গোমুখ অভিযান: ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও চিরবাসা

sdr

গাঙ্গোত্রী চেকপোস্ট থেকে স্বপ্ন সত্য হবার সকাল পর্যন্ত পাহাড়ি খাড়া পথে ট্রেক করে এলেও, খুব ঝুঁকিপূর্ণ পথ তেমন একটা পার হতে হয়নি। পুরো ট্রেইলই মোটামুটি দুটি মানুষ আরামে পাশাপাশি হেঁটে যেতে বা আসতে পারে এতটা প্রশস্ত ছিল। কিন্তু নদী আর ঝর্ণা এক হয়ে যাওয়া যে ঝুলন্ত সাঁকোর উপরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়েছিলাম, তারপর ট্রেক শুরু করার পর থেকেই নানা রকম কষ্ট, ঝুঁকিপূর্ণ পথ, নিজের উপর নিজের মেজাজ খারাপ হওয়া শুরু হলো। যার এক একটি একেক সময়। এর আগে ট্রেকের পথে তেমন কোনো বাধা, ঝামেলা বা কষ্ট অনুভূত হয়নি।

কারণ গাঙ্গোত্রী থেকে গোমুখের বেজক্যাম্প যেটাকে ধরা হয় সেই ভুজবাসা পর্যন্ত প্রথম দিনের ১৪ কিলোমিটার ট্রেকের চার কিলোমিটার ছিল আমার স্বপ্নের সেই সেতুতে শুয়ে থেকে বিশ্রাম নেয়া পর্যন্ত। এই চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলাম একদম সকালে। সকাল ৬টায় ট্রেক শুরু করে ৯টার আগেই বেশ দ্রুত এখানে চলে এসেছিলাম। তখনো আকাশে সূর্যের তেমন তাপ বিতরণ শুরু হয়নি। আর ভোরের হিম হিম ঠাণ্ডায় তেমন কোনো কষ্ট হয়নি বলে। 

ঝুঁকিপূর্ণ পথের শুরু। ছবিঃ লেখক

তার মানে নতুন করে পথ চলতে শুরু করার পরেও আরও ৪ কিলোমিটার পরে চিরবাসা। যেখানে বিশ্রাম ও হালকা কিছু খাওয়া দাওয়া করার সুযোগ আছে। সেই পথের শুরুতেই নানা রকম বিড়ম্বনা শুরু হলো। প্রথমত মাঝে মাঝে খাড়া পাহাড়ের ট্রেইল এত এত সরু যে একজনকে চলতেও খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিল, চারদিকে চোখ আর কান সজাগ রেখে। কারণ একটু এদিক ওদিক হলেই পায়ের ভুল স্টেপে নদীর বুকে জেগে থাকা পাথরের উপরে দেহত্যাগ হয়ে যেতে পারে।

আবার পাহাড়ের উপরের দিকেও নজর রাখতে হচ্ছিল কোনো পাহাড় থেকে যদি আবার পাথর ছুটে আসে সেই শঙ্কায়। কারণ এই ট্রেকের এমন অনেক জায়গা আছে যেখান থেকে যে কোনো সময়ই পাথর ছুটে এসে নদীতে পতিত হয়। আর সেই পাথরের কোনো টুকরো যদি কোনো মানুষের মাথায় পড়ে তো জায়গায়ই শেষ!

পাহাড়ি ট্রেইলে বিশ্রাম। ছবিঃ লেখক

বিড়ম্বনা দুই শুরু হলো সূর্য তার পুরো বিকিরণ বিতরণ করতে শুরু করার পরে। মাইনাস ডিগ্রী তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এমন ট্রেকিং ট্রাউজার পরে ট্রেক শুরু করেছিলাম সকালের কনকনে ঠাণ্ডায়। সেটিই বিরক্তির চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছালো সূর্যের উত্তাপে ঘেমে যাওয়া শুরু করতেই। মাঝে মাঝে তো নিজেকেই নিজে গালি দিতে শুরু করেছিলাম যে কেন এত গরম একটা ট্রাউজার পরে রওনা হলাম এই কথা মনে করে। কেন একটা শর্ট প্যান্ট বা হাফ প্যান্ট পরে শুরু করলাম না? অথচ আমার কাছে সবরকম উপায়ই মজুদ আছে। ওই শীতে দাঁড়িয়ে, বাতাসের কাঁপুনিতে সেটা পরিবর্তন করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না। তার উপর ছিল ব্যাগ থেকে সব কিছু বের করে, নতুন প্যান্ট পরে আবার সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগপ্যাক করার বিষম বিড়ম্বনার। যে কারণে একটু কষ্ট হলেও ওভাবেই পথ চলতে শুরু করলাম।

তবে একটা সময়, আরও একটু দূরত্বে পৌঁছে বুঝতে পারলাম যে না এই পথে, এমন পাহাড়ি ট্রেইলে সাময়িক যতই গরম লাগুক শর্টপ্যান্ট বা হাফপ্যান্ট কিছুতেই কার্যকরী নয়। কারণ ৩০ মিনিট পর পর যখন পাঁচ মিনিটের জন্য কোথাও থেমে যাচ্ছিলাম তখনই শীতের তীব্রতা এতটাই বেশী ছিল যে কানে টুপি আর হাতে গ্লাভস পরে নিতে হতো ঝটপট। মাঝে মাঝে হয়তো ভেতরে ভেতরে ঘামছিলাম কিন্তু খুলে ফেলার সাহস হচ্ছিল না চূড়ান্ত ঠাণ্ডা বাতাসের কাঁপুনিতে। এভাবে একটু থেমে, আর একটু এগিয়ে একটা সময় এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছালাম, যে জায়গাটা দেখেই শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। অথচ সামনে এগিয়ে যেতে হলে সেই পথই পেরিয়ে যেতে হবে নিজের মতো করে, বুকে সাহস নিয়ে।

পাথুরে পাহাড়ি পথ। ছবিঃ লেখক

খাড়া পাহাড়ি ট্রেইল নিচে নেমে গেছে, যে ট্রেইলে একজনকে নামতে হবে খুব আর খুব সাবধানে, পা টিপে টিপে, একটা একটা ধাপ ফেলে। কারণ বামে পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলতে হবে, আর ডানে প্রায় হাজার ফুট গভীর পাহাড়ের খাঁদ। একটু অসতর্ক হলেই বামের পাহাড়ে বেরিয়ে থাকা পাথরের সাথে ধাক্কা লাগার সমূহ সম্ভাবনা আর ডানে তো রয়েছেই ছিটকে পড়ে গিয়ে পাহাড়ে সমাধি বানানোর সকল আয়োজন। অসীম সাহসীরাও এখানে খুব সাবধানে পা ফেলে থাকে। কারণ একটা ভুল পদক্ষেপ বা একটা পাথরে খোঁচা লাগাই যথেষ্ট নিজেকে পৃথিবী থেকে হারিয়ে ফেলার জন্য।

তবে এই পথটুকু কোনোমতে পেরিয়ে গেলেই যদি কেউ মনে মনে সুখ পেয়ে থাকে যে, যাক বাবা পেরিয়ে তো এলাম ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ পথ। বাঁচা গেল। কিন্তু না তার জন্য ফেলে আসা পাহাড়ি ট্রেইলের চেয়েও কয়েকগুণ ভয়ানক পথ অপেক্ষা করছে ওই ট্রেইলের পর পরই। হ্যাঁ ওই পথে তো তবু নিজের স্বাভাবিক হাঁটাটা সম্ভব একটু ধীরে আর সাবধানে। কিন্তু সামনে যে পথ সেখানে কেউই নিজের স্বাভাবিক পথ চলতে পারবে না কিছুতেই।

সবুজ ও রুক্ষ পাহাড়ের দেয়াল। ছবিঃ লেখক

কারণ পাহাড় কেটে, পাহাড়ের ভেতরের দিকে বানানো ট্রেইল ঝুলে আছে গভীর খাঁদে আর উম্মত নদীর বুকে। ট্রেইলে লোহার রড লাগিয়ে রাখা হয়েছে যেন কেউ ওদিকে গেলেও রডের সাথে নিজেকে আটকে রাখতে পারে বা কিছুটা সময় ঝুলে থাকতে পারে। আর পাহাড়ের পাথর এতটাই নিচে নামা যে কোনো স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষ মাথা সোজা করে খুব সহজেই হেঁটে যেতে পারবে না। এভাবেই পাহাড়ের শেষ প্রান্তে কেটে কেটে, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভয়ানক ট্রেইল।

ওহ ভেবেছিলাম এই পথটুকু পেরোতে পারলেই একটা বিশ্রাম নেব। কারণ এই পথটুকুতে যতটা না শারীরিক কষ্ট হয়েছে তারচেয়ে বেশী হয়েছে মানসিক কষ্ট আর গা শিরশিরে ভয়ানক অনুভূতি। কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না কারণ, এর পরের যে খাড়া ট্রেইল গভীর খাঁদে নেমে গেছে সেখানে কারো পক্ষেই দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। তাই সেখানেও না থেমে নেমে যেতে হয়েছিল বেশ দ্রুতই। আর এই পথটুকু যাওয়ার একটা দারুণ আনন্দ ছিল এই পাহাড়টির পরে গঙ্গার উপরে আরও একটি ঝুলন্ত কাঠের সেতু পেরিয়ে অন্য পাহাড়ে পৌঁছে যেতে পারলেই যে মানুষের দেখা পাওয়া যাবে।

চিরবাসার পথে… ছবিঃ লেখক

ওপারেই যে চিরবাসা। হোক অল্প মানুষের কিন্তু কিছু মানুষ তো দেখা যাবে, দুই-এক জনের সাথে তো হাই হ্যালো বলা যাবে, একটু উষ্ণ চা বা কফি তো পাওয়া যাবে। সেই আনন্দেই ঝুলন্ত সেতুতে একটু দোল খেয়েই পৌঁছে গেলাম পাথরের মাঝে, পাহাড়ের ভাঁজে, গঙ্গার তীরে অবস্থিত ছোট্ট লোকালয় চিরবাসায়।  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সোলো ট্রাভেলিংয়ের পরিকল্পনা কীভাবে করবেন?

সিঙ্গাপুরের বিনোদন স্বর্গ সেন্টোসা আইল্যান্ড