গোমুখ অভিযান: চিরবাসা থেকে ভুজবাসা

ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু পথ পেরিয়ে চিরবাসায় আসার পরে ভেবেছিলাম পরের ছয় কিলোমিটার বুঝি বেশ হেলেদুলে যাওয়া যাবে। কারণ চিরবাসা থেকে অনেকের সাথেই কথা বলে জেনেছিলাম, সামনের ট্রেকে তেমন একটা চড়াই নেই, চড়াইয়ের চেয়ে উৎরাই বা পাহাড়ি ট্রেইল ধরে নিচে নেমে যাওয়াটাই বেশী। তাই মনে মনে বেশ খুশিই হয়েছিলাম আর ভেবেছিলাম সামনের পথটুকু তাহলে খুব দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করবো।

চিরবাসা থেকে পথের শুরুটা বেশ আনন্দের, প্রায় সমতলের আঁকাবাঁকা পথের দুইপাশে অনেক সবুজের আচ্ছাদন, গাছে গাছে ছায়া দিয়ে যাওয়া মুগ্ধ পথ চলে গেছে কিছুটা রুক্ষ পাথরের মাঝ দিয়ে সবুজ অরণ্যের মাঝে। কিছুটা রোদ, কিছুটা গাছের ছায়ার লুকোচুরি খেলার মাঝে হাঁটতে দারুণ লাগছিল। আর পাও ফেলছিলাম খুব দ্রুত। যেন সন্ধ্যার বেশ আগেই পৌঁছে যেতে পারি ভুজবাসা, গোমুখের বেজক্যাম্পে। যেন দিনে দিনে পৌঁছে ভুজবাসাটা একটু ঘুরে দেখতে পারি চারপাশ থেকে। সেভাবেই এগোতে শুরু করেছিলাম।

ছায়া ঘেরা পথে পথ চলা শুরু। ছবিঃ লেখক

কিন্তু কতটা পথ আর হবে? খুব বেশী হলে ১৫ মিনিটের দূরত্ব। আর তারপরেই একটা জায়গা এলো যেখানে কিছুদিন আগেই মূল ট্রেকের পথ পাহাড়ি পাথুরে ঝরে ভেঙে গেছে বোঝা গেল। সেখানে পাহাড়ের পিঠ কেটে কোনো রকমে একজন মানুষ হেঁটে যাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে। যেখানে যখন তখন পাথর ঝড় হয়, ঝড় ছাড়াও যেখানে পাহাড়ের উপর থেকে একটু বাতাস হলেই গড়িয়ে পড়ে ছোট বা বড় বড় পাথর! যে পাথরের কারণে বা পাথর ঝড়ের জন্য রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। তাই সেই পথটুকু অনেক সরু হলেও পেরোতে হবে যতদ্রুত সম্ভব। পাথরের ছুটে আসা থেকে নিজেকে বাঁচাতে।

সেখানে আর্জেন্টাইন ট্রেকাররা ধীরে ধীরে আর একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে সেই পাথুরে ঝড়ের ভয়ানক পথ। পুরো পথ ঝুরো পাথর, ঝুরো মাটিতে ভরা, পায়ের নিচে পড়লেই পিচ্ছিল পথের মতো এদিক ওদিক সরে যাচ্ছিল, যেন কাদাময় পথে বৃষ্টি পড়ে পিচ্ছিল হয়ে গেছে। আসলে মোটেই তেমন নয়, ঝুরো পাথর বা মাটির পাহাড়ি ট্রেইলগুলো এমনই। শুকনো হলেও বিপজ্জনক আর দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ। এই পথটুকু তড়িঘড়ি করে পার হতেই একটা পাহাড় পেরিয়ে অন্য পাহাড়ে যেতে হবে আবারো গঙ্গার প্রমত্ত ধারা পেরিয়ে। তবে এই পাহাড়টা পেরোতে দুটি পথ আছে।

ভয়ানক পথের মাঝে। ছবিঃ লেখক

দুটোই দারুণ রোমাঞ্চকর আর বেশ ভয়ের এবং অনেকটা কষ্টের সেই সাথে ঝুঁকি তো আছেই বোনাস হিসেবে। কোন পথটা পেরোবেন আপনি? কোন রোমাঞ্চ পেরিয়ে যাবেন অন্য পাহাড়ের সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই।

পথ এক: যে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই পাহাড়ের শরীর বেয়ে একটা আঁকাবাঁকা ট্রেইল তৈরি করা আছে, যেটা বেয়ে বেয়ে উপরে, প্রায় পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তারপর নদী ও ঝর্ণার মাঝ দিয়ে ঝুলে থাকা কাঠের সেতু পেরিয়ে অন্য পাহাড়ে গিয়ে যতটা এর আগে উঠেছেন ঠিক ততটাই আবার নামতে হবে পাহাড়ি ঝুরো মাটি ও পাথরের পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে। যেখানে আসল কষ্ট হলো পাহাড়ি ট্রেইল বেয়ে অনেকটা উপরে উঠে নদী পেরিয়ে আবার পাহাড়ি ট্রেইল বেয়ে নিচে নামা। যেটা অনেক সময় সাপেক্ষ আর ভীষণ কষ্টের।

মাথার সিঁথির মতো সরু পথ। ছবিঃ লেখক

পথ দুই হলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে আরেকটি পথ নিচের দিকে নেমে গেছে, কিন্তু সেই পথের শুরুতেই গাছ লতাপাতা ও পাথরের স্তুপ করে রেখে সেই পথে না যাবার সংকেত দেয়া আছে। যেটা আপনাকে নিজ থেকে বুঝে নিতে হবে পাহাড়ে একা একা ট্রেক করতে হলে বা গ্রুপের সাথে গেলেও। এখানে নিজের কিছু কমনসেন্স খুবই জরুরী যেগুলো মাঝে মাঝে নিজ থেকে কাজে লাগাতে হয়। নয়তো নানা রকম বিপদে পড়তে হতে পারে মুহূর্তেই।

আর এই দ্বিতীয় পথটাই ছিল নিজের কাছে নিজের পরীক্ষার। যেহেতু আমি একা, আমাকে গাইড করার কেউ নেই, তাই নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। এই বাঁধা দেয়া বা পথ রোধ করা পথের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এই পথেই ওপারের পাহাড়ে যাওয়া যাবে নিচের আর একটা ঝুলন্ত কাঠের সেতু পেরিয়ে। যাতে উপরের পাহাড় চূড়ায় উঠে আবার নিচে নামার চেয়ে অনেক কষ্ট হবে। তবে এই পথে কষ্ট কম হলেও ঝুঁকি অনেক অনেক বেশী। কারণ এই নিচের পথের শেষ যেখানে হয়েছে সেখানে নদীর উপরে যে সেতুটি ঝুলে আছে সেটার এক পাশ ভেঙে নদীর মাঝে প্রায় পড়ে যাচ্ছে। কোনোমতে একটু লেগে আছে ওপারের পাহাড়ের পাথরের সাথে। আর সেতুটিও কাঁত হয়ে আছে নদীর দিকে।

সতর্ক পথের মাঝে। ছবিঃ লেখক

অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে এই পথে যাওয়া যেত সময় আর কষ্ট বাঁচাতে। কিন্তু ভেবে দেখলাম এই পথে যেতে গিয়ে যদি সেতুটা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে যায় তো ট্রেক এখানেই শেষ আমি শেষ না হলেও। আর নদীর স্রোত কোথায় নিয়ে গিয়ে, কোন পাথরের সাথে থামাবে সেই বা কে জানে? আর যদি ভাসিয়ে নিয়ে নাও যায়, সবকিছু ভিজে একাকার হয়ে শীতে মরে যাওয়া খুব কঠিন কিছু হবে না। আর যেহেতু সাথে কেউ নেই, মরে পড়ে থাকা আরও সহজ হবে এই গঙ্গার মাঝের কোনো পাথরের আড়ালে। সুতরাং একটু কষ্ট হলেও পাহাড়ের শরীর বেয়ে বানানো ট্রেইলের পথ বেছে নিলাম। তবে হ্যাঁ মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম এই পথে ফেরার সময় উঁচুতে না উঠে নিচের ঝুঁকিপূর্ণ পথেই নতুন রোমাঞ্চে খুঁজে ফেরার চেষ্টা করবো।

পথের মাঝেই ঝরা পাতার মুগ্ধতা। ছবিঃ লেখক

পাহাড়ের ট্রেইলে চড়ে, প্রায় চূড়ায় উঠে আবার নিচে নেমে পথ চলতে শুরু করতেই সামনে আবারো পাথর গড়িয়ে আসা আর ঝুরো মাটির ঝুঁকিপূর্ণ পথ এসে পড়লো। যেটা আগের পথের চেয়ে অনেক বেশী ভয়ানক আর ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই পথের শুরুতেই রীতিমতো সাইনবোর্ড দিয়ে লিখে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে ট্রেকারদের জন্য! তবে এই পথটুকু পেরোতে পারলেই দেখা মিলবে আজকের গন্ত্যব্যের। ভুজবাসার। ভুজবাসা আর এক থেকে দেড় কিলোমিটার সামনে। একজন গোমুখ ফেরত ট্রেকারের কাছে জানলাম। যার অর্ধেক পাহাড়ি ট্রেইলের সামান্য উঁচুনিচু পথ আর বাকি অর্ধেক পাহাড় থেকে নেমে গিয়ে একটা ভ্যালী। যেটাই ভুজবাসা, আমার আজকের গন্ত্যব্য বা গোমুখ যাবার বেজক্যাম্প।

প্রায় চলে এসেছি সেই আনন্দে শরীরে দ্বিগুণ শক্তি ফিরে পেলাম যেন! পাহাড়ের পথটুকু অনেকটা দ্রুত চলতে শুরু করেছিলাম। এরই মধ্যে সূর্যের তেজ কমে গিয়ে, হুহু বাতাসের জোর বেড়ে গেল মুহূর্তেই। যার জন্য কনকনে ঠাণ্ডায় কান, মাথা আর হাত জমে যেতে শুরু করলো প্রায়। তাই আবারো টুপি, গ্লাভস পরে নিতে হয়েছিল। এরপর পনের মিনিট বা ২০ মিনিট এক নাগাড়ে হেঁটেই পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সাইনবোর্ড।

ভুজবাসার কাছাকাছি অচেনা ফুলের দেখা। ছবিঃ লেখক

লালচে ঘাসফুল বা গুল্মলতার সাথে সাদা সাদা পাহাড়ি নাম না জানা ফুলের মাঝে লেখা সাইনবোর্ড, “ভুজবাসা”। আহা এসেই পড়েছি তবে আজকের গন্তব্য ভুজবাসায়। সামনের পাথরের পথ পেরিয়ে, পাহাড় থেকে নিচে নেমে গেলেই আজকের মতো বিশ্রাম। ভুজবাসার পাহাড়ি ভ্যালীতে নামার আগে পাহাড়ের চূড়ার উপরে একটি ভাঙা স্থাপনায় বসে বসে কিছুক্ষণ দেখতে শুরু করলাম অন্য রকম এক পাহাড়ি ভ্যালীর বর্ণীল ভুজবাসাকে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

২০১৯ সালে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ এয়ারলাইন্সের তালিকা

যে ৬টি কাজ আপনার ভ্রমণকে দিতে পারে নতুন রূপ!