শ্রীমঙ্গলের শিহরণ!

দেশের মধ্যে প্রায় সব জেলাই এখন পর্যন্ত কম বেশী ঘোরা হয়েছে। আমাদের দেশের সকল জেলার মধ্যে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার জেলা হলো মৌলভীবাজার। আরও বিশেষ করে বললে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। শুধুমাত্র সবুজের সমুদ্রের জন্য। হ্যাঁ সত্যি তাই, সবাই যেটাকে চা বাগান বলে, সেটা আমার কাছে সবুজের সমুদ্র মনে হয়! তাই চা বাগানের আমি নিজের মতো করে নাম দিয়েছি সবুজের সমুদ্র! দেশের মধ্যে কমন কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ এলে বা পেলে আমি সবার আগে শ্রীমঙ্গল যেতে চাই সব সময়।

এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার শ্রীমঙ্গল যাওয়া হয়েছে আমার। আজকে শেষবারের কথা বলি। সেবার শ্রীমঙ্গল পৌঁছালাম শেষ দুপুরে। এটা ছিল পারিবারিক একটি ঝটিকা ভ্রমণ। তো সেই কারণে, রাস্তা আর ফুটপাতের ভ্রমণকারীকে সেবার বেছে নিতে হয়েছিল ছোট পাহাড়ের উপরে অবস্থিত আর ভীষণ নান্দনিকতায় ঘোর লাগানো শ্রীমঙ্গল টি-রিসোর্টকে।

সবুজের সমুদ্রে! ছবিঃ লেখক

মধ্য ডিসেম্বরের কুয়াশায় জড়ানো চারদিক। সবুজ চা পাতায় আচ্ছাদিত দৃষ্টি সীমার সবটুকু যেন সবুজ সমুদ্রসম! আর যতদূর চোখ যায় ঢেউ খেলানো চা বাগানের সাথে আলিঙ্গনরত কুয়াশারা যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। উঁচু উঁচু গাছের ফাঁক ফোঁকর থেকে ঠিকরে পড়া সূর্যের ক্ষীণ আলো আরও মায়াবি করে তুলেছিল সেই বিকেলটাকে। সোনালি-রুপালী আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল সবুজের মাঝে। এতটাই সম্মোহিত ছিল চারপাশ যে বসে বসে উপভোগ করবো, নাকি হেঁটে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

টি রিসোর্টের অভ্যর্থনা কক্ষের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে, পাহাড়ে ওঠা! হ্যাঁ পাহাড়ই তবে আমার পুত্রের কাছে! আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে উঠে চলেছি আমরা। চারপাশে বেশ ঘন আর সবুজ অরণ্য, বড় বড় গাছের লতায়-পাতায় পড়তে থাকা শিশিরের টুপটাপ শব্দ, সন্ধ্যা আর বসন্তের আগেই কানে এলো ঝিঁঝি পোকার ডাক! পাখিদের কিচিরমিচির, চারদিকে একেবারেই নীরব-নিস্তব্ধ ঘোর লাগা এক পরিবেশ। যেন ঘন অরণ্যের মাঝ দিয়ে কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চলেছি। শীতের কুয়াশার ঘন অন্ধকারে ঠিক এমনটাই মনে হচ্ছিল।

শেষ বিকেলের চা বাগান। ছবিঃ লেখক

৮-১০ মিনিটের ছোট্ট টিলার চূড়ায় উঠেই মুগ্ধতা তার মাত্রা ছাড়িয়ে গেল যেন। যেন পাহাড়ের ভ্যালীতে ছোট ছোট কটেজের ছড়াছড়ি। কিন্তু সেগুলোর দাম শুনে আর মনেই আসেনি কটেজে থাকার কথা। আমাদের নরমাল রুমই ঢের আপাতত। প্রাথমিক ফ্রেশনেসের পরে আবারো বেরিয়ে পড়া। উদ্দেশ্য সূর্যের শেষ আলোর রশ্নিতে, সবুজের মাঝে বর্ণিল গোধূলি দেখা। শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের শেষ বিকেলকে আসলে গোধূলি না বলে বলা উচিৎ, স্বর্ণালি সন্ধ্যা! কারণ এখানে এই সময়ে যতটা না গোধূলির বর্ণিলতা চোখে পরে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী আবেশে জড়ায় কুয়াশার চাদরে জড়ানো আর সবুজ গাছের মায়ায় মেশানো পড়ন্ত সূর্যের সোনালি এক আলোর বিচ্ছুরণ!

এরপর সূর্য ডুবে সন্ধ্যার আঁধার নামতে না নামতেই অদ্ভুতভাবে আর ভীষণ ভীষণ অবাক করে দিয়ে, কালো হয়ে যাওয়া সবুজের সমুদ্র মানে চা গাছের পাতায় পাতায় জ্বলে উঠতে লাগলো নীল নীল আলো! কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই নিয়ন আলোয় আলোকিত চারদিক। জ্বলে-নেভে, জ্বলে-নেভে নীল নীল আলো। জোনাকির মায়াবী আলো। পূর্ব দিকে উঠেছে ভরা পূর্ণিমার ধবধবে চাঁদ! আর তার ঝকঝকে হাসির ঝিলিক। চা গাছের পাতায় পাতায় ঝরে পড়া শিশিরের কণায় চাঁদের আলো পড়ে যে অপার্থিব মাধুর্যের সৃষ্টি হয়, তার কোনো বর্ণনা কি ভাষায় দেয়া সম্ভব? অন্তত আমার কাছে ওই বর্ণনা দেবার মত দুঃসাহস বা তেমন শব্দ নেই। আর রয়েছে ভয়ে হীম হয়ে যাওয়া দলবাঁধা শেয়ালের ডাক।

রিসোর্ট এর পথে যেতে। ছবিঃ লেখক

আর সকালটা? সেটা আজও অমলিন। জেঁকে ধরা শীতের ছোবলকে উপেক্ষা করে, বেলকনিতে পা রাখা, পেতে সকালের প্রথম সূর্যের নরম স্পর্শ। বেরিয়েই চোখ ছানা বড়া! এত বিলাসী একটা জায়গায় থেকেছি রাতে ভাবতেই পারিনি। বেলকনির গেট খুলতেই ঝকঝকে স্বচ্ছ নীল জলের অগভীর সুইমিংপুল। চারপাশে টাইলসের বাঁধানো ঘাট! সবুজ মখমলে মোড়ানো তার পাড়! কাছে দূরে গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরি বিশ্রামের আবাস। দূরে গাছে গাছে কুয়াশার চাদর। ধোঁয়া ওঠা গরম কফি শেষ করেই, গায়ে সরিষার তেল লাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সেই নীল জলে! হীম ঠাণ্ডা জলের সাথে নরম রোদের পরশ আর পাশেই সাঁতারের ক্লান্তি দূর করার গরম কফি।

ঠিক এমন এক অদ্ভুত সময়, দুটি দিন আর কিছুক্ষণ কাটিয়ে ছিলাম, শ্রীমঙ্গলের সেই অপূর্ব টি রিসোর্টে। টি রিসোর্টের গল্প পরে একদিন বলব, ভালো মন্দের মিশেলে। তবে আর যাই হোক মাঝে মাঝে এমন বিলাসিতার দরকার আছে বলেই আমি মনে করি। আর যে কোনো ভ্রমণে চিরায়ত সেই আক্ষেপের মতো আবারো একবার আমাদের সবচেয়ে প্রিয় শ্রীমঙ্গলে ফিরে আসার আকুলতা নিয়ে ফিরে এসেছিলাম বেশ দামী আর আমাদের প্রায় সাধ্যের বাইরের দামের রিসোর্ট থেকে।

নীল জলের বিলাসিতা। ছবিঃ লেখক

তবে দাম যতই হোক না কেন, সবার আনন্দ, উদযাপন, উপভোগ আর তৃপ্তি ছিল ভরপুর। এই নিয়েই বেশ কেটেছিল দুদিন। শেষ বিকেলের মাধুরী, সোনায় মোড়ানো সন্ধ্যা, ঝিঁঝিঁ ঢাকা রাত, রুপালী চাঁদের জ্যোৎস্না, কুয়াশা কেটে ওঠে ঝকঝকে মিষ্টি রোদের সাথে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ! সুইমিং পুলের নীল জলে দাপাদাপি, রিসোর্ট আর সবুজের সমুদ্রে গড়াগড়ির সাথে মা-ছেলের খেলা করা, দুষ্টুমি-বাঁদরামি আর আহ্লাদের আবদার!

ক্ষণিকের বিলাসিতায় আর কী চাই? শ্রীমঙ্গল আমাদের কাছে সব সময় শিহরণ তোলা এক আকর্ষণের নাম। ছিল, আছে আর থাকবেও।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুনর্ভবা, নামের আকর্ষণে!

এত বেড়াই কীভাবে? আমার কি অনেক টাকা!