লাকমাছড়ার শীতল জলধারার স্নিগ্ধ পরশ

দু’পাশে পাহাড়ের সারি, মাঝে গিরিখাত। আর গিরিখাতের উপরে দুই পাহাড়ের সংযোগ হিসেবে একটা ঝুলন্ত ব্রিজ। ব্রিজের ওপাশ থেকে গিরিখাত দিয়ে জলপ্রপাতের পানি বয়ে চলেছে। স্রোত সেই জলধারাকে টেনে নিয়ে আসছে আমার দিকেই। আর আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি কিছু পাথরের উপর। পায়ের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড় পেরিয়ে আসা সেই জলরাশি।

লাকমাছড়া। সোর্স: লেখিকা

কী? ভাবছেন এটা অবশ্যই সিলেট। জাফলং কিংবা বিছানাকান্দির কথা বলছি। বড়জোর পান্থুমাই অথবা সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের কথা বলছি। তাই না? এরকম একটা দৃশ্য সিলেট ছাড়া আর কোথাও হতেই পারে না।

ভাবনার লাগামটা একটু টেনে ধরুন! এটা মোটেও সিলেটের কোনো জায়গা নয়। জায়গাটা হলো সুনামগঞ্জের ট্যাকেরঘাট উপজেলার লাকমাছড়ায়।

প্রাচীন সিলেট তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। এগুলো হচ্ছে গৌড়, লাউড় আর জয়ন্তিয়া। ধারণা করা হয়, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল সেই লাউড় রাজ্য। যার চিহ্ন পুরো এলাকা জুড়ে বিদ্যমান। যদিও দিনে দিনে লাউড় রাজ্যের দুর্গ ও প্রাচীর নানাভাবে ধ্বংস হতে চলেছে।

অনিন্দ্য সৌন্দর্য।  সোর্স: শাওন

ট্যাকেরঘাটের খুব কাছেই লাকমাছড়া। মোটরবাইক ঠিক করা হয়েছে এখানকার ভ্রমণ স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য। ট্যাকেরঘাট থেকে পাঁচ মিনিটে বাইকাররা আমাদের নিয়ে এলো লাকমাছড়ায়। জায়গাটা দেখে চমকে গেলাম। জাফলং আর বিছানাকান্দির সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে জায়গাটা। তবে এখনো খুব বেশি লোক এখানে যায়নি, তাই পরিবেশ খুব নির্মল।

আমরা যখন গিয়েছি, তখন পর্যটকদের মধ্যে কেবল আমাদের গ্রুপই ছিল। আর ছিল চুনাপাথর আর কয়লা সংগ্রহকারী শ্রমিক। এ যেন আরেক সৌন্দর্যের আধার। কোলাহল নেই, মানুষের ভিড় নেই, ময়লা আবর্জনা নেই। ছড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি মুগ্ধ চাহনি নিয়ে।

এখানে মেঘালয় পর্বতমালা থেকে প্রবাহিত ঝর্ণা ধারার পানি নেমে ছড়া হয়ে নাম হয়েছে লাকমাছড়া। বর্ষাকাল হলেও খুব বেশি পানি প্রবাহিত হচ্ছে না। সম্ভবত বৃষ্টি হলে পানি বাড়ে।

শ্রমিকরা মাছ ধরা ত্রিকোণ জাল গড়িয়ে কয়লা তুলছে। সোর্স: লেখিকা

বিশাল বিশাল সব গোলাকার পাথর পড়ে আছে পুরো এলাকা জুড়ে। এখান থেকে দৃষ্টি চলে যায় অনেক দূর। মেঘালয় পর্বতের সারি। ধাপে ধাপে নেমে আসা পাহাড়। সেই সাথে পাহাড়ের কোল জুড়ে সফেদ ঝর্ণা। এখানে একটা জলাধার তৈরি হয়েছে। নামটা জানা হয়নি। তবে ছড়ার বিপরীতে, আমাদের সীমানায় প্রবাহিত জলপ্রপাতের উপর একটা ইট সিমেন্টের ব্রিজ আছে। দুটো ভিউ দুই রকমের সুন্দর।

পাহাড়ের গায়ে কতগুলো অদ্ভুত সুন্দর ঘরবাড়ি। পাহাড় কেটে বানানো রাস্তায় গাড়ি চলছে অনায়াসে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়ের গাছপালা ভেদ করে গাড়িগুলো চলছে।

বালির স্তুপ। সোর্স: লেখিকা

হাঁটতে গিয়ে বালি ঢুকে যাচ্ছে স্যান্ডেলের আনাচে কানাচে। তাই স্যান্ডেল শুদ্ধই নেমে পড়লাম পানিতে। আহ! কী শীতল জল! ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি গা ভিজাই। ইভানার মনেও সম্ভবত একই ইচ্ছে জাগছে। ও বললো, ‘কাল সকালে এখানে চলে আসবো। তারপর শরীর ভিজিয়ে শুয়ে থাকবো।’

ওর কথা শুনেই মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। কল্পনাতেই যেন স্বর্গীয় অনুভূতি পাচ্ছিলাম। চমৎকার একটা ব্যাপার হবে।

কয়লা। সোর্স: লেখিকা

পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি ছড়ার মুখের দিকে। শ্রমিকরা মাছ ধরা ত্রিকোণ জাল গড়িয়ে কয়লা তুলছে। বিছানাকান্দি আর জাফলংয়ে পাথর সংগ্রহ করা হয় বলে, আমি ভেবেছিলাম, এখানটাতেও পাথর সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা গেল বস্তাগুলো কালো কয়লায় ভর্তি।

জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম, এই কয়লা প্রতি টন আট হাজার টাকা করে বিক্রি করে কয়লা শ্রমিকরা। অথচ শহরে এই কয়লার টনই ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। শ্রমিকদের ন্যায্য দাম দেওয়া হয় না- আক্ষেপটা তাই তাদের গলায় ঝরে পড়ছিলো।

এত ভালো লাগছিল জায়গাটা, সকালে আসবো ভেবে রাখার পরেও আরোও কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আমাদের ভাড়া করা বাইকাররা হর্ন দিচ্ছে বার বার। তাই ফিরে যেতেই হলো। বাইকের কাছে যেতেই তারা আমাদেরকে বলতে শুরু করলো যে – একটা জায়গায় এতক্ষণ সময় থাকলে তো হবে না। একটা বিকেল কি আমরা পুরোটাই শেষ করে ফেলবো? তাহলে তো তাদের পেটে ভাত পড়বে না।

ইভানা সাথে সাথেই প্রতিবাদ করে বললো, ‘মামা, আমরা আমাদের মতো করেই ঘুরবো। এখন আপনি যদি বলেন, এক জায়গায় পাঁচ মিনিটের বেশি থাকতে পারবো না, তাহলে এখনই বলে দেন। আপনাদের সাথে লেনদেন শেষ করে দিই। কারণ এত অল্প সময় ঘুরে আমাদের পোষাবে না।’

এর পরে লোকটা কিছুক্ষণ গজগজ করলেও আর কিছু বললো না। বাইক ভাড়া করে নেওয়ার সময় এসব নিয়ে আলোচনা করে নেওয়াই ভালো। আর হ্যাঁ, লাকমাছড়া দেখতে হলে অবশ্যই বর্ষাকালে যাওয়া উচিৎ।

স্বচ্ছ জল। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা সুনামগঞ্জ সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫৫০ টাকা করে। যাওয়া আসা মামুন পরিবহনে করলে, যাওয়ার সময় ভাড়া পড়বে ৪৫০-৫০০ টাকা, আসার সময় ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০০-৪৫০ টাকা। সুনামগঞ্জ থেকে বাইক বা লেগুনায় তাহিরপুর আসতে হবে। ভাড়া পড়বে ৮০ টাকা।

ট্রলার ভাড়া করে টাঙ্গুয়ার হাওড় ঘুরে ট্যাকেরঘাট। ভাড়া ট্রলারের আকারের উপর নির্ভর করবে। ট্যাকেরঘাট থেকে হেঁটেই লাকমাছড়া যাওয়া যাবে। তবে আমরা একই সাথে কয়েকটা জায়গা ঘুরবো বলে, মোটরবাইক ভাড়া করেছিলাম। বাইকপ্রতি ২৫০ টাকা ভাড়া। ট্যাকেরঘাটেই বাইক পাওয়া যায়।

কয়েকজন মাঝি, লেগুনা ড্রাইভার এবং বাইক ড্রাইভারের নাম আর ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি।

লোকমান মাঝি (সোনালি পরিবহন)
মোবাইল: 01736447984
তার ট্রলারটা ৭-৮ জনের জন্য

পরাণ মাঝি
মোবাইল: 01718168314
এর ট্রলার ২০ জনের, মোটামুটি বড় সাইজের

বনি ইয়ামিন (তাহিরপুর এর লেগুনা ড্রাইভার)
মোবাইল: 01997699824

আকতাস (টেকেরঘাট এর বাইক ড্রাইভার)
মোবাইল: 01761214673

কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই সুন্দর।  সোর্স: লেখিকা

সতর্কতা:
পাহাড় কিংবা ঝর্ণা- যেখানেই যাই না কেন, সব জায়গাতেই দেখেছি প্রচুর অপচনশীল বস্তু যেখানে সেখানে পড়ে আছে। লোকে ঝর্ণার পানিতে গোসল করতে গিয়ে শ্যাম্পু ব্যবহার করে, সেই শ্যাম্পু-সাবানের প্যাকেট সেখানেই ফেলে আসে।

এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। যে কোনো পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

ফিচার ইমেজ: শাওন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গাজীপুরের ভাওয়ালে রাজশ্মশানেশ্বরীর নকশাকাটা আলপনা

এক নজরে একটি জেলা: পাবনার জমিদার বাড়িসমূহ