চোখ মেলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা!

শেষ বিকেলের খাবারটাই যে রাতের আহার হবে সেটা কেউই ভাবিনি! কারণ শেষ বিকেলে খেয়ে-দেয়ে দেশীয় স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী বেড়াতে বের হলাম যে যার মতো। সবাই ফিরবে যার-যার মতো রাতের খাবার খেয়ে, নির্ধারিত সাময়িক আবাসে। কিন্তু আগের পুরো রাত আর সারাদিনের জার্নির ক্লান্তি একাকার হয়ে আমরা আত্নসমর্পণ করলাম বিশ্রাম আর বিছানার কাছে। 

১৫-২০ মিনিটের মধ্যে সবাই ফিরে এসেছিলাম নিজেদের আবাসে! এত বেশি উঁচু-নিচু পথে এতটা আয়েশ করে আর উপভোগ করা যাচ্ছে না বলে। তার চেয়েও বড় কথা হলো, সকল দোকান-পাট-বাজার-রেস্তোরাঁ-মল সব একে-একে তাদের ঝাঁপ ফেলে আর শেকল টেনে তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল! কিছু বুঝে ওঠার আগেই!

তাই নিজেদের নিয়মিত ক্ষুধার কথা ভেবেই আগাম কিনে নিয়েছিলাম পাউরুটি আর জিলাপি! কারণ এ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই সেই ঢের আর সেই সাথে একটি শীত তাড়ানোর ভিন্ন স্বাদের কিছু পানীয়, সে বললেও আর না বললেও!

রুমে ফিরে খাবারগুলো আবার চালান করে দেয়া হলো স্বদেশী গাড়লদের পেটে! কোনো অপেক্ষা ছাড়াই ডাবল কম্বলের নিচে সুড়সুড় করে ঢুকে পড়লাম যে যার মতো সুবিধা করে নিয়ে এবং অচিরেই ঘুম! প্রস্তুতি ছাড়াই, কে কখন ঘুমোলো কেউ জানি না।

হোটেল রুম থেকে কাঞ্চন! ছবিঃ i0.wp.com

অনেক ভারী পর্দার সামান্য ফাঁক গলে আলোহীন প্রত্যূষে ঘুম ভেঙে গেল। ওহ এতো ভোরে ঘুম ভাঙার কী দরকার ছিল? কোথাও বেরোনোর এত বেশী তাড়া নেই। ধীরে-সুস্থে উঠে হেলে-দুলে বের হব, তারপর আজকের প্ল্যান কোথায় ও কীভাবে যাব। কিন্তু এত সকালে কী করি? আবার ডুব দিলাম কম্বলের নিচে। কিন্তু আগের রাতে যেহেতু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছি তাই ঘুম আর কিছুতেই আসছিল না।

এপাশ-ওপাশ আর উসখুস করে অন্যের ঘুম না ভাঙিয়ে বরং উঠে একটু মেঘ আর কুয়াশার লুকোচুরি দেখি! আর যদি সেই সাথে দেখা মেলে এক টুকরো পাহাড়ের তো কথাই নেই আর! পাহাড়, সে তো আমার প্রেম! তাকে যখন-যেখানে-যেভাবেই পাই না কেন, আমি আপ্লুত-বিমুগ্ধ-বিলুপ্ত ওর মাঝে!

সেই ভেবে খুব সন্তর্পণে অনেক ভারী পর্দা সরিয়ে রুমের সাথে লাগোয়া করিডোরের ছিটকানি খুললাম, ওহ যেন ছিটকে ফেলে দিতে চাইল কনকনে ঠাণ্ডা এক ঝলক দমকা হাওয়া! সেই সাথে মুখ ভিজিয়ে দিল না চাইতেই, বেহায়া কুয়াশা! তবুও শীতের চাদর গায়ে জড়িয়ে বের হলাম। আমার বামপাশে ঘন সবুজ অরণ্যে বেষ্টিত থরেথরে সিঁড়ির মতো সাজানো পাহাড়, আমি ওদিকেই তাকিয়ে ছিলাম মুগ্ধ হয়ে, অন্য দিকে তাকাবার ইচ্ছেই যে হয়নি আর!

রঙিন সাঁজে। ছবিঃ i2.wp.com

আবারো বাতাস, আবারো ধেয়ে আসা কুয়াশা, ভিজে যাওয়া মুখ! কুয়াশার ঢেউয়ে একটু মুখ ঘোরাতেই আমার আরও ডানে কাছের জানালায় চোখ পড়তেই যেন ঝলসে গেলাম! সোনালি আভায় আর হঠাৎ চোখে পড়া অর্কর ছটায়! এবার বাধ্য হয়ে পাহাড়কে উপেক্ষা করে ডানে তাকালাম। বেশ দূরে অর্কর আভায় কমলা-সোনালি-রুপালি-গোলাপি-ক্ষীণ লাল-আর কিছুটা হলুদের ছটা দেখতে পেলাম!

এই সময়টার সঠিক অনুভূতিটা কী ছিল বা হয়ে থাকে সেটা আসলে বোঝানোর নয়, ঠিক বোঝারও নয়! এই রকম মনোমুগ্ধকর সম্মোহনে মানুষ আসলে বোবা হয়ে যায় বোধহয়! অথবা হয়ে যায় অনুভূতিহীন-বাকরুদ্ধ-অসাড়! কারণ তখন তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখা ছাড়া পৃথিবীর আর সব কিছুই তুচ্ছ আর অমূলক অথবা ভিত্তিহীন বাস্তবতা! তখন ওই সম্মোহনই একমাত্র প্রার্থনা-প্রাপ্তি বা প্রবঞ্চনা!

এভাবে কয়েক মিনিট নির্বাক হয়ে সেই সম্মোহন উপভোগ করার পর, সূর্য আর একটু আলো ছড়ালে দূরের সেই নানান রঙের মেলা, শ্বেতশুভ্র বরফে আচ্ছাদিত কাঞ্চনজঙ্ঘার লাজুক ঘোমটা সরাতে লাগলো, একটু-একটু করে ভেঙে লজ্জা-শরম ও গাল ভরা অভিমান!

পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে, কাঞ্চনজঙ্ঘা! ছবিঃ eenaduindia.com

কারণ? ওটা যে কাঞ্চনজঙ্ঘা সেটা যে বুঝতেই পারিনি তখন!

এরপর আর নয়, সেটা বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে যাবে সেই ভয়ে অন্যদেরও ডেকে তুললাম, ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে আমার অবিরাম ক্যামেরার ক্লিক-ক্লিক-ক্লিক! যেখানে-যেমন ওঠে উঠুক, পরে দেখেশুনে বাছাই করবো! আগে তো তুলে নেই যত খুশি তত!

এবার অন্যরাও সরব হলো, সব ভুলে, কেউ-কেউ হাড় কাঁপানো শীতও উপেক্ষা করে, তবে বঞ্চিত হয়েছিল সেদিনকার মত, সেই প্রথম দেখা রঙবেরঙের বরফ-আলোর সম্মিলিত সম্মোহন থেকে! তবে এর পরের দিন থেকে একটি দিনের জন্যও নয়, কেউ-ই।

কারণ আমাদের সামনেই সব সময়, সারাক্ষণ দেখতে পাই, রুমের পর্দা সরালেই বা করিডোরে দাঁড়ালেই, হেঁটে-বসে বা শুয়ে, যখন-যেভাবে-যেমন আর যত খুশি।

দার্জিলিং জায়গাটাই এমন যে, যদি আকাশ পরিষ্কার মেঘ মুক্ত থাকে, তবে বরফে মোড়ানো পাহাড় চূড়া, বিশেষ করে অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখে পড়বে দার্জিলিংয়ের যে কোনো জায়গা থেকেই। হোক সেটা আপনার রুম, রুমের বেলকোনি, খোলা কোনো পথ, পাহাড়ের বাঁক, হোটেল, মোটেল, স্কুল, কলেজ, অরণ্য বা চা বাগান, সব জায়গা থেকেই আপনি দেখতে পাবেন ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলে যাওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘার অপার্থিব রূপ।

যেখানে সেখানে উঁকি দেয় সে! ছবিঃ i1.wp.com

কখনো সাদা, কখনো, গোলাপি, কখনো সোনালী, কখনো লাল আর কখনো হলুদ। এছাড়া সকাল আর সন্ধ্যায় তো সে সেজে থাকে নানা রঙে, বর্ণীল সাজে। সুতরাং এমন রূপ দেখতে চাইলে, চোখে মেলেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পেতে চাইলে ঘুরে আসুন দার্জিলিং। বছরের যে কোনো সময়, তবে শীত বা এপ্রিল-মে হলো দার্জিলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আসল সময়। কারণ এই সময়কালে আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার থাকে সাধারণত।

সে এক অপার্থিবতা, চোখ মেললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা..!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুবলহাটি রাজবাড়ি: একটি প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে ভিন্ন অনুভূতি

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট মারমেইড বিচ রিসোর্ট