ঝালকাঠিতে বাংলার সুয়েজখাল গাবখান চ্যানেল ও গাবখান ব্রিজের কথকতা

কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি ঘুরে বের হতেই প্রসেন বললো, ‘চল, বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ব্রিজ দেখবি।’ আমি তেমন আগ্রহ পেলাম না। ও বলল, ‘এখান থেকে বেশি দূরে নয়, দেখেই যা।’ ঠিক আছে, তাই সই!

কী মনে হতে হেঁটেই ব্রিজে উঠতে চাইলাম। ওমা, হাঁটছি তো হাঁটছিই! পথ আর শেষ হয় না। এতই লম্বা এই ব্রিজ। শেষে বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ধুর ছাই! অটোতে চড়েই যাবো।’

প্রসেন বললো, ‘আর একটু! চল না একটু কষ্ট করে।’

একটু কষ্ট করে হেঁটে যাওয়ার ফলটা একটু পরেই পেলাম। ব্রিজটা এত উঁচুতে যে, ব্রিজের গোড়া থেকে অনেকখানি দূর পেরিয়ে যাওয়ার পরে পানি পাওয়া গেলো। এর মধ্যে অনেক নিচে দালানকোঠা আর গাছপালাগুলো অদ্ভুত দেখাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি কোনো পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছি। যার পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে চমৎকার জলরাশি। উপর থেকে সবুজে ঘেরা সে জলরাশি দেখে মনটা যে প্রশান্তিতে ভরে যাচ্ছিল। ঠিক নিচেই একটা নৌকায় বসে জেলে মাছ ধরার জাল পাতছিলো। পুরো দৃশ্যটিই যেন ছবির মতো সুন্দর।

গাবখান ব্রিজ; Source : মাদিহা মৌ

বলছিলাম গাবখান চ্যানেলের উপরে সদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা গাবখান সেতুর কথা। সেতুটি পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না হেইটিং এনজ ইন্টারন্যাশনাল এটি নির্মাণ করে। সেতুটি বাংলার সুয়েজখাল নামে পরিচিত।

গাবখান চ্যানেল দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত প্রোটোকল চুক্তির জাহাজ এবং ঢাকা-খুলনা-মংলা-চট্টগ্রাম পথের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে প্রতিনিয়ত। এর নির্মাণশৈলী বাংলাদেশের অন্য সব সেতু থেকে আলাদা। এছাড়াও এর আরো একটি বিশেষত্ব আছে। গাবখান চ্যানেলটি বাংলাদেশের একমাত্র কৃত্রিম নৌপথ। বাংলার সুয়েজ খাল খ্যাত গাবখান চ্যানেলটি ১৮০০ সালের শেষের দিকে খনন করা হয়। এটি উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির বিষখালী, সুগন্ধা, পিরোজপুরের কচা, সন্ধ্যা এবং বরগুনার বলেশ্বর নদের সঙ্গে সংযুক্ত।

১৯৫০ সালে মংলা বন্দর প্রতিষ্ঠার পর এটি আন্তর্জাতিক নৌ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের  নৌ যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ গাবখান নদী। এ নদী দিয়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি দেশি-বিদেশি পণ্য ও যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল করে। একসময় এ নদীর প্রস্থ ছিল ২৫০ মিটার। এখন তা ১০০ মিটারে গিয়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো স্থানে প্রশস্ততা আরো কম। পলি জমে সুগন্ধা নদীর প্রবেশ মুখে বিশাল এলাকাজুড়ে চর পড়ায় নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। এখন নৌযান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।

প্রতিমাসে তেলবাহী কমপক্ষে ৪০টি জাহাজ এই পথ ধরে খুলনায় যায়। এছাড়া অন্যান্য পণ্য ও যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচলেও এই পথের কোনো বিকল্প  নেই। এই পথ ব্যতিরেকে অন্য পথ দিয়ে যেতে হলে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে সুন্দরবন ও বরগুনা উপকূল হয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বেশি পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়।

সেতুর অনুচ্চ রেলিং; Source : মাদিহা মৌ

দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র আন্তর্জাতিক নৌপথ গাবখান এই সেতু। ফরিদপুর-বরিশাল হয়ে ঝালকাঠির মাঝ দিয়ে খুলনা, যশোর, বেনাপোল, সাতক্ষীরা পর্যন্ত আন্তঃদেশীয় মহাসড়কগুলোর মেলবন্ধন এ গাবখান সেতু। সেতুটি ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার প্রশস্ত। মজার ব্যাপার হলো, সেতুর মাঝখানে কোনো পিলার নেই। পানির উপরিতল থেকে গাবখান সেতুর আদর্শ উচ্চতা ৬০ ফুট। আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে গাবখান চ্যানেলটি ব্যবহৃত হয় এবং চ্যানেলটির নাব্যতা হ্রাস পাওয়াতেই গাবখান সেতুটি এতটা উঁচু করে বানানো হয়েছে। আর এজন্যই আমরা এত সাধারণ জায়গাতেও এতটা অপরূপ দৃশ্য দেখতে পাই।

চাঁদপুরে আমাদের ছোট্ট ডাকাতিয়ার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদপুর সেতুতেই যেকোনো উৎসবের দিনেই লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। পহেলা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনে উপচে পড়া ভিড় থাকে আমাদের ব্রিজে। মৌমাছির চাকের মতো সেই ভিড়ে যেন মনে হয় ভেঙেই পড়বে ওটা। আর এখানে তো সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা সেতু। এতে যে লোকে ঘুরতে আসবে, তা বলাই বাহুল্য। তাই এই সেতুর উপর থেকে প্রকৃতির নির্মল হাওয়া, নদী, নদীর মোহনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভ্রমণপ্রেমীরা আসেন।

সেতুর ওপর থেকে নিচের ইমারত; Source : মাদিহা মৌ

গাবখান সেতুর এই জনপ্রিয়তার জন্যই হয়তো ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ন্যাশনাল ইকোপার্ক স্থাপন করার কাজ চলছে। গাবখান, সুগন্ধা, বিষখালী ও জীবনানন্দের ধানসিঁড়ির মোহনায় নির্মিত হচ্ছে পার্কটি। সৌন্দর্যময় এ প্রাকৃতিক লীলাভূমি দেখতে ব্রীজ ঘুরে নদীর পাশ দিয়ে বেড়ি বাঁধের উপর ইকো বনায়নের মধ্য দিয়ে দূষণমুক্ত পরিবেশে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে যে কারোরই ভালো লাগবে।

কীভাবে যাবেন

ঝালকাঠি যাওয়ার দুটি পথ আছে। বরিশাল বা পিরোজপুর হয়ে নৌপথে বা লঞ্চে এবং বাসে বা সড়ক পথে।

গাবখান চ্যানেল; Source : মাদিহা মৌ

ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চগুলো রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সদর ঘাট থেকে ছাড়ে। এর মধ্যে সুন্দর বন ৭/৮, সুরভী ৮, পারাবত ১১, কীর্তনখোলা ১/২ লঞ্চগুলো খুবই ভালো। একেকটি লঞ্চ যেন চার তারকা আবাসিক হোটেল। লঞ্চে ডেক ভাড়া ১৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৯০০-১,০০০, ডাবল কেবিন ১,৬০০, ভিআইপি ৪,৫০০ টাকা। লঞ্চগুলো বরিশাল পৌঁছায় ভোর ৫টার দিকে।

নিঃসঙ্গ এক পর্যটক; Source : মাদিহা মৌ

সড়কপথে ঢাকা থেকে ঝালকাঠি যেতে সময় লাগবে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কিছু বাস ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বেশিরভাগ বাস পাটুরিয়া ঘাট অতিক্রম করে ঝালকাঠি যায়, আবার কিছু কিছু বাস মাওয়া ঘাট অতিক্রম করে ঝালকাঠি যায়। বাসগুলো হচ্ছে শাকুরা পরিবহন, ঈগল পরিবহন, হানিফ পরিবহন। এগুলোর মধ্যে এসি বাসের ভাড়া ৭০০ টাকা, নন এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকা, লোকাল বাসের ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। তবে বাসের চেয়ে লঞ্চে ঝালকাঠি গেলেই ভ্রমণ আনন্দদায়ক হবে।

মাছধরা নৌকা; Source : মাদিহা মৌ

ঝালকাঠি জেলার ফায়ার সার্ভিস মোড় হতে ১০ টাকা ভাড়া দিলে অটোরিক্সা ১০-১২ মিনিট সময়ের মধ্যে গাবখান সেতুতে পৌঁছে দেবে।

কোথায় থাকবেন

ঝালকাঠি শহরে থাকার মতো তেমন ভালো কোনো হোটেল নেই। আপনি চাইলে বরিশাল ফিরে আসতে পারেন। বরিশালের কাঠপট্টিতে থাকার জন্য বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ৮০০-২,০০০ টাকার মধ্যে।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এম. ভি. পারিজাতের অনাবিল যাত্রা

এবার ঘরে ফিরে সংসারি হয়ে যাবো!