হিমালয় ও স্বপ্নের গল্প: মাউন্ট কানামো অভিযান

রিফাত, রিফাত? মারুফা আপুর ডাকে ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললাম আজই তাহলে মেঘের উপরে হেঁটে যাব? ‘এমনিতেই মেঘের উপরেই আছি আমরা,’ হাসতে হাসতে বললেন মাহি ভাইয়া। দ্রুত উঠে গুছিয়ে নিতে বলে ভাইয়া নিচে গেলেন খাবারের অর্ডার দিতে। এক জোড়া মোটা কম্বলের ভেতর থেকে বের হয়ে বুঝলাম শীতে হাত পা শুকিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেকিং শুরু করার জন্য পোশাক পরার সময় তিনখানা বিশাল সাইজের ব্যাগে চোখ পড়ল। মাউন্ট কানামো অভিযানের রসদে ঠাসা প্রত্যেকটা ব্যাকপ্যাক। ব্যাগগুলো অন্যরকম একটা শিহরণ দিচ্ছে প্রতিটা রক্তশিরায়। প্রায় ছয় হাজার মিটার পর্বতে অভিযানে যাচ্ছি আজ। জীবনের দুঃসাহসিক স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর শিহরণ।

অভিযানের সকাল। কিবের, স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

খাবার শেষ করে নার্লিং হোমস্টের ঘর ছেড়ে যখন এর ছোট্ট উঠোনে এসেছি, গম্ভীর একটা মাতাল পরিবেশ ঘিরে ধরেছে যেন সময়টাকে। কিবের গ্রামের অনেকেই এসেছেন আমাদের উপদেশ দিতে। যেন প্রার্থনার মতো মন দিয়ে শুনছি কথাগুলো। প্রেয়ার ফ্লাগগুলো পত পত শব্দে উড়ছে কথাগুলোর ফাঁকে।

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক আটটা বাজতেই আমরা গ্রাম থেকে হাঁটতে শুরু করলাম উপরের দিকে। উদ্দেশ্য, ছয় ঘণ্টা ট্রেকিং করে মাউন্ট কানামো বেইস ক্যাম্পে পৌঁছানো। ‘তাশিদিলে’, গ্রামের এক বৃদ্ধ চাষার উদ্দেশ্যে বললেন মাহি ভাইয়া। তাশিদিলে তিব্বতীয় শব্দ। যার অর্থ হ্যালো। খুব হাসি মুখে উত্তর দিয়ে জানতে চাইলেন, কানামো গিলে? অর্থাৎ কানামো যাচ্ছেন? হ্যাঁ সূচক জবাবের পর উনিও ধীরে ধীরে যাবার পরামর্শ দিয়ে নিজের পথ ধরলেন।

চড়াই বেয়ে ওঠার মুহুর্তে পিছুটান। কিবের, স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

কিবের গ্রাম থেকে মাউন্ট কানামোর পথের নব্বই ভাগ রাস্তাই ক্রমশ উপরের দিকে উঠে গেছে। তাই উচ্চতা পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতি মুহূর্তেই অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায় প্রায় দেড় হাজার মিটার উচ্চতায় পৌঁছে যেতে হয়। যেটা ভূপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মিটার।

তাই এই পর্বতে পর্বতারোহীরা ধীরে ধীরে ওঠার চেষ্টা করেন। যাতে করে পরিবেশ ও উচ্চতার সাথে শরীর ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আমরাও নিজেদের পরিচিত ট্রেকিংয়ের গতি বুঝে ধীরে ধীরেই উঠছিলাম। আমাদের সাথে গ্রাম থেকে আসা গাইড ছিল সোনাম। পাহাড়েই জন্ম হবার সুবাদে উনিশ বছর বয়সী সোনাম আমাদের সবার থেকে উচ্ছল ছিল।

পিঠে কুড়ি কেজির বোঝা নিয়েই চলেছি পর্বতে।  স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

ঘণ্টা দুয়েক ক্রমশ উপরের দিকে ওঠার পর সোনামের আদেশে আমরা বিশ্রামের জন্য বসলাম প্রায় সাড়ে পনেরো হাজার ফিট উচ্চতায়। দুই ঘণ্টার হাঁটা পথের দূরত্বে কিবের গ্রাম ছোট হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আরদু একটা চূড়া পেরোলেই আমরা আর কোনো লোকালয়ের দেখা পাব না। ব্যাগ থেকে খেজুর, চকলেট আর কিছু বাদাম খেয়ে নিজেদের চাঙ্গা করে উঠে পড়লাম।

মহিউদ্দিন মাহি ভাইয়া অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। অভিজ্ঞতার খাতিরেই ভাইয়া সবার পেছনে হাঁটছেন আর সোনাম সবার সামনে। আমি আর মারুফা হক আপু মাঝের জায়গাটা সামনে পেছনে করে হাঁটছি। পর্বতে শরীরকে বুঝতে পারাটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রয়োজন মতো শরীরকে বিশ্রাম না দিলে ভয়াবহ অসুস্থতা এমনকি মৃত্যু ঘটে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। যত উপরে উঠছি নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।

অপেক্ষা,ক্লান্তি ও বিশ্রাম।  স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

চারপাশে বিশাল উঁচু পর্বতসারি। একটা পেরোলেই তার থেকে উঁচু অন্য একটা পর্বত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড ভারী হয়ে আসছে। চোখে কয়েকবার আলোর ঝলক লাগতেই বসে পড়লাম। সহযাত্রীদের নিরাশ করা চলবে না। চুপিচুপি একটা চকলেট পুরে দিলাম গালে।

কেউ আমাকে এভাবে বসে পড়তে দেখলে কিছুটা ভীত হয়ে পড়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু প্রায় পাঁচ হাজার মিটার উপরে দলের জন্য বোঝা হয়ে যেতে হবে ভেবেই নিজেকে স্থির করে নিলাম। আরাম করে বসে চারদিকের বিশাল পাহাড়ে ঘেরা ভ্যালির দিকে তাকাতেই শান্ত হয়ে এলো হৃৎপিণ্ড। দলের বাকি সবাই তখন নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। হাত নেড়ে হেসে দিয়ে বুঝালাম আমি একদম ঠিক আছি।

লোকালয় সরে যায় দূর থেকে দূরে।  স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

উঠে দলের কাছে ভিড়তেই মাহি ভাইয়া একটা চকলেট দিলেন। আমি মহাখুশি। সামনে কিছুটা সোজা রাস্তার উপর মেঘ জমে আছে। অপরপাশে কী আছে তা দেখার মতো উপায় নেই। হাঁটতে হাঁটতে যখন ঢালু রাস্তারটার মাঝের দিকে এলাম, চোখে পড়ল সামনে সোজা উঠে যাওয়া একটা চূড়া থেকে পিপড়ের সারির মতো কিছু মানুষ নামছে। সোনাম বলল ওই পথেই আমাদের নাকি উঠে যেতে হবে।

আমার চোখ তখন ছানাবড়া। হাঁটুতে কাপুনি ধরে গিয়েছে বেশ আগেই। দেখতে দেখতে কুড়ি, পঁচিশজন তরুণ আরোহী আমাদের কাছাকাছি চলে এলো। চূড়ায় আরোহন শেষে নেমে যাচ্ছে তারা। সবার সাথে করমর্দন করে অভিনন্দন জানালাম। পরের পথটুকু সহজ হবে এই আশ্বাস দিয়ে সবাই যেভাবে এসেছিল সেভাবেই মেঘের আড়ালে চলে গেল।

কানামো লেক। লেকের একটু উপরেই বেইসক্যাম্প। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

সোজা উঠে যাওয়া পর্বতের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই ভয়াবহ প্রকৃতি জানান দিচ্ছিল তার মহিমা। তাপমাত্রা ততক্ষণে শূন্যের কাছাকাছি। মাঝে মাঝে বৃষ্টির ফোটাগুলো সূঁচের মতো চোখে মুখে বিঁধছিল। ব্যাগ থেকে দ্রুত পঞ্চ বের করে পরে নিলাম সবাই। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা হাঁটার পর সুন্দর একটা লেকের পাড়ে এসে বিশ্রাম নিলাম আমরা।

সেখান থেকেই দেখা যাচ্ছে মাউন্ট কানামো বেইস ক্যাম্প। কিবের থেকে যে পর্বতগুলো অনেক উঁচু মনে হচ্ছিল, সেগুলোকে দেখাই যাচ্ছে না প্রায়। অনেক নিচে থেকে মেঘ উড়ে আসছে আমাদের দিকে। আর পাহাড়ের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছে আশ্চর্য মেঘদল।

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

কিবের যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি, অথবা চণ্ডীগড়। ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি। এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি থেকে কাজা গামি একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে ছয় মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ৩০০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন কাজায়। ভাড়া পড়বে ৮০০ রুপি শেয়ারে গেলে, আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন। কাজা থেকে কিবেরে প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় একটা বাস চলাচল করে। ভাড়া পড়বে পুরুষ ৩০ রুপি, নারী ২৫ রুপি।

কাজা থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করেও কিবের যাওয়া যায়। খরচ পড়বে ১,০০০ রুপি। কিবের থেকে ১,৫০০ রূপি প্রতিদিন গাইড খরচ, পোর্টার ৬০০ রূপি ও মালামাল বহনের জন্য গাধা নিলে ২০০ রূপি করে খরচ হবে। এখান থেকেই দুই দিন থেকে চারদিনের ব্যবধানে মাউন্ট কানামো অভিযান সম্পন্ন করা যাবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নিঝুম দ্বীপে ঘোরাঘুরি ও কিছু দিক নির্দেশনা

উত্তাল সমুদ্রে সেন্ট মার্টিন