গাজীপুরের ভাওয়ালে রাজশ্মশানেশ্বরীর নকশাকাটা আলপনা

পুরনো জমিদার বাড়ি, মসজিদ আর মঠ যেহেতু আমার খুব পছন্দ, তাই বিভিন্ন জেলা ঘুরে এসব স্থাপনা কম দেখিনি। এই পর্যন্ত আমি যত মঠ দেখেছি, প্রায় সবগুলোই একই প্যাটার্নে তৈরি। দোতলা, তিনতলা কিংবা চারতলা- যতো উঁচুই হোক না কেন, নিচের ধাপগুলো হয় বর্গাকার।

আর একদম উপরের অংশটুকু হয় মিনারের মতো চূড়া। প্রায় সব মঠেই ঘুরে ফিরে এই ডিজাইনই দেখেছি, একমাত্র গাজীপুরের ভাওয়ালে রাজশ্মশানেশ্বরীর মঠগুলো বাদে। বিভিন্ন রাজবাড়িতে এরকম আলপনা দেখলেও, মঠে দেখেছি এই প্রথম!

নকশাকাটা আলপনা। সোর্স: প্রথম আলো

গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে মৃতপ্রায় চিলাই নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজশ্মশানেশ্বরী। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্ন ঐতিহ্যের অংশ এই রাজশ্মশানেশ্বরীটি ছিল ভাওয়াল রাজপরিবারের সদস্যদের শবদাহের স্থান। এখানে পরিবারের মৃত সদস্যদের নামে সৌধ নির্মাণ ও নামফলক স্থাপন করা হতো। শ্মশান চত্বরে একটি শিবমন্দির রয়েছে।

কারুকাজ। সোর্স: প্রথম আলো

১৯৫১ সালে কালী নারায়ণের সময়ই ভাওয়াল শ্মশান মঠ নির্মিত হয়। আটটি মঠের মধ্যে সামনের তিনটি মঠের নির্মানশৈলী সাধারণ। দেখতে প্রায় একই রকম। কিন্তু বাকি পাঁচটি মঠের নির্মানশৈলী চিত্তাকর্ষক।

এদের মধ্যে একটি মঠ সবচেয়ে উঁচু। সবচেয়ে বড় মঠটি নির্মিত হয়েছে ভাওয়াল জমিদারির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ নারায়ণ রায়ের উদ্দেশ্যে। উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত এই মঠগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে।

সবচেয়ে উঁচু এই মঠ তিনটি। সোর্স: লেখিকা

স্থানীয়রা জানান, পরিকল্পিত সংরক্ষণের অভাবে মঠগুলোর দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। কোনো কোনোটির স্মৃতি চিহ্নটুকুও মুছে গেছে। অসাধারণ সব নকশাগুলো প্রায় মুছে যেতে বসেছে। শ্মশানঘাটের পূর্বপাশেই ছোট পুকুর। সংস্কারের অভাবে এর ঘাটটি ভেঙে গেছে, স্মৃতিটুকু পড়ে আছে কেবল।

পড়ন্ত ওই বিকেলে সারবাঁধা শ্মশানের অবয়ব। সোর্স: লেখিকা

শ্মশানঘাটের পূর্ব দিকে চিতা। এখানে শবদাহ করা হয়। তার পূর্ব দিক দিয়েই চিলাই নদী বয়ে যেত। এখন তার চিহ্ন মাত্রও নেই। চিলাই নদীর পাশে এই শ্মশানটি দাঁড়িয়ে আছে। তাই এর নাম শ্মশানঘাটের মঠ।

স্থানীয়দের দাবী, প্রশাসনিক কতৃপক্ষের কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমেই গাজীপুরের ভাওয়াল রাজাদের অন্যতম কীর্তি এই শ্মশানঘাটটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

মন্দির। সোর্স: লেখিকা

সাহাবউদ্দিন আহম্মেদ ‘কিংবদন্তির সন্ন্যাসী রাজা ও ভাওয়াল রাজবাড়ি’ নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ভাওয়ালের জমিদার জয়দেব নারায়ণের দৌহিত্র লোক নারায়ণ রায় বাংলা ১২৫০ থেকে ১২৬০ সালের মধ্যে গড়ে তোলেন এই ভাওয়াল রাজশ্মশান। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, মূল শ্মশানের কাজে হাত দিয়েছিলেন রাজা কীর্তি নারায়ণ রায়।

শ্মশান চত্বরে একটি শিবমন্দির রয়েছে। সোর্স: লেখিকা

পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে সমাধিসৌধ চত্বরটি। জানা যায়, লোক নারায়ণ রায় ভারতের পুরীর বিখ্যাত স্থপতি কামাখ্যা রায়কে দিয়ে ভাওয়াল রাজশ্মশানেশ্বরী নির্মাণ করান। ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরীর গায়ের অনিন্দ্য নকশাগুলো এখনো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। ছয়টি স্তম্ভবিশিষ্ট শিবমন্দিরটি নির্মাণে মোঘল স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে।

আগে অনেক দূর থেকেও মন্দিরের স্তম্ভগুলো দেখা যেত। কিন্তু শ্মশান চত্বরের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় চোখের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে মন্দিরটি। কিছুদিন আগেও নানা গাছগাছালির ভিড়ে শ্মশান ভূমির প্রবেশ স্থল থেকে মঠগুলো দেখা যেত না।

কিন্তু এখন গাছগুলো কেটে ফেলার ফলে সামনে পায়ে হেঁটে কয়েক গজ এগুলেই চোখে পড়ে বিষ্ময়কর স্থাপত্য। সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় খসে পড়ছে স্তম্ভগুলোর গায়ের অনবদ্য সব কারুকাজ। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্ব দিকে এই শ্মশানঘাট অবস্থিত।

শ্মশান চত্বরে দূর্গা মন্দিরও রয়েছে। সোর্স: লেখিকা

আমি যখন শ্মশান ঘাটে পৌঁছুলাম, তখন শেষ বিকেল। গাড়ি থেকে নামার আগেই শাওন আমাকে বলছিলো, ‘শ্মশানের হাল দেখে মাদিহা আপা নিশ্চয়ই গাড়ি থেকে আর নামবে না।’

ওর কথা শুনে আমি হেসে নেমে পড়লাম। সে জানে না, এরচেয়েও খারাপ দশায় থাকা পুরনো স্থাপত্য দেখতে দূর দূরান্তে দুর্গম অঞ্চলে ছুটে যাই আমি। সেই তুলনায় মঠগুলো তো খুব ভালো অবস্থায় আছে। পড়ন্ত ওই বিকেলে সারবাঁধা শ্মশানের অবয়বগুলো অদ্ভুত অনুভূতি দিচ্ছিল আমায়। আমি যেন এক লাফে দুইশ বছর পেরিয়ে গেছি।

দরজা। সোর্স: প্রথম আলো

কাছে গিয়ে দেখি দেয়ালে নিজেদের নাম লিখে রেখেছে কারা যেন। দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। দর্শনীয় স্থানে এসে এই কাজটা না করলে কী হয়? আফসোস হয়, এতো সুন্দর স্থাপনাগুলোকে আমরা চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যেতে দিচ্ছি।

মঠ ঘুরে আসার পর আমার মনে হলো আমাদের মন সম্ভবত সুন্দর না। মন সুন্দর হলে পুরো দেশটা না হোক, অন্তত দর্শনীয় স্থানগুলো সুন্দর রাখতাম।

বেশ কয়েকটা দেয়ালে নাম লেখা দেখেছি। ভাওয়ালের জমিদাররা তো প্রাসাদ, শ্মশানঘাট বানিয়ে বিখ্যাত হয়েছে, তাহারা নিজের নাম নিজে লিখেই বিখ্যাত হতে চায়।

এসব থেকে বিরত থাকলে কী হয় বলুন তো? আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলো দর্শনীয় থাকে। চাইলেই তো আমরা সচেতন থাকতে পারি। আসুন না, দেশটাকে সুন্দর রাখার চেষ্টা করি?

উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত এই মঠগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। সোর্স: প্রথম আলো

কীভাবে যাবেন :

ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কপথে ও রেলপথে গাজীপুর যাওয়া যায়। গাড়িতে গেলে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে জেলা জাজ কোর্ট (রাজবাড়ী) তার ১০ মিনিট দূরত্বে শ্মশানঘাট।

এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকে জয়দেবপুর গামী ট্রেনে জ্যাম এড়িয়ে অল্প সময়েই যেতে পারবেন। কোন ট্রেন জয়দেবপুর থামবে জেনে নেবেন। স্টেশনে নেমে গাড়ি নিয়ে সোজা রাজবাড়ি ও শ্মশানঘাট।

তথ্যসূত্র :
https://www.prothomalo.com

ফিচার ইমেজ: প্রথম আলো

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতসমূহ

লাকমাছড়ার শীতল জলধারার স্নিগ্ধ পরশ