গোমুখ অভিযান: উত্তরকাশী থেকে গাঙ্গোত্রীর জীপে

এমনিতে পাহাড়ি পথে হাঁটা যতটা না কষ্টের তার চেয়ে অনেক বেশী কষ্টের হলো সেই পাহাড়ি পথে প্রায় দৌড়ানো। আর সেটা যদি হয় বেশ কিছুটা টেনশন নিয়ে একদম অপরিচিত কাউকে খুঁজে বের করা, তাহলে পাহাড়ি পথ যেন তার পথকে আরও লম্বা করে দেয় নিজ থেকেই! প্রায় ১৫ মিনিট দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে একটা ছোট্ট দল খুঁজে পেলাম। কিন্তু এরা কি সেই দল? যারা গাঙ্গোত্রী যাবে বলে এদিকেই এসেছে জীপের খোঁজে? এরা তো একেবারেই ভিনদেশি চিন-জাপানী হবে মনে হয়।

ওদেরকে পেছনে ফেলে আর একটু সামনে এগিয়ে গেলাম অন্য কোনো দল আছে কিনা। নাহ নেই। তাই ওদেরকেই জিজ্ঞাসা করলাম গাঙ্গোত্রী যাবে কিনা? বাহ, কষ্ট আর টেনশন দূর করে দিয়ে ওরা জানালো যে হ্যাঁ ওরাই আজকে গাঙ্গোত্রী যেতে চায়। বাস স্ট্যান্ডে গিয়েছিল, কিন্তু বাস না পেয়ে এদিকে যাচ্ছে শেয়ার জীপ বা ট্যাক্সির আশায়। বেশ তো তবে আমিও যাবো একই গন্তব্যে, শেয়ার জীপ পেলে ভালোই হবে। ব্যস ওদের সাথে নিজে থেকেই ট্যাগ হয়ে গেলাম। এবং তাতে করে ওরা মোটেও অখুশি হলো না বোঝা গেল। কারণ ওরা নিজেদের ছয় জনের সাথে আমাকে ধরেই ৭ জন গুনতে লাগলো।  

গাঙ্গোত্রীর পথে। ছবিঃ লেখক

প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পেরিয়ে একটি ট্যাক্সি ও জীপ স্ট্যান্ড পাওয়া গেল। সবাই মিলে সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেল এখান থেকে শেয়ারের ট্যাক্সি বা জীপ ছেড়ে যায় গাঙ্গোত্রী উদ্দেশ্যে। বাহ দারুণ। তার মানে আজকেই যেতে পারবো গন্ত্যব্যের সবটুকুই ইনশাল্লাহ। সেই খুশিতে কয়েকটা চকলেট কিনে ফেলে একটা মুখে দিয়ে দিলাম। তবে হ্যাঁ, জীপ স্ট্যান্ডে আরও বিস্তারিত জানা গেল যে জীপ তখনই ছাড়বে যখন ১০ জন লোক পূর্ণ হবে। কারণ একটা জীপে ১০ জন যেতে পারে। অথবা যে কজনই যাক না কেন সবাইকে মিলে ১০ জনের ভাড়া ২,৩০০ রুপী দিতে হবে। কারণ উত্তরকাশী থেকে গাঙ্গপত্রির ভাড়া ২৩০ রুপী। তবে বাসে গেলে ১৫০ রুপীর মতো।

চীন-জাপানীগুলোকে প্রস্তাব দিলাম চলো আমরা ৭ জন মিলে একটা জীপ নিয়ে চলে যাই। জনপ্রতি যেটা আসবে সেটা দিয়ে দেব। তাতে করে আমাদের সময় বাঁচবে অনেক। অনেক আগে আমরা গাঙ্গোত্রী পৌঁছে যেতে পারবো। কিন্তু এরা দেখি আমার চেয়েও বহুগুণ হিসেবি। কিছু সময় অপেক্ষা করে দেখতে চায় আরও তিনজন পাওয়া যায় কিনা? আর এই সময়ের মধ্যে ওরা লাঞ্চ করে নিতে চায়। লাঞ্চের পরে যদি দশজন লোক না হয় তবে সাতজন মিলেই চলে যাবো বলে ঠিক করলাম। ওরা লাঞ্চে যাবে, আমিও পাশের ছোট্ট হোটেল থেকে তিনটে আটার রুটি, ওরা চাপাতি বলে যাকে সেটা কিনে চায়ের অর্ডার দেব। ততক্ষণে জীপের ড্রাইভার জানালো যে দশজন হয়ে গেছে! ব্যস ওদের আর লাঞ্চ করা হলো না। সবাই মিলে জীপে উঠে পড়লাম। আমি আগে থেকেই নিজের পছন্দের একদম সামনের জানালার পাশের সিট দখল করে রেখেছিলাম বুটের ব্যাগ রেখে।

পথে যেতে ঝর্ণার স্বাগতম। ছবিঃ লেখক

সবাই যার যার ব্যাকপ্যাক গাড়ির উপরে দিয়ে বেঁধে রেখে সিটে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। যেদিক দিয়ে পায়ে হেঁটে এসেছিলাম সেদিকেই। ভাবলাম এদিক দিয়েই যাবে বোধহয় অন্য কোনো পথে। কিন্তু আসলে তা নয়। গাড়িতে তখন ৯ জন বসেছিল সামনে থেকে একজন উঠবে, যে লাঞ্চ করছিল। তার অন্য সহযাত্রী জীপে জায়গা নিতে এসেছিল লাঞ্চ শেষ করে। এদিকে আমি শুকনো চাপাতি চিবাতে চেষ্টা করছি দুপুরের লাঞ্চ হিসেবে। আর সেই সকালে একটু চা আর কিছু বিস্কুট চকলেট ছাড়া আর তেমন কিছু খাওয়া হয়নি। মাঝে বাস এক যায়গায় খাবারের জন্য থামাতে খেজুর, পাউরুটি আর চা খেয়েছিলাম। তবে আজকেই গাঙ্গোত্রী যেতে পারছি বলে সেই আনন্দে তেমন ক্ষুধাও লাগেনি ততক্ষণে।

কিন্তু শুকনো চাপাতি চিবাতে গিয়ে মনে পড়লো যে চিবাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। অন্যকিছুর সাথে বা না ভিজিয়ে এই তিন চাপাতি শেষ করা যাবে না। তাই সামনে গিয়ে গাড়িতে অন্যজনকে তুলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে নিতে আমি নেমে গিয়ে ভ্যানের উপরে বিক্রি করা নারকেলের দুটি টুকরো কিনে নিলাম ১০ রুপী দিয়ে। সেই নারকেলের টুকরোতে একটা ছোট্ট কামড় দিতেই একটা আরাম বোধ হলো। দারুণ মিষ্টি আর বেশ সুস্বাদু নারকেল থেকে দুধ সাদা রস মুখে ভরে যেতেই। ব্যস চমৎকার একটা লাঞ্চ কম্বিনেশন পাওয়া গেল শুকনো চাপাতির সাথে মিষ্টি, রসালো আর দুধের স্বাদের নারকেলের টুকরো।

পথের মাঝে। ছবিঃ লেখক

চমৎকার ১০ রুপী করে দুটি নারকেল টুকরো দিয়ে ১৫ রুপীর তিনটি চাপাতি দিয়ে ভরপুর লাঞ্চ করে ফেললাম গাড়ির আঁকাবাঁকা পথে যেতে যেতেই। আর সাথে তো পর্যাপ্ত পানি ছিলই। আর ছিল চকলেট, খেজুর, চিপস, বিস্কিট সহ বেশ কিছু শুকনো খাবার। সুতরাং খাবার আর পানি নিয়ে কোনো আক্ষেপ রইলো না। উপরন্তু বাড়তি পাওনা হিসেবে পেয়ে গেলাম একদিনেই দেরাদুন থেকে অনিশ্চিত পথে যাত্রা করে উত্তরকাশী হয়ে গাঙ্গোত্রী যাবার সকল উপায় আর সুবিধামতো সব বাহন।  

লাঞ্চ শেষ করতে করতেই গাড়ির অন্যদের সাথে সবাই কমবেশি পরিচিত হতে লাগলো। আমার পাশে ড্রাইভারের সাথে লাগোয়া একজন গাঙ্গোত্রী বাসিন্দা। যার একটি ছোট হোটেল আছে যেখানে গেস্ট থাকার ব্যবস্থা আছে বসে তিনি সবাইকে জানালেন এবং তার ওখানে থাকার জন্য কাউকে কাউকে অনুরোধও করলেন।

গাড়ির মাঝে দুজন প্রায় ৬০ ঊর্ধ্ব বন্ধু। এসেছেন কলকাতা থেকে গাঙ্গোত্রী হয়ে গোমুখ যাবেন বলে। মাঝে আরও দুজন ছিলেন যারা যে কারণেই হোক নিজেদের সঠিক পরিচয় দিতে চাইছিলেন না। যেটা নিয়ে কলকাতার দুই বাঙালি বেশ হাস্যরসে মেতে উঠলেন নানা রকম টিপ্পনী কেটে। যা সেই দুজনকে একেবারেই কোণঠাসা করে রেখেছিল পুরো পথেই। যে কারণে তারা দুজন যে গাড়ির মধ্যে আছে কী নেই সেটা আর পুরো পথেই বোঝা যায়নি। বিষয়টা আমার কাছে মোটেই ভালো লাগেনি। একটু দুঃখবোধও হয়েছিল ওদের অসহায়ত্ব দেখে।  

উত্তরকাশী থেকে চলার শুরুতে, গঙ্গা দর্শন। ছবিঃ লেখক

আর একদম পিছনে ছিল চীনা নয় আসলে জাপান আর কোরিয়ার চারজন। তিনজন জাপানী আর একজন কোরিয়ান। ব্যস এই দশজন মিলে, নানা রকম গল্পে, কথায়, চিন্তায়, ভাবনায়, হাসি, তামাশায় আমাদের ঝকঝকে জীপের দারুণ স্মার্ট আর দক্ষ ড্রাইভার দ্রুত গতিতে তার জীপ চালিয়ে যাচ্ছিল উত্তরকাশী থেকে গাঙ্গোত্রী পথে। বাঁকে বাঁকে নানা রকম রোমাঞ্চের স্বাদ দিতে দিতে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নেদারল্যান্ডের যত বিখ্যাত মিউজিক ফেস্টিভ্যাল

গোমুখ অভিযান: গাঙ্গোত্রীর পথে পথে, বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ