ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের নজরকাড়া ঝর্ণা গগণচু্ক্কি ও বড় চুক্কি

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর এসেছি দুদিন হলো, উদ্দেশ্য স্ত্রীর চিকিৎসা। ডাক্তার অনেকগুলো টেস্ট দিলো। এগুলোর ফলাফল আসতে তিনদিন লাগবে। এ তিনদিন বসে না থেকে ভাবলাম আশেপাশে ঘুরোঘুরি করে দেখি। হাসপাতাল সংলগ্ন একটা গেস্ট হাউজে আছি আমরা। সেখানকার ম্যানেজার বললো আপনারা মাইসুর ঘুরে আসতে পারেন।

ভেবে দেখলাম  আইডিয়াটা খারাপ না। দরাদরি করে সারা দিনের জন্য একটি এসি গাড়ী নিলাম। প্রধান প্রধান গন্তব্যগুলো ঘুরিয়ে আনবে। সারা দিনের জন্য দিতে হবে ৩,৩০০ রুপি। তবে শর্ত দিলো সকাল ৬টায় বেরিয়ে পড়তে হবে। আমরা রাজি হলাম। আমরা বলতে আমি, আমার স্ত্রী আর ১৩ মাস বয়সী পুত্র।

চলতি পথে মহাসড়কের পাশে – ছবি লেখক

ব্যাঙ্গালোরের একটা অদ্ভূত ব্যপার হচ্ছে এর আবহাওয়া। এ অগাস্ট মাসেও তাপমাত্রা ২২-২৩ ডিগ্রী, রীতিমতো প্রাকৃতিকভাবেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শহর। পথে আরও ঠাণ্ডা লাগতে পারে ভেবে সঙ্গে আমার জন্য উইন্ডব্রেকার আর স্ত্রীর জন্য চাদর নিলাম। সকালে রওনা দেবার সময় দেখা গেলো অনুমানটা ঠিকই ছিলাম, তীব্র বাতাস আর তাপমাত্রা ২০ এর নিচে।

চমৎকার আবহাওয়া থাকে কর্ণাটকায় – ছবি লেখক

আমাদের ড্রাইভারই আমাদের গাইড। বেশ ভালো ইংরেজি জানে, সুতরাং কথাবার্তা চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। গাড়িতে ওঠার পর জানিয়ে দিল আজ আমাদের প্রথম গন্তব্য শিবানসামুদ্র। আক্ষরিকভাবেই এর অর্থ শিবের সমুদ্র। এটি আসলে একটি ছোট্ট দ্বীপের মতো জায়গা। ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে এই জায়গা প্রায় ১০০ কিমি দূরে।

ভোর সাড়ে ৬টায় শুরু করেছিলাম আমরা। নাস্তা করার সুযোগ হয়নি। ইচ্ছে ছিল পথে কোথাও নাস্তার করবো। রাস্তার পাশের হাইওয়ে রেস্তোরাঁগুলো মূলত নিরামিষভোজীদের (ভেজ) রেস্তোরাঁ। বেশি খোঁজাখুঁজি না করে ঝর্ণায় পৌঁছে নাস্তা করবো ঠিক করলাম। হাইওয়েটা চার লেনের বেশ বড়সড়ই। মাইসুর রোড নামেই পরিচিত।

এভাবেই নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে দেখতে হয় ঝর্ণাটি – ছবি লেখক

প্রায় তিন ঘণ্টা হাইওয়েতে চলার পর আমরা হাইওয়ে ছেড়ে ছোট একটি পাহাড়ি রাস্তা ধরে চললাম। সেখানে শিবানসামুদ্রের দিক নির্দেশনা দেয়া ছিল। সেটা অনুসরণ করে একসময় ঝর্ণার কাছে পৌঁছালাম। পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা আছে। সেখানে গাড়ি পার্ক করতেই দূর থেকে পানির পতনের ফলে সৃষ্ট মেঘ দেখতে পেলাম।

কর্ণাটকে বিখ্যাত কোনো ঝর্ণা আছে তাই আমি জানতাম না। কিন্তু এসে শুনলাম এ ঝর্ণাকে বিশ্বের সেরা ১০০টি ঝর্ণার তালিকায় রাখা হয়। পার্কিং এলাকা থেকে হেঁটে ৫০০ গজের মতো যেতেই দেখতে পেলাম বিশাল এ ঝর্ণাটাকে। আসলে দুটো ঝর্ণা এখানে এক সাথে। যার একটির নাম বড় চুক্কি আর অন্যটির নাম গগণ চুক্কি।

এর মধ্যে গগণ চুক্কির উচ্চতায় বেশি, ৯৮ মিটার। আর ২০১টা ধাপের বড় চুক্কির উচ্চতা ৬৯ মিটার। কাভেরী নদী থেকে উৎপন্ন এ ঝর্ণাগুলো মূলত নদীর দুটি শাখা। কেরালার বন্যার কারণে ভয়াবহ পানি বইছে এ দুটো ঝর্ণা দিয়ে। দূর থেকে বোঝাই যাচ্ছিল না এখানে দুটো ঝর্ণা আছে।

অনেকগুলো বানর দেখতে পেলাম আমরা। তবে ট্যুরিস্টদের কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না তারা, তাদের মতোই আছে। কেউ কিছু দিলে সেটা অবশ্য গ্রহণ করছে। পাহাড়ের একটা অংশ রেলিং দিয়ে ঘেরা। এর বাইরে যাওয়া নিষেধ। নিরাপত্তাজনিত কারণেই এ ব্যবস্থা। অতীতে ঝর্ণা দেখতে এসে ঝর্ণার কাছে এসে মারাত্মক দূর্ঘটনায় পড়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাই স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যবস্থা নিয়েছে।

ভারতের কেরালায় বন্যার কারণে ভয়াবহ পানি ছিল ঝর্ণায় – ছবি লেখক

তাতে অবশ্য ঝর্ণা দেখতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তবে কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। দেশে বিদেশে কম ঝর্ণা আমি দেখিনি, তবে স্বীকার করতে বাধ্য হলাম আমার দেখা সেরা ঝর্ণা এগুলো। বড় চুক্কি ঝর্ণাটা প্রশস্ত। প্রতি সেকেন্ডে কত কিউসেক পানি যে এর মধ্য দিয়ে নেমে আসছে বলা মুশকিল। পানির তোড়ের কারণে এর ধাপগুলো দেখা যাচ্ছে না। পেছনে দিগন্তে দেখা চাচ্ছে একটি পর্বতের চূড়া।

আর গগণ চুক্কির পানি খাড়াভাবে পড়ছে। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আর সেই পানির তোড়ে সৃষ্ট জলকণার মেঘ কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে যাচ্ছে। এই পানির তোড়ের মাঝেও এক কোণে একটি গাছ টিকে আছে দেখলাম। সেটার দু’পাশ দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে।

ভারতের কেরালায় বন্যার কারণে ভয়াবহ পানি ছিল ঝর্ণায় – ছবি লেখক

এ ঝর্ণার ভিডিও:

রীতিমতো ঠাণ্ডা জায়গাটা, ভাগ্য ভালো উইন্ডব্রেকার নিয়ে এসেছিলাম। পানির মিলিত স্রোত আরেকটি তীব্র খরস্রোতা নদী তৈরী করেছে। সেখানে প্রাচীন একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ি করে বেশ কিছুটা নিচে এসে এক চিলতে একটি উঠোন মতো করা আছে। ভালোভাবেই রেলিং দিয়ে ঘেরা সেটি। মূল ভিড় ওখানেই, কারণ ওই জায়গাটা থেকে ঝর্ণার ১৮০ ডিগ্রী ভিউ পাওয়া যাচ্ছিল।

এবার হেঁটে সেখানে আসলাম। ভিড়ের মধ্যে ঝর্ণাসহ ছবি তোলার জন্য অনেক কসরৎ করতে হলো, কেউ রেলিংয়ের শেষ অংশটা ছাড়তে চাচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েকজনকে দেখলাম ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তুলে সাথে সাথে প্রিন্ট করে নিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনই এ ব্যবস্থাটা রেখেছে। যাই হোক, অনেক কষ্টে ছবি তুলে আবার উপরে উঠে আসলাম।

জলকণার মেঘ – ছবি লেখক

দেখলাম থাকার জন্য একটার রেস্ট হাউজও আছে। সারা দিনরাত ঝর্ণার পাশে বসে থাকতে পারলে একটা কাজ হতো বটে। উপরে উঠে নাস্তার জন্য দোকান খুঁজে পেলাম, কিন্তু নাস্তা আমাদের পছন্দ হচ্ছিল না। তাই রাস্তার পাশে অনেকগুলো ছোট ছোট ফলমূলের দোকান থেকে সেদ্ধ ভুট্টা আর পেয়ারা খেয়ে চালিয়ে দিলাম সকালের নাস্তার কাজ।

এ ঝর্ণা দেখতে কোনো প্রবেশমূল্য লাগে না। এমনকি পার্কিংয়ের জন্যও কোনো ফি দিতে হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন এখানে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বেশ তৎপর ভূমিকা পালন করছে। ঝর্ণাকে বিদায় দিয়ে আমরা রওনা হলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মাইসুর প্যালেসের উদ্দেশ্যে।

ফিচার ইমেজ: লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তুক'অ দামতুয়া এবং ব্যাঙ ঝিরিতে টিজিবি বাহিনী

কম খরচে পৃথিবী ঘুরুন