ফিজির সমুদ্রের মাঝে ভাসমান রেস্তোরাঁ ক্লাউড নাইন

আক্ষরিক অর্থেই সমুদ্রের মাঝে বন্দর থেকে ৯ মাইল দূরে এ রেঁস্তোরা- ছবি cloud9.com.fj

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র ফিজি। ৩৩০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এ দেশটির মাত্র ১১০টি দ্বীপে জনবসতি আছে। আসলে দুটিমাত্র দ্বীপেই ৮৯ ভাগ জনগণ বসবাস করে। এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর সমুদ্র সৈকতগুলো। প্রশান্ত মহাসাগরের এ সৌন্দর্য দেখতে সারা পৃথিবী থেকে ছুটে আসে পর্যটকরা। নীল পানিতে স্নোরকেলিং, সার্ফিং, স্কুবা ডাইভিং বা সমুদ্র তীরে অলস সময় কাটানোর জন্যই আসে অধিকাংশ পর্যটক।
এমনই একজন পর্যটক ছিলেন ব্যারেল ওয়াচেল। নাবিক ওয়াসেলের শখ সার্ফিং। বন্ধুদের নিয়ে সপ্তাহখানেকের জন্য সার্ফিং করতেই সাত বছর আগে ওয়াচেল এসেছিলেন ফিজিতে। সার্ফিং করতে নেমে তিনি দেখলেন ফিজির সার্ফিংয়ের জায়গাগুলো বেশ দূরে দূরে, আবার বোট ছাড়া সব জায়গায় যাওয়াও যায় না। চিন্তা করছিলেন একটা সমুদ্রের মধ্যেই একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ করতে পারলে এ সমস্যার সমাধান করা যেত।

সমুদ্রে মধ্যে ভাসমান রেস্তোরা ক্লাউড নাইন ছবি cloud9.com.fj

চিন্তু করেই বসে থাকলেন না ওয়াচেল, তার ফিজির বন্ধুকে নিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন উপযুক্ত জায়গার। অবশেষে ফিজির ৯ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে মামানুকা দ্বীপপুঞ্জের রোরো রীফকে বেছে নিলেন তারা। এ জায়গাটা পছন্দ হবার অন্যতম বড় কারণ এটি একটি স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ লেগুনে অবস্থিত। আশেপাশের দ্বীপগুলোর কারণে এখানে পানির গভীরতাও বেশ কম। এছাড়া চারপাশের দ্বীপগুলোর কারণে এ জায়গাটায় ঢেউয়ের পরিমাণও কম, সমুদ্রে ঝড় থেকেও বেশ সুরক্ষা পাওয়া যাবে।
অগভীর পানির লেগুন- ছবি cloud9.com.fj

এবার শুরু হলো নির্মাণ কাজ। ফিজিতে বসবাসরত স্থাপত্যবিদ লিসা ফিলিপ ডিজাইন করে দেন এ অসামান্য স্থাপনার। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত মেহগনি, রেইনট্রি আর পাইনগাছের গুড়ি ব্যবহার করে সমুদ্রের বুকেই তৈরি হয়ে যায় “ক্লাউড নাইন”। দুই তলা এই রেস্তোরাঁটি তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যাতে প্রায় সব জায়গা থেকেই পানিতে ওঠানামা করা যায়। এ ছাড়া সারাদিন শুয়ে-বসে কাটানোর জন্য রয়েছে বড়সড় সোফা। সাধারণ টেবিল চেয়ারও আছে। উপরে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের চেয়ার। রোদ না লাগার জন্য পর্যাপ্ত শেডের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এছাড়া পুরো রেস্তোরাঁটিই একদিনের নোটিশে টাগবোট দিয়ে টেনে নিয়ে আসা যাবে নিরাপদ পোতাশ্রয়ে। ঘূর্ণিঝড়ের আশংকার জন্যই এ ব্যবস্থা। রয়েছে বারও। পুরো রেস্তোরাঁটি চলে সৌর শক্তির মাধ্যমে।
চারপাশটা পুরো স্বর্গীয়- ছবি cloud9.com.fj

রেস্তোরাঁটি তৈরি করতে যতটা না কষ্ট হলো তার চেয়ে বেশি কষ্ট হলো অনুমতি পেতে। ফিজির সরকার ছাড়াও এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ে স্থানীয় আদিবাসীরাও, যাদের জায়গায় থাকবে এই ভাসমান রেস্তোরাঁ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সব ভালোই ভালোই সমাধান হয়। তবে ওয়াচেলকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। নিজের দেশ ছেড়ে চলে এসে দায়িত্ব নিতে হয়েছে ক্লাউড নাইনের। প্রথমে শুধুমাত্র সার্ফারদের কাছেই জনপ্রিয় ছিল এটি। ফিজির বিখ্যাত সার্ফিংয়ের জায়গাগুলোর মধ্যে বিশ্রাম নেয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো জায়গাটিকে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই বদলে যায় এর দৃশ্যপট। শুধু পর্যটক না আসতে থাকে স্থানীয়রাও। এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতেই সেরা ভাসমান রেস্তোরাঁর তালিকা করলেও উঠে আসবে এর নাম।
সারাদিন শুয়ে-বসেই কাটিয়ে দেয়া যায় এখানে ছবি cloud9.com.fj

ফিজির জনপ্রিয় বন্দর পোর্ট দেনেরাউ থেকে প্রতিদিন স্পীড বোট ছেড়ে যায় ক্লাউড নাইনের উদ্দেশ্যে। সমুদ্রপথে ৪৫ মিনিটেই পৌঁছানো যায় ৯ মাইল দূরের এই ছোট্ট স্বর্গে। “এক টুকরো স্বর্গ” এই নামটাই মানুষ এখন ব্যবহার করে এ রেস্তোরাঁকে বোঝানোর জন্য। পৌঁছানোর পর পিৎজা অর্ডার করে দিয়ে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন লেগুনের মধ্যে। ভাড়ায় স্নোরকেলিং সেট পাওয়া যায়, সেটা নিয়ে পানিতে নামলে রঙবেরঙের কোরালের পাশাপাশি দেখা যাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হাজারো প্রজাতির মাছ। স্ফটিক স্বচ্ছ জলে সাঁতার কাটতে কাটতেই প্রস্তুত হয়ে যাবে আপনার পিৎজা। এছাড়া বারে পাওয়া যাবে অনেক ধরনের অ্যালকোহল ও জুস। এছাড়া কাছাকাছি ঘুরে বেড়ানোরও বেশ কয়েকটি জায়গা আছে।
তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু পিজা ছবি cloud9.com.fj

জেট স্কি ভাড়া পাওয়া যায় ক্লাউড নাইনে। সেটা নিয়ে চলে যাওয়া যাবে নিকটবর্তী মদ্রিকি দ্বীপে। এই দ্বীপেই আছে সেই বিখ্যাত গুহা যেখানে টম হ্যাংকস অভিনীত “কাস্ট অ্যাওয়ে” ছবির শ্যুটিং হয়েছিল। এছাড়া প্যারাসেইলিংয়ের ব্যবস্থাও আছে সেখানে। প্যারাসেইলিংয়ে মোট এক ঘণ্টা সময় লাগে যার মধ্যে ১০-১২ মিনিট স্পীডবোটের সাথে প্যারাস্যুট বেঁধে দ্রুত বেগে নিয়ে যাওয়া হয়। মানামুকা দ্বীপপুঞ্জের অনেক সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় প্যারাসেইলিংয়ের সময়। ওয়াচেল কিন্তু সার্ফারদের কথা ভুলেননি। সার্ফিংয়ের সরঞ্জামও ভাড়া পাওয়া যাবে এই রেস্তোরাঁয়। দু’ঘণ্টার সার্ফিংয়ে যাওয়া যাবে বিশ্ববিখ্যাত “ক্লাউডব্রেক” এ। সার্ফিং করেই ঘুরে আসা সম্ভব আশেপাশের কয়েকটি দ্বীপে।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অংশ দেখা যাবে এখানে বসেই ছবি cloud9.com.fj

আরও একটি দিক থেকে ক্লাউড নাইন অনন্য, সেটি হচ্ছে পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা। মামানুকা দ্বীপপুঞ্জের যে জায়গায় ক্লাউড নাইন করা হয়েছে সেটা পরিবেশগত অনেক গুরুত্ব রয়েছে। রেস্তোরাঁটি মামানুকা পরিবেশ সমিতির গর্বিত সদস্য। রেস্তোরাঁ পুরোটাই সৌর শক্তি দিয়ে চলে। এছাড়া “জিরো কার্বন পলিসি” অর্থাৎ কোনো ধরনের কার্বন তৈরি করবে না এ নীতিতে চলে। সারাদিনের যত বর্জ্য জমা হয় অন্তত সতর্কতার সাথে সব সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিদিনের যাবতীয় আবর্জনা সেদিনই ফেরত পাঠানো হয় মূল দ্বীপে। সেখানে পরিবেশগত নিয়ম মেনে নিয়ে যথাযথভাবে সে ময়লা-আবর্জনা ধ্বংস করা হয়। সারাদিনে কোনো ময়লা আবর্জনা যাতে সাগরে না পড়ে সেটাও নিশ্চিত করা হয়।
ভাসমান স্বর্গ ছবি cloud9.com.fj

একটা জিনিস কিন্তু বলা হয়নি। ফিজিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের ”অন এরাইভাল” ভিসা দেয়া হয়। তবে হোটেল বুকিং ও রিটার্ন টিকেট সঙ্গে থাকতে হয়। বাংলাদেশ থেকে ফিজির সরাসরি বিমান নেই। যেতে হলে সিংগাপুর বা মালয়েশিয়া হয়েই যেতে হবে।
ফিচার  ইমেজ:  cloud9.com.fj

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টাঙ্গুয়ার হাওরে বৃষ্টি বিলাস টিজিবির সাথে

ফুল প্রেমীদের জন্য বিশ্বের সুন্দর কয়েকটি বাগানের সন্ধান