বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ির হাল হকিকত

আমার স্কুলে হাই স্কুলের টিচারদের মধ্যে আমরা দুইজন আছি যারা ঘুরতে পছন্দ করে। আমি এবং আমার কলিগ রানা স্যার। সুযোগ পেলেই ইনিও বেরিয়ে পড়েন ঘুরে বেড়ানোর জন্য। এবারে ফকির লালন সাঁইয়ের মৃত্যু দিবসে পুজোর জন্য স্কুল বন্ধ ছিল। রানা স্যার সুযোগটা কাজে লাগাতে ছাড়লেন না। তিনি চট করে চলে গেলেন লালনের আখড়াবাড়ির মিলনমেলায়। ফিরে এসে বিস্তারিত বিবরণ দিলেন তার অভিজ্ঞতার। তার আগে ফকির লালন সাঁইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।

লালনকে ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন শাহ, মহাত্মা লালন ইত্যাদি অনেক নামেই ভক্তরা ডাকে। তিনি মানবতাবাদী সাধক ছিলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে স্থান দিয়েছিলেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রত্যেক মানুষের মাঝেই একটা মনের মানুষ বাস করে। দেহের ভেতরেই অচিন পাখি বসবাস করে। সেই অচিন পাখি সবার কাছে ধরা দেয় না। তার সন্ধান মেলে পার্থিব দেহ সাধনার মাধ্যমে। যখন মানুষ দেহোত্তর জগতে পৌঁছাতে পারে। বাউল তত্ত্বে ‘নির্বাণ’ বা ‘মোক্ষ’ বা ‘মহামুক্তি’ লাভ বলতে এটাকেই বোঝায়।

লালন শাহ এর মাজার। সোর্স: রানা

কারো মতে, আনুমানিক ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হারিশপুর গ্রামে লালন সাঁইয়ের জন্ম হয়। আবার কেউ বলেন, লালনের জন্ম কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে।

আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক লালনের রচিত ২৮৮টি গানের মাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।। লালন কখনো নিজের ধর্ম পরিচয় কারও কাছে প্রকাশ করেননি। লালনের অসাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধিতা ইত্যাদির কারণে তাকে শিকার হতে হয়েছিল ধর্মান্ধ এবং মৌলবাদী হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘৃণা, বঞ্চনা এবং আক্রমণের।

লালন শাহ এর ভাস্কর্য।  সোর্স: রানা

কী ভাবছেন? লালনের দর্শন শুধু বাঙালিদের মধ্যেই প্রভাব বিস্তার করেছিল? মোটেও না! লালনে মজে ছিলেন মার্কিন কবি এলেন গিন্সবার্গও। তিনি তাঁর রচনাবলীতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরণ করেছেন। এমনকি ‘আফটার লালন’ নামে একটি কবিতাও আছে কবি এলেন গিন্সবার্গের।

শুধু লালনের সময়েই নয়, লালনের মৃত্যুর পর একশ সাতাশ বছর কেটে গেলেও এখনো লালন ভক্তদের লালনমোহ কাটেনি। প্রতি বছরই কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর ছেউড়িয়ায় লালন ফকিরের আঁখড়া বাড়িটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। দেশের ভিতর থেকে তো বটেই, দেশের বাইরে থেকেও অনেকে আসে আখড়াবাড়িতে। রানা স্যারদের সাথেই ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ফোক ও লালনের উপর পিএইচডি করা একজন এসেছিল লালন মাজারে।

তিনি স্যারদের সাথে অনেক কিছু বলেছেন লালন সম্পর্কে। লালনের অনুরাগীদের রাগ, ক্রোধ, হিংসা থাকতে পারবে না। লালনের মতে, আত্মা মানে সময়। দেহের মধ্যে আত্মা দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ‘মন আমার দেহ গড়ি সন্ধান করি… ‘ গানটা থেকে ওরকমটাই বোঝা যায়। তিনি আরোও বলেছেন, লালনের গানের পাণ্ডুলিপি নাকি ভারতে চলে গিয়েছিল কোনোভাবে। তখন তারা কিছুটা বদলে দিয়েছে সেসব গানের কথা। নাস্তিকতা ঢুকিয়ে দিয়েছে।

প্রদর্শনী।  সোর্স: রানা

অনেকে ভাবে, লালনের মাজারে গেলে মন ও প্রাণে শান্তি পাওয়া যায় এবং আধ্যাত্মিক জগৎ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এখানে সাধু, ভক্ত ও লালন অনুরাগীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে সাঁইজির স্মরণে বাউল গান, সাধন, ভজনসহ আরো নানা আয়োজনে মশগুল থাকে। সব আয়োজনের পর পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে সাধুদের মূল অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

রানা স্যার নিজে দেখেছেন, লালনের মাজারে লোকজন সেজদায় পড়ে থাকে। লালনের নিজস্ব ধর্মের প্রতি ভালোবাসা থেকেই হোক, কিংবা আধ্যাত্মিকতা লাভ করার আশাতেই হোক। আবার অনেকেই যায়, এই সাধকের গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে। আমিও লালনের গানের ভক্ত। ‘মিলন হবে কত দিনে’ গানটা যে কত হাজারবার শুনেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। গভীর নিস্তব্ধ রাতে গানটা যখন শুনি, গানের কথাগুলো সত্যিই খুব অপার্থিব লাগে আমার কাছে। এই মোহ থেকেই লালনের আখড়ায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। তবে রানা স্যারের অভিজ্ঞতার কথা শুনে দমে গিয়েছি।

বীজ মেলা। সোর্স: রানা

লালনের আখড়ার পরিবেশ খুবই নোংরা। আখড়ায় গাঁজার গাছ আছে। প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি করছে। কল্কি দিয়ে গাঁজা টানে লোকে। এত কড়া গাঁজা যে গন্ধেই চোখ লাল হয়ে যায়। এক জায়গায় ড্রামে ফেন্সিডিলের বোতল চুবিয়ে রেখেছে। আখড়ায় পুলিশ থাকলেও এসবে বাঁধা দেয় না লালন মাজারে। সাধনার সময়ে গাঁজা টানলে নাকি দোষ নেই। আবার গাঁজাকে গাঁজা বলা যাবে না, বলতে হবে সিদ্ধি। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আখড়াবাড়ির মূল প্রবেশদ্বারে লেখা রয়েছে, “সকল প্রকার ধুমপান নিষিদ্ধ।”
প্রবেশদ্বারের উপরে বড়সড় সাইনবোর্ডে লেখা,
“নবপ্রাণ আন্দোলন”।

লালন আখড়ায় বীজ মেলা হয়। লালন গাছ লাগাতেন। তাই এই বীজ মেলার আয়োজন। আবার লালন শাহ ও বাঙলার ফকিরি উত্তরাধিকারের বিরলপ্রায় আলোকচিত্র, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, শিল্পকর্ম, স্বরলিপি, বইপথ ও পত্রিকার প্রদর্শনীও হয়।

আখড়াবাড়ির প্রবেশদ্বার।  সোর্স: রানা

রানা স্যার আর তার সহভ্রমণকারী আখড়ায় গিয়ে লালনের বেশভূষা ধারণ করে ফেললেন। পাঞ্জাবি পরেই ছিলেন, মাথায় বাঁধলেন গামছা। একটা মালা কিনে গলায় পরে ফেললেন। মালার দাম পড়লো ৮০ টাকা করে। একতারা বাজানোও শেখা হয়েছে। চট করে একটা একতারাও কিনে ফেললেন ৩০০ দিয়ে। লালনের আখড়ায় এসে যদি একটু সাধুসন্ন্যাসীর মতো বেশভূষা না নেন, তাহলে কী আর ঘুরলেন?

তবে লালনের ওরশগুলোর সময়ে কুষ্টিয়ায় থাকার মতো হোটেল পাওয়া যায় না। ছোট শহর হওয়াতে খুব একটা আবাসিক হোটেল নেইও। সেই সময়ে লোকে লোকারণ্য থাকায় সাধারণ মানের হোটেলগুলোতেও জায়গা পাওয়া যায় না। আর রুম পাওয়া গেলেও ভাড়া চায় দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। রানা স্যারেরা তাই পাশের জেলা পাবনায় চলে গিয়েছিলেন। কুষ্টিয়া থেকে পাবনা যেতে সময় লাগে এক ঘণ্টা।

সাধকের বেশভূষায় রানা স্যার ও তার ভাই। সোর্স: রানা

কীভাবে যাবেন

ঢাকা কল্যাণপুরে কুষ্টিয়া যাবার বাস কাউন্টার আছে। ওখান থেকে দেখে শুনে একটা বাসের টিকেট করুন। এস.বি এর সার্ভিস সবচেয়ে ভালো হবে। বাস সরাসরি কুষ্টিয়া মজমপুর বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যাবে। মজমপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে রিক্সা, ভ্যান অথবা অটোরিক্সায় খুব সহজে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে ছেউরিয়া লালন শাহের আখড়ায় পৌঁছে যাবেন। ভাড়া পড়বে ২৫ থেকে ৩০ টাকা।

এছাড়া ট্রেনেও যাওয়া যাবে। ট্রেনে গেলে পোড়াদহ নেমে কুষ্টিয়া যেতে হবে। লালনের আখড়া কুষ্টিয়া শহর থেকে ২৫ মিনিট দুরত্বে। আর পোড়াদহ থেকে লালনের আখড়ায় যেতে ১ – ১.৫ ঘণ্টা সময় লাগে ইজি বাইকে। ট্রেনের আরো একটা রুট আছে। প্রথমে বাসে আরিচা পর্যন্ত যেতে হবে। তারপর গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে কুষ্টিয়া। এই রুটে যেতে হলে আপনাকে দুপুর ১২টার মধ্যে গোয়ালন্দ পৌঁছাতে হবে। নয়তো ট্রেন মিস করবেন। তবে ট্রেনের চেয়ে বাসেই সুবিধা।

ফিচার ইমেজ: রানা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুর্গম ধুপপানি ঝর্ণা ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

শান্তিনিকেতনের বর্ণিল বাড়ি অথবা ফুলের স্বর্গ