শান্তিনিকেতনের বর্ণিল বাড়ি অথবা ফুলের স্বর্গ

পৃথিবীতে কি স্বর্গ পাওয়া যায়? বা স্বর্গের মতো কোনো কিছু? কী জানি, স্বর্গ তো আর দেখা হয়নি। তবে তা কেমন হবে বা হতে পারে তার একটা ধারণা পেয়েছি নানা সময়ে। ধর্ম গ্রন্থে, নানা রকম বইপত্রে, আলাপ আলোচনায় আর বিশিষ্ট জনদেরনানা রকম বক্তব্যে। তবে হ্যাঁ, সেটাও হয়তো স্বর্গের কাছাকাছি কিছু নয়। স্বর্গ হয়তো আরও বিশাল কিছু। তাই পৃথিবীতে স্বর্গ আছে কি নেই, পাওয়া যেতে পারে কি পারে না তা নিয়ে হাজারো বিতর্ক হতেই পারে। তবে কেন যেন আমার একটা কথা খুব মনে হয়, আর সেটা হলো পৃথিবীতে স্বর্গ পাওয়া না গেলেও, স্বর্গের কিছু অনুভূতি ঠিক ঠিক পাওয়া যেতে পারে বা পাওয়া যায়।

যারা সত্যিকারের সুখি মানুষ, সত্যি খুব খুব ভালো আছে বা থাকে, ঘরে-বাইরে, অফিসে, কাজে বা নানা রকম ব্যস্ততায়, তারা নানা রকম ব্যস্ততার মধ্যেও সুখ, সুখানুভূতি বা ভালো থাকার নানা রকম উপায় খুঁজে নিতে পারে আর নেয়ও। আমার মনে হয় তারাই পৃথিবীতে স্বর্গ না পেলেও চাঁদের চারপাশে একটা স্বর্গীয় পরিবেশ ঠিক তৈরি করে নিতে পারে। তাহলে স্বর্গটা আসলে কী বা কেমন বা কী কী অনুষঙ্গ পেলে বা থাকলে সেটাকে স্বর্গ বলা যায়?

স্বর্গীয় বাড়ির গেট! ছবিঃ লেখক

আমার মনে হয় স্বর্গ বা স্বর্গীয় পরিবেশ হলো এমন একটা পরিবেশ, এমন চারপাশ আর এমন একটা অনুভূতি যেখানে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, ব্যথা, বেদনা এসব কোনো অনুভূতিই মানুষকে স্পর্শ করবে না। চারদিকে শুধু আনন্দ আর আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর উচ্ছ্বাস, সুখের আবেশ আর অভিলাষের পসরা, পাখির গান আর ফুলের-প্রকৃতির সৌরভ, ফুলেল প্রকৃতি আর বর্ণিল চারপাশ। শুধু রঙ, আলো, হাসি, আনন্দে ভরপুর সবকিছুতে। এসবই হলো স্বর্গ বা স্বর্গের কাছাকাছির সামগ্রিক উপকরণ।

কেন জানি না, আমার নিজের কাছে নিজেকে খুব সুখী, সার্থক আর সব জায়গায় একটা স্বর্গীয় স্বর্গীয় আবেশ আছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে আমি যখন কোথাও খুব খুব আর খুব আগ্রহ নিয়ে, আনন্দ নিয়ে, আর উচ্ছ্বাস নিয়ে বেড়াতে যাই। ভ্রমণের শুরু থেকেই একটা স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যে কারণে চারপাশের দুঃখ, ব্যথা, বেদনা, হতাশা, কান্না, যন্ত্রণা এসব আমার চোখে পড়ে না। বা পড়লেও সেসব কেন যেন তেমন করে আমাকে স্পর্শ করে না।

বর্ণীল বাগান। ছবিঃ লেখক

এই যেমন যেবার শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম সেবার নানা রকম বিড়ম্বনা সত্বেও সেসব আমাকে একটুও স্পর্শ করেনি, যতটা করেছে স্বর্গীয় এক বর্ণিল বাড়ি, তার রঙিন আঙিনা, লাল রঙের ইট সুরকির সরু পথ, সবুজে সবুজে ছেঁয়ে থাকা গাছপালা, শিশিরে শিশিরে জড়ানো মিহি ঘাসের লন, জলের ফোয়ারা, পাখির কলতান, নির্জন আবাসের চারপাশে সুখের আবেশ, সবকিছু মিলে যেন একটা স্বর্গীয় সুখের অনন্য অনুভূতি ছুঁয়ে গিয়েছিল মন আর প্রাণের সবটুকু, সবটুকু।

শান্তিনিকেতনের একটি প্রশান্তির হোটেল যার নামও হোটেল শান্তিনিকেতনে উঠে ফ্রেস হয়ে, ভেতো বাঙালির জন্য রাতের মাছ-ভাত অর্ডার করে পুরনো বাড়ি-ঘরের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া অলিগলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠলাম। কেন জানি না সেই বড় রাস্তা ধরে সবাই যাচ্ছে আর আসছে দেখেও ওদিকে না গিয়ে সেই বড় রাস্তা পেরিয়ে কিছুটা মাঠঘাট আর একটু জংলি পথে পা বাড়ালাম। ওই যে সুখি মানুষের ভাগ্যে স্বর্গ থাকে বোধহয় আগেই বলেছি। আর আমি যেহেতু সুখি মানুষ তাই স্বর্গ বা স্বর্গীয় একটা জায়গা, আমাকে স্বর্গ সুখের পরশ দিতে টেনে নিয়ে গেছে সেখানে। যেখানে গিয়ে দূর থেকেই আমি প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে অপলক দৃষ্টি রেখে আর একটি রাস্তা পার হলাম কোনো এক সম্মোহনী আকর্ষণে।

রঙিন পথের বর্ণীল দুপাশ। ছবিঃ লেখক

পিচ ঢালা পথ পেরিয়ে কিছুটা সবুজ ঘাসের মিহি পথ পেরিয়েই বেশ বড়সড় একটি লোহার গেট। গেটের উপরে, দুপাশের দেয়ালে ঘন করে লাগানো সবুজ লতানো গাছে গাছে, যে গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে রয়েছে লাল টকটকে ফুলের দুল, পাতায় পাতায় গোলাপি থোকায় থোকায় ফুটে থাকা বাগান বিলাসের আহ্বান। কী কারণে জানি না এমন বাগান বিলাসে সজ্জিত কত বাড়িই তো চোখে পড়েছে, কই কোনো বাড়ির গেটের সামনে তো কখনো থমকে দাঁড়াইনি। তবে কেন এই বাড়িটির সামনে থমকে দাঁড়ালাম। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ আছে, যেটা আমি টের না পেলেও, আমার অবচেতন মন ঠিক সেটার খোঁজ পেয়েছে আর আমাকে থামিয়ে দিয়েছে।

কেন থেমে গেলাম? নিজের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে রাখতেই লোহার গেট দিয়ে ভেতরের লনে চোখ রাখলাম। আর তারপর? তারপর আমি পরের কিছুকাল সেই গেটের ভেতরে নিজেকে অবরুদ্ধ করে ফেললাম নিজেরই অজান্তে। তখন জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ।কনকনে আর রুক্ষ শীত ততদিনে আদুরে ভালোবাসা হয়ে উঠেছে। শেষ বিকেলের রোদ তখন উষ্ণতা বিলানো আবেগি প্রেমিকা। এই আদুরে ভালোবাসা আর আবেগি প্রেমিকার মাঝেই চোখে পড়লো অমোঘ আকর্ষণের মোহনীয় সাজে সেজে থাকা এক মন হরণকারিণী। সবুজের কাতানে যেন গোলাপি সাজে সেজে আছে একটি বাড়ি! কী অপূর্ব সাজে সেজে যে আছে সে বলে বোঝানো মুশকিল শুধু নয় অনেকটা অসম্ভবও।

শিশির ভেজা সেই বাড়ির পিছনের বাগান। ছবিঃ লেখক

মনে হলো আমি যেন রবীন্দ্রনাথের লেখা আমার খুব খুব আর খুব প্রিয় ছোটগল্প মালঞ্চর সেই বাড়িটা দেখছি চোখের সামনে। মনে হলো যেন এই বাড়িতে বসেই তিনি হয়তো খুব ভালো লাগার আর আবেশে জড়িয়ে ধরা মালঞ্চ গল্পটা লিখেছিলেন! শুধু সেই পুকুরটা এখানে নেই বা থাকলেও সেটা চোখে পড়ছে না আমার। আছে নিশ্চয়ই বাড়ির পিছন দিকে। আর পুকুর তো পিছনেই থাকে সাধারণত, সামনে নয়। কিন্তু আর বাকি সব যেন মালঞ্চ গল্পের পুরো চিত্রপট আমার সামনে এসে হাসছে শুধু সেই চরিত্রগুলো ছাড়া। আসলেই তো তাই, চরিত্ররা তো সেই কবেই বিলীন হয়ে গেছে পৃথিবী ছেড়ে, কিন্তু প্রকৃতি রয়ে গেছে ঠিক তেমনি। হয়তো কালের বিবর্তনে একটু রদবদল হয়েছে, একটু আধুনিকতার স্পর্শ লেগেছে, একটু বেশী বর্ণিল হয়েছে মানুষের নিয়মিত যত্নে।

লাল ইটের সরু পথের দুইপাশে গাঁদা ফুলের সম্ভাষণ। সাদা, হলুদ, লাল, খয়েরি, গোলাপি নানা রকম ফুলের সমারোহ সরু পথের দুপাশ জুড়ে। আর একদম ছোট ছোট কয়েক রঙের মিশ্রণের গাঁদার সমারোহ। গাঁদার ওপারে ডালিয়ার উদ্ভাসিত হাসি, লাল, সাদা আর গোলাপির সম্মোহন, ছোট ছোট মাচায় আপনমনে দুলছে নানা রঙের ফুলের টব, বাড়ির পাশের বাগানে কত রঙের গোলাপের যে মেলা চলেছে অল্প ফাঁক দিয়ে তাদের অবলোকন ছিল দুরূহ। কসমস, করবি, কামিনী, কেয়া, শিউলি, বকুল সকল ফুলের রঙ, রূপ, রস আর গন্ধে আবেগময় এক জগত তৈরি করে রাখা যেন ভেতরের এক স্বর্গীয় বাড়িতে।

বর্ণীল বাগান। ছবিঃ লেখক

আর সেই গোলাপি সাজে সেজে থাকা বাড়ির ছাদ? সেখানেও আর একটি বাগান যে আছে ঢের বোঝা যাচ্ছিল। বাগানের ভেতরে, গেটের কাছে, দূরে সবচেয়ে প্রিয় কাঠ গোলাপের আহ্বানে আমি তখন বাঁধনহারা হয়ে কাউকে খুঁজে ফিরছি। একটি বার যদি কাউকে বলে একটু ভেতরে ঢোকা যেত? যদি একটু হেঁটে বেড়ানো যেত ওই বর্ণিল বাগানে বা সবুজ লনে, নাহয় লাল ইটের সরু পথে যদি একটু হাঁটা যেত? যদি একটু বসা যেত ফুলের ঝুলন্ত টবে টবে ছেয়ে থাকা ছোট্ট বারান্দায়।

অনেক অনেক অপেক্ষায়ও কারো দেখা না পেয়ে সবুজ ঘাসের পথ পেরিয়ে স্বর্গীয় সে বাড়ির পাশ দিয়ে জংলি পথে হাঁটা শুরু করেছিলাম। স্বর্গীয় সে বাড়ির পিছন দিয়ে যাওয়ার সময় দুক একজন মালি দেখে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেও কার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে জানতে পারিনি। তবে শুধু এটুকু জানাতে পেরেছে যে এই স্বর্গীয় বাড়ির মালিক কলকাতাতে থাকে, মাঝে মাঝে এখানে এসে স্বর্গীয় সুখে কিছুদিন বিলীন হয়ে, নিজেকে সুখের অসুখে বেঁধে রেখে আবার ফিরে আসে।

সত্যি, আবার আসিব ফিরে, তবে সেবার গেটে নয়, ভিতরেই যাবো! ছবিঃ বাবু দা

ফেরার পথে বারবার পিছন ফিরে দেখছিলাম আর মনে মনে ঠিক করেছি স্বর্গীয় এই বাড়িতে একদিন না একদিন আমি থাকবো, থাকবই যদি বেঁচে থাকি। আর আমি জানি আমি যা চাই বিধাতা তার সবই আমাকে দেন, একটু আগে বা পরে। সবই আমি আজ পর্যন্ত পেয়েছি, তবে এটা কেন নয়?

আমি জানি, আজ, কাল বা পরশু এই স্বর্গীয় বাড়িতে আমি একদিন একদিন থাকবোই, ফুলে ফুলে সেজে থাকা বারান্দায় আমি একদিন ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দেব আরাম কেদারায় ঝুলে ঝুলে ফুলেদের স্পর্শ নিয়ে, ওই সবুজ লনে আমি হাঁটবো একদিন, আমার সবচেয়ে প্রিয় কাঠ গোলাপের কাছে গিয়ে ওর মাদকতাময় গন্ধে মাতাল হব, হবই।

আজ, কাল বা পরশু…

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ির হাল হকিকত

ছুটির দিনে ঘুরে আসুন জিন্দা ঐকতান পার্কে