতার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছিলাম মনে মনে।

এরই মাঝে কখন যেন, আমার দেখাদেখি আর্জেন্টাইন দুইজন সেই চূড়ায় উঠে এসেছে নিজেদেরকে ধরে রাখতে না পেরে। ওদের মধ্যেও আমার মতো আবেগের সংক্রমণ দেখে অবাক আর অভিভূত দুই-ই হলাম। অবশেষে ওদের গাইডের অনুরোধে ওদের সহ আমাকেও নেমে আসতে হলো। তবে সেই পাহাড় বা বিশাল পাথরের চূড়া থেকে নেমে আসাটা ওঠার মতো অতটা সহজ সাধ্য ছিল না মোটেই। নেমে আসাটা ছিল বেশ কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দারুণ উত্তেজনায় আর বেখেয়ালে এক দৌড়ে উঠে গেলেও নামতে নিতে হয়েছিল দুই এক জনের সাহায্য। এতটাই খাড়া ছিল যে একটু পা হড়কালেই নদীতে সমর্পিত, সেও পানিতে নয় জেগে থাকা রাক্ষুসে পাথরের উপরে। যার পরিণাম? গা শিউরে ওঠার মতো।

শিবলিঙ্গ ও থমকে যাওয়া মুহূর্ত! ছবিঃ লেখক

তবে নেমে আসার পরেই আমার আর আমার সাথে আর যে দুই একজন উঠেছিল সেই ছোট্ট চূড়ায়, ধবধবে সাদা, নরম কোমল তুষার জড়ানো শিবলিঙ্গ পেয়েছিল যেন হাত ছোঁয়া দূরত্বে, তারা কেউই সেই মুহূর্তে সেখান থেকে যেতে চাইছিল না। থমকে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই পাথর বা পাহাড়ের পায়ের কাছে। আর যখন অন্যদের দূরে চলে যাওয়া দেখে পথ চলতে শুরু করেছিলাম, তখন বারবার করে পিছনে ফিরে ফিরে চাইছিলাম।

সোনা ছড়ানো সুখ সকালে, সোনার পাহাড় দেখে, সোনা রোদে উষ্ণ হয়ে যে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার অদ্ভুত এক সোনালি স্বাদ পেয়েছিলাম। সে সময়টা, যে মুহূর্তগুলো, যে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা, বসে থাকা, উচ্ছ্বসিত হওয়া, সে যেন ভোলার নয়। চোখ বুজলেই যেন সেই মুহূর্তগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে, এক সোনালি সকালে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অজান্তেই।

সোনায় মোড়ানো বরফের পাহাড়! ছবিঃ লেখক

সেই বরফ মোড়ানো শিবলিঙ্গ আর তার সাথে পাহাড়ের এক চূড়ায় কাটানো মুহূর্তটুকু যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চিন্তায়, চেতনায়, ভাবনায়, স্বপ্নে আর কল্পনায়।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ধর্মসাগর নামক দীঘির পাড়ে

ঝলমলে জয়পুরে