ট্রেকারদের স্বর্গ রুট সান্দাকফু থেকে ফালুটের পথে

সান্দাকুফু থেকে ফালুটের পথে। ছবিঃ জয়দীপ

ভোর সাড়ে চারটা থেকে সকাল ৮:৩০টা পর্যন্ত কোথাও যাইনি এক পা-ও। ঠাঁই বসেছিলাম শেরপা চ্যালেটের খোলা উঠোনে। এখান থেকেই সবচেয়ে আরামে আর কোনো রকম বাধা ছাড়াই দেখা মেলে পুরো বরফ মুদ্রিত হিমালয় রেঞ্জের। যার শুরুটা ডানের ভুটান থেকে, মাঝে ভারতের কিছু অংশ আর একদম বামে থ্রি সিস্টার সহ স্বপ্নের এভারেস্ট শৃঙ্গ পর্যন্ত। আর এরপরেও রয়েছে নাম না জানা বেশ কিছু বরফে বরফে আচ্ছাদিত পর্বতরাজী যা নেপালে অবস্থিত।

যখন ধ্যান ভাঙল ওই পর্বত শ্রেণী দেখার, ততক্ষণে যারা ফালুট ট্রেক করার চলে গিয়েছে, যারা রিম্বিক হয়ে শ্রীখোলা যাবার তারাও চলে গিয়েছে। আমার প্ল্যান ফালুট যাবার। কিন্তু যে সময় আছে তাতে সন্ধ্যার মধ্যে ফালুট পৌঁছানো সম্ভব নয়। আর স্থানীয় সবাই (যাদের কাছে পরামর্শ নিয়েছি) একা একা ফালুট ট্রেক করতে আন্তরিকভাবেই নিষেধ করলো।

ফালুটের পথে। ছবিঃ denzongleisure.com

কারণ এই পথ খুব খুব সুন্দর আর রোমাঞ্চকর হলেও, অনেক অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এই পথে একদম স্বচ্ছ আবহাওয়ার মাঝেও হুট করে ঝড় বয়ে যায়, ঝড়ো বাতাসে পাহাড় থেকে পাথর ছুটে আসে, যার কারণে অনেকে বড় বড় বিপদের সম্মুখীনও হয়েছে বা হয়। এমনকি খুব খুব ঝুঁকিপূর্ণ কিছু পথে আছে, যেখানে একবার কোনো কারণে পিছলে পড়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়াও যাবে না! তাই একা না যাওয়াই ভালো।

তাই ট্রেকের প্ল্যান বাদ দিতে হলো। কিন্তু ফালুট না যেতে পারলে একটা অপূর্ণতা আর আক্ষেপ থেকে যাবে তাই যাবার উপায় খুঁজতে লাগলাম। আল্লাহর অসীম আশীর্বাদে পেয়ে গেলাম একটি উপায়। গতকাল যাদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম তাদের সবাই ফালুট যাবে না, তবে কয়েকজন যাবেন। আর আমি চাইলেই তাদের সাথে যেতে পারি। ব্যস, ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লাম তাদের জীপে। শুরু হলো এক স্বপ্নময় পথ।

এমন পাথরের রাস্তায় এর আগে কখনো কোনো গাড়িতে ওঠার দুর্ভাগ্য আমার হয়নি। এই রাস্তাতেই গতদিন হেঁটে গিয়েছিলাম বেশ ৪/৫ কিলো পথ, উচ্চতার সাথে মানিয়ে নিতে। কী অদ্ভুত সেই রাস্তাটা, সান্দাকফু থেকে ফালুট যাবার পথ। যেন এক স্বর্গের পথে চলছিলাম। যে রাস্তার মাধুর্য আর মোহময়তা কোনো শব্দে লিখে বোঝানো সম্ভব নয় আদৌ।

রোমাঞ্চকর যাত্রা, সান্দাকুফু থেকে ফালুট। ছবিঃ offroadadventure.in

পাহাড়ের মাঝ থেকে, অনেকটা চূড়ার মতো অবস্থানে পাথরের রাস্তা, পাশের ছোট ছোট সবুজ পাহাড়ের মাঝ দিয়ে ট্রেকারদের জন্য নিজেদের তৈরি করা পথ। সবুজ আঁকাবাঁকা পাহাড়ের গায়ে গায়ে সিঁথির মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া রাস্তা। মাঝে মাঝে বৃষ্টির পানি জমে দুই পাহাড়ের ভ্যালীতে তৈরি হয়েছে সাময়িক লেক। রাস্তার ডান পাশে সারি সারি পাইনের বন, বহু বছরের পুরনো শ্যাওলা জমে জমে কালো হয়ে যাওয়া পাইনের শরীর। যার উপরের দিকে তাকালেই সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে নীল আকাশ আর সাদা মেঘেদের মাঝ থেকে উঁকি দেয়া সূর্যের হাসি।

যতদূর চোখ যায় পাহাড়ের গায়ে গায়ে পাইনের বন, নেমে গেছে পাদদেশে, সিঁড়ি বেঁয়ে, কোনো এক পাহাড়ের ভ্যালীতে। এরপর ওপাশে আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে পাইনের বন, ধীরে ধীরে উঁচুতে আরও উঁচুতে। এক সময় পাইনের বন শেষ হয়ে, শুরু হয় রুক্ষ পাথুরে পাহাড়। যে পাহাড়ের সিঁড়িও শেষ হয়ে যায় এক সময়, শুরু হয় কিছুটা সবুজ পাহাড় আর এরপরেই ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয়ের বরফে মোড়া চূড়াগুলো! এক অপার্থিব সময় আর জায়গা সেটা।

আর যদি ট্রেকের পথে বামে তাকাই তো চোখে পড়ে, ছোট ছোট টিলার মতো সবুজের কার্পেট বিছানো পাহাড়ের সারি। আসলে ওগুলো অনেক বড় আর উঁচু পাহাড়, আমরাই তো আছি ১২,০০০ ফুটের উচ্চতায়, তাহলে ওগুলো কীভাবে টিলার মতো হয়? আসলে হয়েছে কী, এই পথে এত বিস্তৃত পাহাড়ের সারি যে আর উঁচু না হয়ে শুধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা রঙের-বর্ণের আর আকারের পাহাড়ের দল।

মেঘে পাহাড়ে গড়াগড়ি! ছবিঃ লেখক

সবুজ পাহাড়ের দলের সাথে খেলা করছে সাদা সাদা মেঘেদের দল। চাইলেই মেঘের সাথে মিশে যাওয়া যায় অনায়াসে! ভিজে যাওয়া যায় ইচ্ছে মতো, আর একটু মেঘেদের থেকে এদিকে এসে মিষ্টি রোদে দাঁড়ালেই দারুণ আনন্দ! দুই একটি পাহাড়ি জংলী পাখি, আর নাম না জানা শত ফুলের রঙিন হাসি। আর সেসব সবুজের পাহাড়ের দলগুলো ধীরে ধীরে নিচে নেমে গিয়ে মিশেছে কোনো এক ভ্যালীতে যার ওপারেই আবার সাদা বরফ পাহাড়ের মেলা!

আহা, কোন দিকে তাকাই এখন? বামের সবুজ পাহাড়ের সাথে সাদা মেঘেদের খেলা দেখি? নাকি ডানের কালো কালো পাইনের বনের ভিতরে ফুটে থাকা হাজারো রঙের বর্ণিল ফুলেদের দিকে? সবুজে ছেঁয়ে থাকা রাস্তার দু’ধারের অপার সৌন্দর্যের দিকে? কী যে করি, হাঁটি না বসে থাকি নাকি চুপচাপ সবুজে শুয়ে শুয়ে চোখ বুজে অনুভব করি? বুঝতে পারছিলাম না। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছিলাম।

এরপর ভাগ্য প্রথমে বেশ সদয় হয়েছিল আর তার কিছুক্ষণ পরেই প্রকৃতি হয়েছিল ভীষণ বিরূপ। আমাদের গাড়ি যে পথে যাবে, সেই পথে এত গভীর খাদ হয়েছে যে কোনোভাবেই গাড়ি যাবার উপযুক্ত ছিল না। যে কারণে আমরা নেমে পড়লাম সেই সবুজ পাহাড়ি ভ্যালীতে, মেঘেদের মাঝে। শুরু হলো ট্রেক ফুল আর পাখিদের সাথে, সবুজের পথে-পথে।

ফালুটের পথে ট্রেক। ছবিঃ holidayhotspot.info

এক একটা পাহাড় পেরোই আর এক এক রকম মোহ ঘিরে ধরে চারপাশ থেকে। এক এক পাহাড়ে এক এক রকম মেঘের দল, এক এক রঙের ফুলের চাদর আর এক এক রঙের ঝলক। একটু হাঁটি আর একটু বসে থাকি আর অপলক চেয়ে থাকি চারপাশের বিমোহিত রূপ দেখে। মনে হয় যেন এক জায়গায় বসেই থাকি যতক্ষণ মেঘ ঢেকে না দেয় অপরূপ প্রকৃতিকে বা ঝড়-বৃষ্টি এসে বাধা না দেয় এই রূপ অবলোকনে। এভাবে চলে গিয়েছিলাম অনেক দূরে, প্রায় ১৩ কিলো।

সামনে চেকপোস্ট এলো আর একটা। বুকের মধ্যে দুরুদুরু শুরু হলো। আমার তো গাইড নেই, যদিও একটি গ্রুপের সাথে আছি আপাতত। টিকেট কাটা নেই, যদি ঝামেলা করে? চিন্তায় পড়ে গেলাম বেশ। কিন্তু আমাকে বাঁচাতেই কিনা কে জানে, দুম করে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই কালো মেঘে ঢেকে গেল পুরো ভ্যালী সহ আশেপাশের সমস্ত পাহাড়। ঢেকে গেল দূরের সমস্ত বরফ পাহাড়ের রূপ নিমেষেই। আর আমাদের আশ্রয় নিতে হলো ফেলে আসা গাড়িতে, যেটা বেশ আগেই চলে এসেছে এই চেক পোষ্টের কাছে।

কোনো রকমে আমাদেরকে নামিয়ে নিজেদের মতো করে ধাক্কা দিয়ে, পাথর দিয়ে, গাছের বাকল কেটে, মাটির তলায় দিয়ে চাকাকে চলার উপযোগী করে সেই খাদের ভেতর থেকে। এরপর এমন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো যে, সেখানকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী আজকে আর ফালুট না যাবার পরামর্শ দিল। ওদিকে রাস্তা নাকি আরও বেশী খারাপ। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ আর ফিরতে পারা যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত নয় ড্রাইভাররাও!

ফালুটের পথে জীপের আটকে যাওয়া। ছবিঃ লেখক

যে কারণে একদম ফালুট আর যাওয়া হলো না। ফিরে আসতে হলো সেই ঝড়ো আবহাওয়ায় ধীরে-ধীরে, খুব ধীরে-ধীরে, সান্দাকফুর দিকে। যদিও রয়ে গেল ফালুট পুরোপুরি না যেতে পারার ক্ষীণ আক্ষেপ, তবে অপূর্ণতা নেই এতটুকু, নেই কোনো অতৃপ্তি, কোনো মন খারাপের কারণ।

কারণ আমি মনে করি আর বিশ্বাস করি, সব স্বপ্ন, সব চাওয়া, সব আকাঙ্ক্ষা একসাথে পূরণ হতে নেই, উচিৎ নয়! ওতে অহং বাড়ে, অহমিকা হয় নিজের মধ্যে, ধরাকে সরা করে ফেলি আমরা। আমাদের এমনই স্বভাব!

ফালুটের পথে পথে… ছবিঃ team-bhp.com

তাই সব কিছুতেই কিছু অপূর্ণতা, একটু আক্ষেপ আর কিছুটা না পাওয়া থাকা উচিৎ, তাতে করে আগামীর জন্য স্বপ্ন বেঁচে থাকে, নতুন কল্পনার রঙ লাগাতে ইচ্ছা করে, আর ভাবনাগুলো ফিকে না হয়ে গিয়ে, নিজেদের ডালপালা মেলতে থাকে নতুনের সম্ভাবনায়। জীবনকে আরও আরও নতুনভাবে, নতুন জায়গায়, নতুন অভিজ্ঞতায় সাজাতে সাধ জাগে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: পাবনার জমিদার বাড়িসমূহ

দিয়াবাড়ি, সিঙ্গাপুর রিসোর্ট আর তুরাগের তীরে এক অদ্ভুত বিকেলের গল্প