দীননাথ চক্রবর্তীর গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির আদ্যোপান্ত

বাংলার আনাচে কানাচে অসংখ্য জমিদারবাড়ি আছে। কোথাও খুবই বেহাল দশা, বটবৃক্ষদের দৌরাত্ম্যে ভেঙে এই পড়ে তো সেই পড়ে; কোথাও খানিকটা চলনসই; কোথাও খুব ফিটফাট।

কিছু জমিদার বাড়ির অবস্থা একদমই সঙ্গিন, থাকার অযোগ্য। কয়েকটি সরকার মেরামত করে সরকারী কাজে ব্যবহার করছে। আর খুব অল্প কিছু বাড়িতে জমিদারদের উত্তর পুরুষেরা বসবাস করছে। বেশিরভাগ জমিদার বাড়িই এখন আর আসল মালিকের ছোঁয়া পায় না। সেসব জমিদাররা বিভিন্ন কারণে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, কিংবা যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এখনো যে জমিদারবাড়িগুলোতে তাদের জমিদাররা সদর্পে হেঁটে বেড়ায় তার মধ্যে অন্যতম হলো গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি।

পুকুরের পাড়ে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি; image source : মাদিহা মৌ

কালের সাক্ষী হয়ে জমিদারদের এখনো বুকে ধারণ করে সদর্পে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলায় গোবিন্দপুর ইউনিয়নে অবস্থিত গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। এই বাড়িটির জমিদার বংশের বর্তমান উত্তরাধিকারী মানবেন্দ্র চক্রবর্তী চৌধুরী। তারই নামানুসারে এই জমিদার বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে ‘মানব বাবুর বাড়ি’ হিসাবে অধিক পরিচিত। আরও সংক্ষেপে বাবুর বাড়ি।

প্রবেশপথ; image source : মাদিহা মৌ

জাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি যাবো শুনেই অটোচালক বলল, বাবুর বাড়ি যাইবেন? অটোতে অন্যান্য সহযাত্রীরাও সায় জানালো মাথা নেড়ে। এই জমিদারদের জায়গা জমিন এতই বেশি ছিল যে এলাকার নামই জাঙ্গাটিয়া। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে এগারো কিলোমিটার দূরের এই জাঙ্গাটিয়া যাওয়ার একমাত্র গণপরিবহন হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। সময়টাও নেহায়েত কম লাগে না৷ ৩৫-৪০ মিনিট তো লাগেই। কারণ রাস্তা খুব একটা ভালো নয়। তবে সংস্কারের কাজ চলছে।

প্রার্থনালয়; image source : মাদিহা মৌ

অটো বাজারে নামিয়ে দিল। স্থানীয় একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল, কোনদিকে গেলে পাওয়া যাবে বাবুর বাড়ি ওরফে জাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। একটা পুকুরের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এর সীমানা প্রাচীর আর প্রবেশদ্বার৷ পাড় ঘেঁষে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে আমরাও এগিয়ে গেলাম সেখানে। বাড়ির সীমানার ঠিক বাইরেই একটা প্রার্থনালয়।

আমরা প্রাচীন সেই প্রবেশদ্বারের দিকে পা বাড়ালাম। সেকালের মোজাইক আর শিল্পীদের আলপনার গুনে প্রবেশদ্বারটির চমৎকার রূপ ফুটে উঠেছে। একদম উপরে লেখা “শ্রীধর ভবন”। এই জমিদার বাড়িটি অষ্টাদশ শতকের গ্রীক স্থাপত্যকলা অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে। অপূর্ব কারুকার্যময় বাড়িটিতে রয়েছে কাচারিঘর, নহবতখানা, দরবারগৃহ ও মন্দির। মন্দিরটি আলাদা করতে পারলেও বাকি ঘরগুলোর কোনটা কী তা বুঝিনি। আসলে মন্দির আর কাছারিঘরটি ছাড়া অন্য সমস্ত স্থাপনাই আজ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।

মন্দির ও মন্দিরের প্রাঙ্গণে দুর্লভ গোলাপি অলকানন্দা; image source : মাদিহা মৌ

তবে অনেক আগ্রহ জাগানিয়া ব্যাপার দেখেছি। বাড়ির করিডোরে দুজন নারীকে বড় হাম্বল দিস্তায় প্রাচীন পদ্ধতিতে ডাল গুঁড়ো করতে দেখেছি। করিডোর ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় ঘরের দরজা খোলা থাকায় ভিতরটাও একপলক দেখে নিয়েছি। এখনো সেখানে প্রাচীন আমলের খাট, সোফা রাখা আছে। ঘরের ভিতরের দেয়ালে মোজাইকের টাইলস দেওয়া। আর মন্দিরের সামনে আছে দুষ্প্রাপ্য গোলাপি রঙা অলকানন্দা। আগেই বলেছি, চারদিকে সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। বাড়ির সামনে সবুজে ঢাকা সুবিশাল আঙ্গিনা।

কাছারি ঘর; image source : মাদিহা মৌ

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির ইতিহাস বেশ আগ্রহ জাগানিয়া। দীননাথ চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষগণ ছিলেন ব্রাহ্মন গোত্রের জনৈক শাস্ত্রীয় পন্ডিত। তারা ষোড়শ শতকের দিক থেকে বর্তমান জমিদার বাড়ি থেকে দক্ষিণে শিব মন্দিরের কাছে বসতি শুরু করেন। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে দীননাথ চক্রবর্তীর হাত ধরে বর্তমান এই জমিদার বাড়িটির যাত্রা শুরু হয়। তিনিই ইংরেজদের কাছ থেকে হোসেনশাহী পরগনার কিছু অংশ কিনে প্রথম জমিদারি শুরু করেন। পরবর্তীতে বাবু অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী ‘পত্তনি’ সূত্রে আঠার বাড়ির জমিদার জ্ঞানদা সুন্দরী চৌধুরাণীর কাছ থেকে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির অন্তর্ভূক্ত করেন। ইংরেজ শাসনামলে এই এলাকার মানুষ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সাধনায় বিশেষ উন্নতি লাভ করেছিল।

কীভাবে যাবেন

বাড়িটির অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নে। কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি; image source : মাদিহা মৌ

ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ আসতে কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সকাল ৭ঃ১৫ মিনিটে এগারোসিন্ধুর ট্রেনে উঠলে ১১টার মধ্যে কিশোরগঞ্জ পৌঁছে যাবেন। ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ ট্রেনের টিকেট কাটতে শ্রেণী ভেদে ১২৫ টাকা থেকে ২৫০ টাকা লাগে। স্টেশনে নেমে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা ভাড়ায় ইজিবাইকে চলে আসুন কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল সংলগ্ন বটতলা মোড়ে।

প্রাচীন জমানার খাট; image source : মাদিহা মৌ

বাসে করে আসতে চাইলে ঢাকার মহাখালী বা গোলাপবাগ বাস স্ট্যান্ড থেকে কিশোরগঞ্জগামী যেকোনো বাসে করে (ভাড়া ২০০-২২০ টাকা) কিশোরগঞ্জের গাইটাল বাস চলে আসুন। বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৫ টাকা ভাড়ায় আসুন কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল সংলগ্ন বটতলা মোড়ে।

হাম্বলদিস্তা; image source : মাদিহা মৌ

বটতলা মোড় থেকে জনপ্রতি ৪০ টাকা অটোরিকশা বা ইজিবাইক ভাড়ায় সরাসরি চলে যেতে পারবেন গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িতে। চাইলে রিজার্ভ সিএনজি বা ইজিবাইক দরদাম করে নিতে পারবেন, রিজার্ভ নিলে ভাড়া বেশি পড়বে। যেতে সময় লাগবে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট। গাঙ্গাটিয়া বাজার এসে হেঁটেই যেতে পারবেন জমিদার বাড়িতে।

কোথায় খাবেন

জমিদারবাড়ির পাশের বাজারে কয়েকটি সাধারণ মানের খাবার হোটেল আছে। এছাড়া সবচেয়ে ভালো হয় কিশোরগঞ্জ শহরে ফিরে ধানসিঁড়ি, দারুচিনি, গাংচিল, ইস্টিকুটুম, তাজ, মাছরাঙ্গা ইত্যাদি রেস্টুরেন্টে পছন্দের খাবার খাওয়া।

অন্যান্য আসবাব; image source : মাদিহা মৌ

থাকার ব্যবস্থা

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি এলাকায় থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে কিশোরগঞ্জ সদরে রিভার ভিউ, গাংচিল, নিরালা, উজানভাটি, ক্যাসেল সালাম নামে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এছাড়া অনুমতি সাপেক্ষে জেলা সদরের সরকারি ডাক-বাংলোতে থাকতে পারবেন।

Feature image source : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ষাইট্টা গ্রামে পঞ্চশতক বয়সী বট পাকুড়ের আলোছায়া

অপার্থিব পাঁচটি দৃশ্যপট