গোয়া ভ্রমণ: স্টার বীচ রিসোর্ট ও সুইমিং পুলের নীল জলে

প্রথম দিনের ক্লান্ত শরীর নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বীচে থেকে রাতে রুমে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম তিন জনেই। ঘুমের আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। পরদিন খুব ভোরে উঠে সমুদ্র তীরে গিয়ে শান্ত বীচ উপভোগ করে রোদের তীব্রতা বাড়লেই হোটেলে ফিরে বিশ্রাম আর সুইমিং পুলে ভেসে থেকে দুপুরের পরে বা শেষ বিকেলে যখন আবার রোদ পড়ে গরম একটু কমে যাবে তখন আবার বীচে যাবো, অনেক রাত পর্যন্ত থেকে ফিরে আসবো।

সুইমিং পুলের প্রবেশ পথ। ছবিঃ লেখক

কিন্তু গত তিনদিনের টানা জার্নি, অসহনীয় গরম আর এই দুইয়ের সম্মিলনে সীমাহীন ক্লান্তিতে ঘুম ভাঙলো ভোরকে অনেক আগেই বিদায় জানিয়ে। ফ্রেস হয়ে যখন রুমের বাইরে নাস্তার জন্য বের হলাম তখন বাইরে তাকানোই দায় হয়ে যাচ্ছিল, সমুদ্রের তীরে যাওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার, এতই রোদের তীব্রতা।
যে কারণে তখন আরও রোদে পুড়ে ত্বক নষ্ট না করে হোটেলের বিশাল ও সবার জন্য উন্মুক্ত সুইমিং পুলে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। দুপুর পর্যন্ত সুইমিং পুলের নীল জলে ডুবে-ভেসে থেকে দুপুরের পরে বা শেষ বিকেলে রোদ কমে গেলে ঝিরঝিরে বাতাসে নারিকেল গাছের ছায়া ঘেরা কোলভা বীচে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সবুজ গালিচা, নীল জল আর আরাম কেদারা। ছবিঃ লেখক

আহা, কী সুইমিং পুল! নাস্তার পরে একটু ঢুঁ মেরে এলাম কী রকম সুইমিং পুল সেটা দেখে আসার জন্য। সুইমিং পুলের রূপ আর পরিবেশ দেখেই আমাদের বীচে যেতে না পারার আক্ষেপ দূরে গিয়ে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলাম। এত বড় আর নানা রকম আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন সুইমিং পুল দেখে। এর চারপাশের মিহি সবুজ লন আর বিশ্রামের জন্য আরামের চেয়ার আর বিছানার মতো আরাম আয়েশের আয়োজন। পুরো পুলের চারপাশে ঘন করে নারিকেল গাছ আর তার ছায়া সেই সাথে ঝিরঝিরে বাতাসের আরাম যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল মুহূর্তেই। দ্রুত রুমে ফিরে গেলাম সুইমিং পুলে নামার নিয়মগুলো জেনে নিয়ে।
এর আগে সুইমিং পুলে দুই একবার নামা হলেও এমন বিশাল আর আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন সুইমিং পুলে এই প্রথম নামার প্রস্তুতি নেয়া হলো। এখানে নামার প্রথম শর্ত হলো নাইলনের কাপড় পরে নামতে হবে। দুই, সুইমিং পুলে নামার আগে পাশের ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার নিতে হবে আগে। তিন, সুইমিং বা পুলের ব্যবহার শেষে আবার বাথরুমে গিয়ে কাপড় চেঞ্জ করে তারপর নিজ নিজ রুমে ফিরতে হবে। তেমন প্রস্তুতি নিয়েই আবারো সুইমিং পুলের কাছে ফিরে এলাম তিনজনে মিলে।
সবুজে আচ্ছাদিত রিসোর্ট। ছবিঃ লেখক

এবার আমাদের হোটেলের পেছনের দিক দিয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে এলাম। আর দেখলাম, আমরা হোটেলের যে অংশে আছি সেটার পেছনের অংশ আরও দুর্দান্তভাবে এক শহরের মাঝে যেন দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট কয়েকটি কটেজ নিয়ে একটি গ্রাম! ছোট ছোট দ্বিতল কটেজগুলোর চারপাশে আম, জাম, কাঁঠাল, কলাসহ নানা রকম ফল ও ফুলের বাগান। আর পুরো হোটেলের এরিয়াই সারি সারি নারিকেল গাছ দিয়ে অন্য আরেকটা জায়গা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা।
ছোট, বড় আর মাঝারি নানা রকম নারিকেলের গাছের সারিতে সাজানো পুরো হোটেল এরিয়ার সবটুকু জায়গা। এসব দেখতে দেখতে সুইমিং পুলের কাছে চলে এলাম। এখানে এসে দেখলাম বড়দের পুলের সাথেই অল্প গভীরতার আর আকারে বেশ ছোট আর একটি ছোট্ট সুইমিং পুল রয়েছে ছোটদের সাঁতার বা জলে ভিজে থেকে নিজেদের মতো উচ্ছ্বাস আর আনন্দ করার জন্য। বাহ, কী চমৎকার আয়োজন!
রিসোর্ট ঘেরা নারকেল গাছের সারি। ছবিঃ লেখক

ঝটপট নেমে পড়লাম নীল জলের শীতল সুইমিং পুলে। সকাল সকাল আমরাই প্রথম আর তখন পর্যন্ত একমাত্র সুইমিং পুলের অধিকারী। ভাবলাম যাক বেশ আরামে আর নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যাবে এই পুলের সবটুকু যেভাবে খুশি সেভাবে। কিন্তু ১৫-২০ মিনিট যেতেই অন্যান্য রুম থেকে আর কটেজ থেকে অনেকেই সুইমিং কস্টিউম পরে পুলের দিকে চলে এলো। বেশ ভাবনায় পড়ে গেলাম যে নিজেদের মতো করে আর বোধহয় উপভোগ করা যাবে না এই পুলের সবটুকু সুবিধা আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের সাথে।
কিন্তু আমাদের সেই ভাবনা ভাবনাতেই রয়ে গেল। কারণ এখানে যারা পুলে এসেছে সবাই যে যার মতো করে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। কারো দিকে কারো তাকানোর সেই ইচ্ছা বা মানসিকতাই নেই। সেই সময় ওদের কারো নেই। আর শুধু ওদের কেন এখানে এরপর যারাই পুলে এসেছে তাদের সবারই দেখলাম একই রকম মানসিকতা, কেউ কাউকে এতটুকু বিরক্ত করছে না বা এমন কিছু করছে না যাতে করে অন্য কেউ এতটুকু বিরক্তিবোধ করতে পারে।
তবে সবার সাথেই পুলের মাঝে সবার কমবেশি পরিচিতি হয়ে গেল। কেউ মুম্বাই, কেউ ব্যাঙ্গালোর, কেউ চেন্নাই, কেউ কেরালা থেকে গোয়া বেড়াতে এসেছে। আমরা বাংলাদেশ থেকে এত দূরে এসেছি জেনে আমাদের স্বাগত জানালো আর গোয়াকে ভালো করে উপভোগ করতে বলল।
সুইমিং পুলের নীল জল। ছবিঃ লেখক

তারা তাদের মতো আর আমরা আমাদের মতো করে সুইমিং পুলে ভাসতে, ডুবতে আর সাঁতার কাটতে লাগলাম। জ্বলজ্বলে রোদের মাঝে টলটলে আর শীতল জলের সাথে চারদিকের নারকেল গাছের ঝিরঝিরে বাতাসের সম্মিলনে একটা অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করছিল।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা ৫ ঘণ্টা বিশাল সুইমিং পুলের শীতল জলের সুখের অবগাহন করেছিলাম ইচ্ছামতো। মাঝে মাঝে যখন ক্লান্তি লেগেছে পুলের পাশের সবুজ গালিচায় আর আরামের বিছানায় হেলান দিয়ে গাছের ছায়ায় বাতাস গায়ে মেখে আবারো নেমে পড়েছি।
পুলের সাথের আরামের আয়োজন। ছবিঃ লেখক

এই হোটেলের আতিথেয়তা, চারপাশের গ্রামীণ শান্ত আর নিরিবিলি পরিবেশ, ফল-ফুল আর পাতাবাহারের আচ্ছাদন, নারকেল গাছের সারি, পুলের চারপাশের মিহি সবুজ গালিচা, আরাম কেদারা, সবকিছু মিলে দুই একটি দিন এখানে বসে, বিশ্রাম নিয়ে, নারকেল গাছের ছায়ায় ঝিরঝিরে বাতাসে আর বিশাল সুইমিং পুলের নীল জলে ভেসে-ডুবে বেশ আরামেই উপভোগ করা যায় অনায়াসে। আর হ্যাঁ, এই হোটেলের একটি ডাবল এসি রুমের ভাড়া মাত্র ১,৫০০ রুপী। আর দিন-রাতের রাইস ও ফিশের প্যাকেজ মাত্র ১০০ রুপী।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিন নেতা শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিনের সফেদ মাজার

সফেদ সমুদ্রের নীলিমা রিসোর্টে দুটি দিন