ফয়'স লেক: যেখানে রয়েছে ত্রিভুজ প্রেমের দৃশ্য

পতেঙ্গা ভ্রমণের কাহিনী লিখতে গিয়ে আগেই বলেছিলাম আকাশ, সাগর আর পাহাড় আমাকে এক অদৃশ্য মায়াবলে আকর্ষণ করে। পতেঙ্গা গিয়ে আমি আকাশ আর সাগরের মিলন দেখেছি, কিন্তু পাহাড় দেখিনি। তাই গিয়েছিলাম বাটালী পাহাড়ে, সেখান থেকে দেখেছি চট্টগ্রামের অবর্ণনীয় সৌন্দর্য; দেখেছি আকাশও, কিন্তু সাগর সেখানে অনুপস্থিত। তিনটি জিনিস একসাথে দেখার সাধ অনেক দিনের। আমার এই চাওয়া কি পূরণ হবে?
শুনেছি, মানুষের সকল চাওয়া একসাথে পূরণ হয় না। এই কথাটির বাস্তবতাকে আমি মেনে নিতে পারি না। তাইতো ঘুরে বেড়িয়েছি চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, চট্টগ্রামই আমার এই সাধ পূরণ করবে।
সেদিন, সকালের নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম ফয়’স লেক বা ফয়েজ লেকের উদ্দেশ্যে। শুনেছি, সেখানকার একটি ওয়াচ টাওয়ার থেকে চট্টগ্রামের বার্ড’স আই ভিউ দেখা যায়। গুরুদেবের অমৃত বাণী আমকে এখানে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে উদ্দীপনা যোগাল, “ যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই। পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।”
ফয়েজ লেক নগরীর খুলশী এলাকায় অবস্থিত। এটি একটি কৃত্রিম হ্রদ, যা ১৯২৪ সালে প্রায় ৩৩৬ একর জায়গা জুড়ে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে খনন করা হয়। সেসময় এটি পাহাড়তলী লেক হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ইংরেজ রেল প্রকৌশলী ফয়-এর (Foy) নামে নামকরণ করে এর নাম হয় ফয়’স লেক বা ফয়েজ লেক। মূলত  এই লেকটি তৈরির করা  হয়েছিল রেল কলোনিতে বসবাসকারী মানুষের কাছে পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

লেকের এক অংশ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

এছাড়াও বলা হয়, এটি বাংলাদেশের সবথেকে বড় বদ্ধভূমি। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বধ্যভূমির বিভিন্ন স্থানে পাঁচ হাজারের অধিক মুক্তিকামী লোককে গুলি ও জবাই করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। এই ফয়েজ লেকই আজ নাগরিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে যাচ্ছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে বহু লোক এখানে আসে একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে।
মেইন রোডে নেমে খানিকটা হাঁটতে হলো। রাস্তার পাশে রয়েছে সারি সারি দোকান, বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁ। এগুলো দেখেই বোঝা যায়, ফয়েজ লেক বেশি দূরে নয়। তবুও একজনের কাছে জানতে চাইলাম, আর সে একেবারে লেকের প্রবেশ গেট দেখিয়ে দিলো।
আশেপাশের সবকিছু থেকে লেকের আভাস পেলেও কাছ থেকে যেন সেটা খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। এটি আমার কাছে ছিল কিছুটা মায়া স্বরূপ। আপনিও যদি ওখানে প্রথমবার যান তবে সামনে চিড়িয়াখানার গেট দেখে একটু বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। কারণ, রাস্তাটি সোজা চিড়িয়াখানার গেটে গিয়ে থেমেছে। আর তার পাশেই রয়েছে ফয়েজ লেকের গেট, যা দূর থেকে সোজা চোখে পড়ে না। আর আমরা মানুষেরা তো সোজা জিনিস ছাড়া কিছু দেখতেই চাই না।
বিশাল এই গেট পেরিয়ে প্রথমেই রয়েছে অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডর প্রবেশ পথ। চারদিকে রঙের ছড়াছড়ি আর গোছালো পরিবেশ, এ যেন এক ভিন্ন জগতের আবহ। নাগরিক জীবনে এমন পরিবেশ পেতে হলে বিনোদন কেন্দ্রের বিকল্প নেই।
অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডের প্রবেশ পথ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডে গিয়ে প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরাট এক নাগরদোলা। এটি দেখার পর আমার লন্ডন আইয়ের কথা মনে হয়েছিলো। লন্ডন আই এতটাই উঁচু যে, এর উপর থেকে পুরো লন্ডন শহর দেখা যায়।
এই নাগর দোলা থেকেও হয়তো পুরো ফয়েজ লেক দেখা যেতে পারে। অবশ্য এটি ধারণা মাত্র, আমি আর তা যাচাই করতে গেলাম না। কারণ, কুরমা ছেড়ে যে কেউ খুরমা খেতে চায় না।
নাগরদোলা; Source: অচিন্ত্য আসিফ

নাগরদোলা ছাড়াও এখানে রয়েছে এপোলো ফ্লাইট, সার্কাস সুইং সহ নানা ধরনের আধুনিক সব রাইড। এছাড়াও আশেপাশের পরিবেশটা অন্যান্য অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডের মতোই।
এরপর সিঁড়ি বেয়ে একটু উপরে উঠতে হয়। এখান থেকেই দেখা যায় লেকের এক অংশ। ঘাটে রয়েছে একটি নৌকা বাঁধা- এটি একটু অন্যরকম। হয়তো পর্যটকদের জন্যই বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।
লেক ভ্রমণের জন্য নৌকা; Source: অচিন্ত্য আসিফ

এখান থেকে নৌকায় করে লেকের ভেতরে ঘুরে বেড়ানো যায়। এছাড়াও যাওয়া যায় ফয়েজ লেকের অন্য অংশ সী ওয়ার্ল্ডেও। লেকের ভিতরে বর্ষার সময় ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। এসময় বর্ষার পানির স্পর্শে লেকের সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে যায়।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করছিলাম। এখান থেকে চোখে পড়ে পানির উপর নির্মিত বাঁশের তৈরি কিছু বসার স্থান, পাহাড়ের এক পাশে রয়েছে একটি বড়ো রেস্তোরাঁ এবং লেকের অপর পাশে একটি অবকাশ কেন্দ্র। চাইলে আপনি এখানে রাত্রিযাপন করতে পারেন।
বসার স্থান; Source: অচিন্ত্য আসিফ

রওনা হলাম ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। পাহাড়ের গায়ে তৈরি করা সিঁড়ি বেয়ে সোজা উপরে উঠে গেলাম। এখান থেকে লেকের এক অংশ দেখা যায়। এখানে একটি পিকনিক স্পট রয়েছে; সেখানে নানা জীব জন্তুর মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। আপনি কোনো বাচ্চা মানুষ হয়ে থাকলে ভয় পেতে পারেন। সুতরাং, সাবধান।
পাহাড়ের উপরে নির্মিত রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম। এখানে হাঁটার সময় মনে পড়ছিল বড় বড় পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই পার হওয়ার কথা। কারণ, রাস্তাটি বেশ উঁচু-নিচু। একটু সামনে এগিয়ে লেকের আরেকটি অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম। এছাড়াও অপর পাশে রয়েছে একটি লাল মাথা। হ্যাঁ, লাল মাথা। আসলে এটি লাল পাহাড়ের চূড়া। পাহাড়টির নাম জানি না, তবে প্রতি পদক্ষেপে নতুন সৌন্দর্য লাভ করায় বেশ ভালোই লাগছিল।
লাল চূড়া; Source: অচিন্ত্য আসিফ

এগুলো দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম একটি দ্বিতল ভবনের সামনে। এটিই ওয়াচ টাওয়ার; এখান থেকেই দেখা যায় চট্টগ্রামের একটি বিরাট অংশ, এটা সবার কথা। আমি একটু অন্যভাবে বলব, এখান থেকে দেখা যায় চট্টগ্রামের আসল রূপ। এখান থেকে দেখা যায় সাগর, আকাশ আর ব্যস্ত নগরীর কৃত্রিমতা।
ওয়াচ টাওয়ারের উপরে রয়েছে একটি দূরবীন। এই দূরবীনে চোখ রেখে আমি দেখেছি আমার স্বপ্ন। দেখেছি আকাশ, সাগর আর পাহাড়ের মিলন, যেখানে সাগরের বিশালতা লুটিয়ে আছে পাহাড়ের পাদদেশে, আর আকাশের অসীমতা মিশে গেছে সাগর কিনারে। এ যেন এক ত্রিভুজ প্রেমের দৃশ্য।
দূরবীন দিয়ে দূরের ঐ সাগরই অনেক কাছে দেখায়; Source: অচিন্ত্য আসিফ

কীভাবে যাবেন:

ফয়েজ লেকে যেতে হলে আগে আপনাকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। চট্টগ্রামের মূল শহর থেকে সিএনজি নিয়ে যেতে পারবেন এই লেকে। এটি শহরের ভেতরে হওয়ায় যাওয়ার পথে আপনাকে কোনো দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।

কোথায় থাকবেন:

চট্টগ্রামে বিভিন্ন মানের অনেকগুলো হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে থেকে আপনি আপনার পছন্দেরটি বেছে নিতে পারেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: চিংড়ি ঝর্ণার পথে

মেঘালয়ে মেঘবিলাস (উমক্রেম এবং বপহিল ঝর্ণা)