তুক অ/দামতুয়া ঝর্ণায় অভিযানে একদল অভিযাত্রী

মারায়ন তংয়ের চূড়া থেকে সূর্যোদয় দেখে তাঁবু গুটিয়ে এবার নিচে নামার পালা। চূড়ায় উঠতে যত কষ্ট হয়েছিল নামতে ততটা কষ্ট হয়নি। অন্যদিকে সময়ও কম লেগেছে। নামার পথে দাঁড়িয়ে এখানে সেখানে ফটো সেশন চলল কিছুক্ষণ। পাহাড়ের নিচে একটা ছোট ঝিরিতে ঠাণ্ডা জলে গা ভিজিয়ে আলীকদম বাজারের দিকে রওনা হই। আগে থেকেই বাইক বলে রাখা ছিল। সেই বাইকে করেই আমরা রওনা হই।

মারায়ন তংয়ের চূড়া থেকে ক্যাম্পিং করে ফেরার পথে ফটো সেশন চলছে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

আলীকদম বাজারে সকালের নাস্তা সেরে নিয়ে ক্যাম্পিংয়ের জিনিসপত্র এখানেই রেখে যাই। শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত পানি নিয়ে দামতুয়ার উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করি। দুই জন করে এক বাইকে। ১৭ মাইল নামক এক জায়গা থেকে আর্মির অনুমতি নিতে হয়। আমাদের টিম বেশ বড় ছিল এবং সাথে বেশ কয়েকজন মেয়ে থাকায় শুরুতে অনুমতি দিতে চাইছিল না। অনেক কথা কাটাকাটি করার পর শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলে আমাদের।

দু’পাশে নয়ন জুড়ানো দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে যাই। অনুমতির গোলক ধাঁধা থেকে বের হতে গিয়ে বেশ খানিকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। তাই কাঙ্ক্ষিত সময়ের থেকে অনেকটা পরে গিয়ে আমরা পৌঁছাই আদুপাড়ায়। সেখান থেকে গাইড নিয়ে দামতুয়া ঝর্ণার দিকে ট্রেকিং শুরু করি।

দামতুয়া যাওয়ার পথে ট্রেকিংয়ের প্রস্তুতি; ছবি- বিপু বিধান

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে। পুরো পাহাড়ি পথটাকে ঘন সবুজ জঙ্গল ঘিরে রেখেছে। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ আর ঝিরির পানির রিনঝিন শব্দে বিমোহিত করে রাখে সর্বক্ষণ। আরও বেশ কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখা মিলল একটা জুম ঘরের। সেখানেই সবাই মিলে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হয়। যাত্রা বিরতির স্থান হিসেবে জুম ঘরের জুড়ি নেই। জুম ঘরের বিপরীত পাশ থেকে যদি দূরের নাম না জানা ঝর্ণার দেখা মেলে তাহলে তো আর কথাই নেই। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের অবলোকন করতে থাকি এবং খানিকক্ষণ বুক ভরে বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেই। পাহাড়ে হাঁটার কষ্ট নিমেষেই ভুলিয়ে দেয়।

জুমঘর থেকে দেখা নাম না জানা ঝর্না; ছবি- সাইমুন ইসলাম

আদুপাড়া থেকে ঝর্ণায় আসা-যাওয়ায় প্রায় ৭-৮ঘণ্টা সময় লাগে। ঝর্ণায় যাওয়ার পথে আরও বেশ কিছু পাড়া পড়ে। প্রত্যেকটি পাড়ায় অল্প কিছুক্ষণের জন্য যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। চারপাশের স্বর্গীয় দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই বিশাল এক ক্যাসকেডের সামনে। প্রথমে ভেবেছিলাম এটাই বুঝি দামতুয়া ঝর্ণা।

আরেকদল অভিযাত্রী তখন দামতুয়া দেখে ফিরছিলেন। তাদের সাথে কথা বলতেই জানতে পারি যে এটা দামতুয়া না। দামতুয়া ঝর্ণা আরও সামনে। এটা ব্যাঙ ঝিরি। ঝিরি এত সুন্দর হয় তা আমার জানা ছিল না। তাই ঐ অভিযাত্রীদের কথা প্রথমে বিশ্বাস হতে চাইছিল না। সে কারণেই গাইড দাদাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনিও একই কথা বললেন।

অপরূপ ব্যাঙ ঝিরিতে কিছুক্ষণ; ছবি- সাইমুন ইসলাম

বর্ষাকাল আসি আসি করছে। এরই মধ্যে হুট করে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। ব্যাঙ ঝিরি বৃষ্টির পানিতে যেন আরও ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ঝিরির ঠাণ্ডা জলে গা ভিজিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। প্রকৃতির এত কাছাকাছি থাকতে বেশ লাগছিল। ঝিরি থেকে ওঠার ইচ্ছা তখন কারও ছিল না। কিন্তু গাইড দাদার ডাকে উঠতেই হয়।

জুমঘরে বিশ্রাম চলছে; ছবি- বিপু বিধান

ঝিরি থেকে উঠে কাদা মাখা এক খাড়া পাহাড়ি পথ দিয়ে নিচে নামতে থাকে। কানে ভেসে আসছিল দামতুয়া ঝর্ণার জল পতনের মিষ্টি মধুর শব্দ। ঝর্ণার যত কাছে এগিয়ে যাচ্ছি জল পতনের শব্দ আরও প্রকট হয়।

শেষমেশ দামতুয়ায়; ছবি- সাইমুন ইসলাম

চোখের সামনেই প্রকট হয় বিশাল এক ঝর্ণা। এই সেই দামতুয়া বা তুক অ বা লামোনাই ঝর্ণা। মুরং এলাকায় এই ঝর্ণার অবস্থান। তাই তাদের ভাষা অনুসারে নাম ‘তুক অ’। মুরংদের ভাষায় ‘তুক’ অর্থ ‘ব্যাঙ’ আর ‘অ’ অর্থ ‘ঝর্ণা’। মূলত ব্যাঙ ঝিরি থেকে এই ঝর্ণার উৎপত্তি। তাই ঝিরির নামের সাথে এই ঝর্ণার মিল আছে। বিশাল এই ঝর্ণা দেখে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সফেদ সাদা পানি। এর বিশালতার কাছে ধুয়ে মুছে গেল সারাদিনের সব ক্লান্তি।

দামতুয়া ঝর্নায় দাপাদাপি; ছবি- বিপু বিধান

পানিতে ঝাপাঝাপি দাপাদাপি করে এবার ফেরার পালা। আকাশের কোণে ঘন কালো মেঘ জমছে। এরই মধ্যে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে ঝর্ণার পানিও বাড়ছে সমান তালে। শান্ত নীরব ঝিরিগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। যেকোনো সময় পাহাড়ি ঢলের আশংকা করতে করতে পথ চলতে থাকি। যাওয়ার সময় যে ঝিরির পানি স্বচ্ছ পরিষ্কার দেখে গিয়েছি আর ফেরার সময় পাহাড়ি ঢলের কারণে তা ঘোলা হয়ে গিয়েছে। ঝিরির পানির উচ্চতা বেড়েছে বেশ কয়েক ফুট।

আদিবাসী পাড়া; ছবি- সাইমুন ইসলাম

পাহাড়ে ঝুপ করেই সন্ধ্যা নেমে আসে। টর্চ জ্বালিয়ে বাকি পথটুকু পাড়ি দেই ভয় এবং অজানা আশংকার মধ্যে দিয়ে। কেননা রাতে পাহাড়ি ট্রেইলে পথ চলা চাট্টিখানি কথা না। দিনের আলোতে পাহাড়ি পথ চলা যতটা সহজ হয়, রাতের আলোতে সেই পথ আরও বেশি ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে চকরিয়া। জনপ্রতি নন এসি বাস ভাড়া ৭৫০ টাকা। চকরিয়া থেকে আলীকদম জিপ গাড়ি বা চাঁদের গাড়িতে আসতে পারেন। লোকাল ভাড়া জনপ্রতি ৬৫ টাকা। চাইলে রিজার্ভ করে যেতে পারেন।

ঝিরির পানিতে স্নান চলছে; ছবি- বিপু বিধান

থাকা খাওয়া
আলীকদম বাজারে ছোটখাটো খাবার হোটেল আছে। তবে থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই।

অবশ্যই মনে রাখবেন
*ভালো মানের টর্চ লাইট সাথে নিতে ভুলবেন না।
*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
*ঝিরি বা ঝর্ণায় নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে।

***ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোমুখ অভিযান: এটাই গোমুখ? হতেই পারে না…

কাশ্মীরের অনন্ত কষ্ট!