শঙ্কা সাধনার কাশ্মীরের শ্রীনগর ভ্রমণ

শ্রীনগর, সেই বোধ হবার পর থেকেই এই নামটা শুনলেই মনের মধ্যে একটা আতঙ্ক বিরাজ করতো। কারণ পত্রিকায়, টিভিতে, নানাজনের মুখে মুখে আর আজকালকার অনলাইন নিউজে শ্রীনগর মানেই যেন আতঙ্ক আর ভয়ের কোনো নগরী হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে।
কাশ্মীর যাবো শুনে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, শুভাকাঙ্ক্ষীরা পর্যন্ত চোখ-মুখ কুঁচকে তাকিয়ে ছিল, আমরা কি পাগল নাকি এমন একটা অভিব্যক্তি নিয়ে। এমনকি অনেকে তো সামনা-সামনি বলেও বসেছে যে কীভাবে, কী ভেবে আর কোনো সাহসে এই সময়ে কাশ্মীর যাবার মতো দুঃসাহস করছি? শুনে বেশ হাসিই পেল, আরে আমি তো এমনিই দুঃসাহসী জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে, কাশ্মীর যাওয়া এমন আর কি?
তার উপর আমার ঘরের লোকের একটাই চাওয়া ছিল, গেলে এবারই কাশ্মীর নইলে কখনোই নয়! এভাবে বললে আর ফেলি কীভাবে? তাই শেষ পর্যন্ত কাশ্মীরকেই বেছে নিতে হলো, সব রকম পারিপার্শ্বিক পরিকল্পনা বাদ দিয়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম পুরোটা ভ্রমণ ট্রেন আর জীপে করবো, সেভাবেই বাজেট করেছিলাম।

বিমানের জানালা থেকে, ছবিঃ লেখক

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাশ্মীরে বেশী সময় পাওয়া যাবে না ভেবে, কলকাতা আর দিল্লীতে অযথা থেকে হোটেল খরচ না দিয়ে প্রায় পুরোটা যাত্রাই প্লেনে করতে হয়েছিল, কলকাতা থেকে দিল্লী হয়ে শ্রীনগর আর ফেরার সময় প্লেনে করে দিল্লী ফিরে রাজধানী এক্সপ্রেসে কলকাতা।
শেষ পর্যায়ে এসে দুটি টিকেট পরিবর্তন করে প্লেন করাতে খরচটা প্রায় ১৫,০০০ বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেজন্য কাশ্মীরে সময় পেয়েছি পুরো ৮ দিন, যেটা খুব খুব প্রয়োজন ছিল। যাই হোক যে কথা বলছিলাম, শ্রীনগর যেন এক আতঙ্কের নগরী সবার এমন এক মনোভাব দেখেই মনে মনে নিজেদের মতো করে সাহস সঞ্চার করে রওনা হয়েছিলাম সপরিবারে, সাথে আর একটি পরিবার আর দিল্লী গিয়ে আরও দুটি পরিবার একসাথে হবে এমনভাবে পরিকল্পনা করে।
ঢাকা থেকে বাসে করে বেনাপোল হয়ে কলকাতা। কলকাতা থেকে ইনডিগো এয়ারে দিল্লী পৌঁছে গেলাম রাত ১২টায়। আমাদের শ্রীনগরের বিমান পরদিন সকাল ৬:৩০ এ। তাই সে রাতে দিল্লীতে আর কোনো হোটেল না নিয়ে বিমান বন্দরের বাইরে খেয়ে দেয়ে, ভেতরে ঢুকে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন শ্রীনগর যাবার প্লেনের ঘোষণা আসে?
প্লেনের জানালা থেকে প্রথম পাহাড় দেখা! ছবিঃ লেখক

বিশাল এয়ারপোর্টের ঘুমের চেয়ারে গা এলিয়ে দিতেই ঘোষণা এলো শ্রীনগর যাবার এয়ার এশিয়ার বিমানের। বেশ লাল টুকটুকে এয়ার হোস্টেজদের আমন্ত্রণ নিয়ে উঠে পড়লাম লাল টুকটুকে বিমানের একটি জানালার পাশের সিটে।
কিছুক্ষণ পরেই বিমান চলতে শুরু করলো, তবে এবার আর আগের রাতের মতো করে লোকাল বাস আর ভাঙা রাস্তার মতো করে নয়, বেশ জোরে চলে কিছুদূর গিয়েই দিল উড়াল। পাশের সিটের পটিয়ে ফেলা সেই কাশ্মীরিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কত সময় পরে স্নো মাউনটেন দেখা যাবে?
বলেছিল প্রায় এক ঘণ্টা পরে, আর পাহাড়ের উপর দিয়ে প্লেন আরও প্রায় ৩০ মিনিট যাবে, একটু কম বা বেশী। বেশ রোমাঞ্চিত ছিলাম সেই সময়ে, পাশে সেই কাশ্মীরি রূপ, বাইরে ঝকঝকে নীল আকাশে সদ্য উদিত হতে থাকা টকটকে সূর্য, দূরের আকাশে হাজারো রঙের পাগলামি আর বিমানের পাশ দিয়ে অজানায় উড়ে যাওয়া সাদা সাদা মেঘেদের দল দেখে।
বরফ মোড়া, পাহাড় চূড়া! ছবিঃ লেখক

কিন্তু আমার বৌয়ের আর সহ্য হলো না, একা একা সুখের আকাশে ভেসে বেড়ানো, সাদা মেঘেদের সাথে লুকোচুরি খেলা, সামনে অসীম পাহাড়ের সারির জন্য অপেক্ষা আর পাশে কাশ্মীরির সাথে মৃদু আলাপন, আর কিছু সময় পরেই পাহাড়ের সারির ফাঁকে মুখ লুকিয়ে রাখা অনেক সাধনার শ্রীনগরের অপেক্ষায় তাই তার ডাকে উঠে যেতেই হলো তার পাশে।
রোমাঞ্চের অর্ধেক এখানেই শেষ হয়ে গেল, কী ভাবটাই না জমিয়ে ছিলাম সেই কাশ্মীরির সাথে! এমন কি ঈদের দিনের দাওয়াত পর্যন্ত নিয়ে নিয়েছিলাম! সব অংকুরেই বিনাশ করে দিলেন আমার পুত্রের জননী!
মনে কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে তার পাশে বসতেই পাশের জানালায় উঁকি দিতে লাগলো উঁচু উঁচু বরফে মোড়া পাহাড় চূড়ারা। এই প্রথম এত এত উঁচু থেকে পাহাড়ের সারি দেখা, তাও একটি, দুটি নয় শত-শত পাহাড়ের সারি দাড়িয়ে আছে পাশাপাশি। নানান রঙের, নানান ঢঙের আর নানান আকৃতির, ছোট-বড়-মাঝারি যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়, সাদা-সবুজ-কালো পাহাড়ের মেলা।
ঝকঝকে এয়ারপোর্ট, ছবিঃ লেখক

মুগ্ধ চোখে জানালায় তাকিয়ে, ক্যামেরায় অনবরত সাটার চেপে চলেছি, প্লেন থেকে দেখা অপূর্ব সব পাহাড়ের সারি, নদীর আঁকাবাকা পথ, দূরের ছোট ছোট ঘর-বাড়ি, লেক, জলাশয়, সরু-সরু রাস্তা ছোট-ছোট বাঁক, পিপীলিকার মতো করে যানবাহনের ধীর লয়ে ছুটে চলা দেখতে দেখতেই এক সময় ঘোষণা এলো শ্রীনগর আর মাত্র ১৫ মিনিট!
কিছুটা শিহরিত হয়েছিলাম ঘোষণা শুনে। এই সেই শ্রীনগর যার নাম কত শুনেছি, পড়েছি, গল্প শুনেছি, টিভিতে ছবি দেখেছি। আর অল্প কিছুক্ষণ পরেই সাধনার সেই শ্রীনগরে পৌঁছে যাবো আমরা।
প্লেনের গতি কমে আসছে, ধীরে ধীরে প্লেন নিচের দিকে নামছে, পাহাড়গুলো কাছে চলে আসছে, নদীগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে, মেঘেরা প্লেনের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুটে চলেছে, নিচের রাস্তাগুলো পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে আর গাড়িগুলো ওদের ছুটাছুটি, ঘর-বাড়িগুলো রঙিন থেকে বর্ণিল হতে শুরু করেছে, এই পাহাড়ের গা ছুঁয়ে প্লেন এখন পাহাড়ের সাথে সাথে ছুটে চলেছে। হুট করেই যে এক রঙিন ফুলের বাগানে আমাদের প্লেন নামতে শুরু করেছে!
প্লেন থেকে নামছি আর ভেতরে ভেতরে একটা দারুণ সুখের অস্থিরতা অনুভব করছিলাম, এই ভেবে যে সত্যিই কি তবে পৌঁছে গেছি সেই শ্রীনগর বা কাশ্মীরে? নিজের কাছে নিজেই যেন জিজ্ঞাসা করছিলাম। প্লেন থেকে নামতে না নামতেই জানিয়ে দেয়া হলো, এই এয়ারপোর্ট এ ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ!
করিডোর থেকে এয়ারপোর্ট, ছবিঃ লেখক

সাথে সাথে ক্যামেরা পকেটে আর মোবাইল ব্যাগে ঢুকে গেল, সামনেই ভারী অস্ত্রধারী নিরাপত্তা প্রহরী দেখে! পুরুষ ও মহিলা উভয়ই। মানে মানে কেটে পড়লাম রানওয়ে ছেড়ে। তবে আড় চোখে ঠিকই দেখে নিয়েছি, জ্যাকেটের ভারী টুপির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে, চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা, ফুলে ফুলে সাজানো, পাখিতে ভরপুর, মেঘ-কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত, সেনাবাহিনী দিয়ে নিরাপদ করে রাখা দারুণ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের শ্রীনগর এয়ারপোর্টকে। মনটা খুশিতে ভরে গেল পুরোটাই।
এয়ারপোর্টের ভেতরটা বেশ ছিমছাম অল্প জায়গা নিয়ে আর তেমন কোনো জৌলুশ ছাড়াই, কিন্তু চমৎকার হিমহিম ঠাণ্ডা একটা পরিবেশ। খুব দ্রুতই লাগেজ এসে গেল, ঠিক সেই সময়েই চোখ পড়লো প্লেনে পাশের সিটের সেই মায়াবী কাশ্মীরির দিকে, আহা কী ছিল চাহুনিতে কে জানে! ওদিকে বৌয়ের রক্ত চক্ষুর জ্বালাতনে চোখে নামিয়েই ট্রলি নিয়ে বাইরে গেটের কাছে দাড়িয়ে থাকা ড্রাইভারের কাছে ছুট দিতে হলো।
বাইরে বের হতেই তার সাথে আবার চোখা-চোখি আর ইশারায় বিদায় জানিয়েই, নির্ধারিত গাড়িতে ছুটলাম স্বর্গীয় কাশ্মীরের, মায়াময় ডাল লেকের পানে। আসছে দিনটি শুধুই ডাল লেকের-সকাল-দুপুর-আর সন্ধ্যার।
ফিচার ইমেজ- ghumakkarmasti.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দিল্লি: এক অপূর্ব এয়ারপোর্টের গল্প

বালির স্বপ্নজাদুঘর, উবুদ ও কফিফার্মের গল্পসল্প