দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে ৫টি শহরে এখনো পড়েনি পর্যটকদের পা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্যটনে পুরোদস্তুর দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর অন্যতম। বলতে গেলে এশিয়ার মানুষ ভ্রমণে বেশি আগ্রহী। তাই বিভিন্ন দেশে পর্যটন শিল্পটা এখন অন্যমাত্রায় যাচ্ছে। কিন্তু আপনি কি জানেন, এশিয়ার ভেতরেই তাও আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমাদের খুব কাছেই এমন অনেক শহর আছে যা রূপ-সৌন্দর্যে অনন্যতার দাবী রাখে, কিন্তু পর্যটকদের কাছে অতটা পরিচিত নয়?

চেনা দেশের অচেনা শহরে পর্যটকদের আনাগোনা যেখানে এখনো বাড়েনি পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনা করা উচিত তাদেরই উদ্দেশ্যে। আমাদের আজকের আয়োজন দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার তেমনই কিছু শহর নিয়ে যেগুলো পর্যটকদের ভিড়ে তলিয়ে যায়নি এখনো, ধরে রেখেছে আদি আর নিখাদ সৌন্দর্য। চলুন জেনে নেয়া যাক সেসব অপরিচিত শহর সম্পর্কে।

১. সান্দাকান, মালয়েশিয়া

আমাদের দেশ থেকে খুব কাছের একটি দেশ মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ায় গিয়ে আমরা কুয়ালালামপুর, লাংকাওয়ি এসব শহরে ঘুরে চলে আসি। বেশিরভাগ পর্যটক কখনো সান্দাকানের নাম শোনেননি। এটা সত্য যে প্রথম দেখায় সান্দাকানকে ভালোবেসে ফেলা যায় না, কারণটা একটু পরে বলছি। কিন্তু কয়েক দশক আগের সান্দাকান ছিল এশিয়ার কাঠের বাড়ির সবচেয়ে বড় শহর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিজ বিমানের আঘাতে সান্দাকানের সেই দৃষ্টিনন্দন কাঠের আদল পুড়ে গিয়ে আজকের কংক্রিটে বানানো সান্দাকানের জন্ম দেয়। এখন সান্দাকান দেখতে একটু ঘিঞ্জি মনে হলেও এর বাজারগুলোতে এখনো পাওয়া যায় সেই আদিকালের নিখাদ সামগ্রী আর একদম সস্তায় জিভে জল আনা সামুদ্রিক খাবার।

সান্দাকান, ছবিঃ pgimgs.com

কেন্দ্রীয় শহরের একদম পেছনের পাহাড়গুলোতে খোঁজ করলে পাওয়া যাবে সান্দাকানের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। পাহাড়গুলো শহরের সাথে যুক্ত আছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স্থানের মর্যাদা পাওয়া একটা ওয়াকিং ট্রেইলের মাধ্যমে। বিখ্যাত আমেরিকান লেখক “এগনেস কেইথ” এখানকার পাহাড়গুলোতে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে জাপানিজ শাসনের আগে এবং পরের সান্দাকান নিয়ে তিন তিনটি বই লিখেন।

এখন পাহাড়ের উপর প্রচুর অনন্য জিনিসপত্র আর খাঁঁটি ফিটিংস দিয়ে বানানো হয়েছে বিশাল এক জাদুঘর যার প্রতিটা কোণাই সান্দাকানের ইতিহাস বলে বেড়ায়। পাহাড়ের উপর থেকে সান্দাকানের সূর্যাস্ত দেখাটা অনেকের শখে পরিণত হয়।

সান্দাকান জাদুঘর, ছবিঃ wikimedia.org

সান্দাকান বন্যপ্রাণীর বিচিত্র সংগ্রহ দিয়েও ভরপুর। মূল শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সেপিলক রিহ্যাব সেন্টারে আপনি দেখা পাবেন ওরাংওটাংয়ের। আরো পাবেন বর্নিয়ান সূর্য-ভালুক নামে পরিচিত ভালুকের, বানরের অভয়ারণ্য, পিগমি হাতির মাইগ্রেশন সেন্টার আর প্রচুর কুমিরের জলাশয়। এত কিছু দেখে আপনার মোটেই মনে হবে না সান্দাকান দেখার মতো জায়গা না।

২. নান, থাইল্যান্ড

উত্তরীয় থাইল্যান্ডের অল্প পরিচিত শহরগুলোর মধ্যে নান অন্যতম। চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে চিয়াং ক্ল্যাং নামে পরিচিত এই নগরী পুরো বিশ্বের সাথে বলতে গেলে যোগাযোগহীন ছিল। পুরো দুনিয়াই ভুলে গিয়েছিল চিয়াং ক্ল্যাং নামক থাইল্যান্ডের কোনো নগরী আছে! নান ছিল লান না থাইয়ের অংশ যা চিয়াং মাই (নতুন শহর) আর চিয়াং থং (সোনালী শহর) এর মধ্যবর্তী বিরতীর জায়গা ছিল যা বর্তমানে লুয়াং প্রাবং নামে পরিচিত।

নান নগরী ভৌগলিক অবস্থান আর রুপ-সৌন্দর্যে অনেকটা লাউস শহরের মতো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে বার্মিজ আর্মি দ্বারা ঘটে যাওয়া আক্রমণে নগরীটি বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

নান নগরী, ছবিঃ pinimg.com

নান নগরীর মূল আকর্ষণ এর অনিন্দ্যসুন্দর কারুকাজে বানানো মন্দিরগুলো, বিশেষ করে এখানকার বিখ্যাত মন্দির “ওয়াট ফুমিন”। থাই স্থাপত্যবিদ লুইসের সেরা কাজগুলোর মধ্যে ওয়াট ফুমিন একটি যা নান নগরীর ইতিহাস নিয়ে কথা বলে এর কারুকাজের মাধ্যমে।

তবে নান নগরীর সৌন্দর্য বুঝতে হলে একটা গাড়ি ভাড়া করে চলে যেতে হবে এর গ্রামের দিকগুলোতে, হাইক করতে হবে এখানকার “থাম ফা তুপ” ফরেস্ট পার্কে অথবা ৫০ কিলোমিটার দূরের চুনাপাথরে বানানো পিলারে সজ্জিত “সাও দিন না নয়” এ ।

সাও দিন না নয়, ছবিঃ thaismile.jp

শহরে ফেরার পথে থেমে যান “নান রিভারসাইড গ্যালারি”তে। দ্বিতল এই ভবনটি থাইল্যান্ডের অভূতপূর্ব চারুশিল্পের অনন্য উৎপত্তিস্থান। এর সাথে একটি ক্যাফেও আছে যা আপনার নান নগরী ভ্রমণকে করবে পরিপূর্ণ।

৩. দাওয়েই, মিয়ানমার

মিয়ানমারের দক্ষিণে অবস্থিত তানিন্থারয়ির রাজধানী দাওয়েই থাইল্যান্ডের আন্দামান সাগরের সাথে একই সমুদ্র ভাগাভাগি করে। কিন্তু আন্দামানের মতো এ শহর অত পর্যটকে ঘেরা নয়, খুব শান্ত আর মিয়ানমানের সবচেয়ে পরিষ্কার শহরগুলোর মধ্যে একটি এই দাওয়েই শহর।

দাওয়েই, ছবিঃ southernmyanmarplus.com

দাওয়েই শহরের মূল আকর্ষণ হলো এর সমুদ্র সৈকতগুলো যা এখনো পর্যটনের করাল গ্রাসে নষ্ট হয়ে যায়নি। মংমাকান হলো দাওয়েই শহরের সবচেয়ে কাছের সমুদ্র সৈকত যা স্থানীয়দের বেশ পছন্দের। সেখানে ইদানিং পর্যটনের জন্য কিছু স্থাপনা গড়ে উঠছে।

এটা বাদে এখানকার মসকস দ্বীপ যা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এখনো পর্যটকদের ভিড়ে জর্জরিত হয়নি। এখানে আপনি পেনিনসুলার সমুদ্র সৈকত দিয়ে মোটরবাইকে ঘুরতে পারেন আর চলে যেতে পারেন তানিন্থারয়ির ন্যাশনাল পার্কে রেইনফরেস্ট দেখতে।

৪. দাভাও, ফিলিপাইন

দাভাও ফিলিপাইনের আলোচিত প্রেসিডেন্ট দুতার্তের জন্মভূমি। ফিলিপাইনের সর্ব দক্ষিণের দ্বীপ মিন্দানাওয়ে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা দাভাও। এখানকার অতিথিপরায়ণ স্থানীয় মানুষজন আর বেশ কয়েকটি দেখার মতো জায়গা দ্বীপটিকে করেছে অনন্যতায় ভরপুর।

স্লিপিং ডাইনোসর, ছবিঃ blogspot.com

এখানকার মূল আকর্ষণের মধ্যে আছে বারাঙ্গায় বাডাস লুক আউট পয়েন্ট যেখান থেকে দেখা মেলে ফিলিপাইনের সবচেয়ে সুন্দরভাবে গঠন প্রাপ্ত দ্বীপ “স্লিপিং ডাইনোসর” এর। আরো উচ্চতা এবং বন্যপ্রানীর সন্ধানে আপনি যেতে পারেন ১,৬২০ মিটার উঁচু ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত মাউন্ট হেমিগুইতানে।

বেশ ভালো হাইকিংয়ের সুবিধে আছে মাউন্ট গুইতানে যাওয়ার। যদি আপনার লক্ষ্য হয় ফিলিপাইনের সমুদ্র সৈকত তবে দাভাও ওরিয়েন্টাল থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে পুজাদা দ্বীপে চলে যান, যেখানে যেতে মাটি জেলা থেকে নৌকায় করে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট।

মাউন্ট হেমিগুইতান, ছবিঃ wikimedia.org

ভুলে যাবেন না ফিলিপাইনের মানুষজন খুব উৎসবমুখর। দাভাও এর সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসবগুলো হলো “সামার ফ্রলিক”, “কাদায়াওয়ান ফেস্টিভাল” ইত্যাদি।

৫. বান্ডা নেইরা, ইন্দোনেশিয়া

গুনুং আপি নামক আগ্নেয়গিরির ছত্রছায়ায় ঘেরা ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম দুর্গম দ্বীপপুঞ্জ মালুকুর একটি দ্বীপ বান্ডা নেইরা। বান্ডা নেইরাতে আসতে যেমন অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় তেমনি এর মোহনীয় সৌন্দর্য দেখে এখান থেকে যেতেও খুব কষ্ট হয়।

ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভেতর বান্ডা নেইরা এখানকার নাটমেগ আর মেইস শহরের প্রধান ব্যবসায়ীক কেন্দ্র। এখানকার মাইরিস্টিকা গাছ থেকে যে মশলা তৈরী হয় তাই এখানকার বিখ্যাত রপ্তানিকৃত পণ্য।

বান্ডা নেইরা, ছবিঃ cruisemapper.com

শান্তিপ্রিয় ভ্রমণকারীরা এখানে আসেন চমৎকার জনকোলাহল মুক্ত সৈকতগুলোতে ডাইভিং, স্নোরকেলিংয়ের মতো দারুণ সব কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে। বান্ডা নেইরাতে আসলে মনে হবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একদম কিনারায় চলে এসেছেন আপনি। অদ্ভুত সুন্দর সেই অভিজ্ঞতা কোনো ভাষাতেই যে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ভ্রমণ হোক সুন্দর আর প্রাঞ্জল।

ফিচার ইমেজ- roughguides.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মৃত্যুর জন্য যে শহরে ভিড় জমে মানুষের!

ইতালিতে যাওয়ার জন্য বছরের সেরা সময়