সন্ধ্যার শ্বাসরুদ্ধকর হাকালুকি হাওর!

বাস থেকে নেমে যখন মৌলভীবাজার শহরে পা রাখলাম, ঘড়িতে তখন বেলা ১২টা। দেশের সবচেয়ে বড় হাওর, হাকালুকি দেখতেই মূলত এখানে আসা। গতকাল লালাখাল আর বিছানাকান্দিতে খুব ভালো সময় কাটিয়েছি। আজ সকালে সিলেট থেকেই চলে এলাম এখানে। এক ঘণ্টার মধ্যেই চলে এসেছি।
হোটেলে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাকালুকির উদ্দেশ্যে। হাকালুকি যাওয়ার রুট আছে বেশ কয়েকটা। এরই মাঝে আমরা ছোট্ট একটা ভুল করে ফেললাম। উঠে পড়লাম কুলাউড়ার বাসে! সেটাও বুঝেছি অর্ধেক পথ পাড়ি দেয়ার পর! ততক্ষণে দেরি যা হওয়ার হয়ে গেছে। বাসের এক সহযাত্রীর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম কুলাউড়া নেমে আবার যেতে হবে জুড়িঘাট। সেটাও কমপক্ষে এক ঘণ্টার পথ।
হিসেব করে দেখলাম আমাদের সেখানে পৌঁছাতেই বেজে যাবে ৫টা! মাসটা অক্টোবর, শীত আসি আসি করছে। দিন ছোট হয়ে এসেছে। ৫টায় পৌঁছে নৌকা ঠিক করে যদি উঠেও পড়ি তাতেও নিশ্চিত সন্ধ্যা নেমে আসবে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে হাওর দেখা কি হবে? ছবি তোলার কথা তো বাদই দিচ্ছি!
আমাদের ১৩ জনের দলটা খুবই প্রাণবন্ত এবং অতি উৎসাহী। সবার দাবি একটাই, দেরি যতই হোক, হাকালুকিকে আমরা দেখে নেব! কাজেই চিন্তা দুশ্চিন্তা সবকিছু বাদ দিয়ে চললাম কুলাউড়ার দিকে।
মৌলভীবাজার শহর থেকে কুলাউড়া যাওয়ার পথটা অসাধারণ সুন্দর! এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা একটা ঘন বনের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। দুইপাশে চোখ ধাঁধানো সবুজ আর ঠিক মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। একটু পর টিলা আর চা বাগানের দেখাও পেলাম!
কুলাউড়া নেমেই লেগুনা নিয়ে চলে এলাম জুড়িঘাট। ৫.৩০টা বেজে গেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঘাটে এসে নৌকাগুলো দেখে একটা ছোটখাটো ধাক্কা খেয়ে গেলাম। টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটনের দিক থেকে এগিয়েছে অনেকটাই। হাকালুকি হাওর এখনো সেভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই এখানকার নৌকাগুলো খুবই সাধারণ। এখানে বড় নৌকা মানে ইঞ্জিনওয়ালা লম্বা সরু নৌকা। এগুলোকে ট্রলার বলারও উপায় নেই। লাইফ জ্যাকেট থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। অগত্যা এগুলোর একটাতেই উঠে পড়লাম। ৫০০ টাকা চুক্তিতে আমাদের ওয়াচ টাওয়ার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।

হাকালুকিতে সূর্যাস্ত, ছবিঃ এমএসইউ রানা

দলের শেষ সদস্যটি উঠে পড়ার সাথে সাথে নৌকাটা ভয়ংকরভাবে দুলে উঠল! এই বস্তু যখন হাওরে চলতে শুরু করবে তখন অবস্থাটা কী হবে সেটা চিন্তা করে আমাদের পেটের ভাত চাল হতে শুরু করেছে!
নৌকা যখন হাওরের বুকে ভাসছে তখন চারপাশে নিকষ কালো অন্ধকার! ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে এগিয়ে চলছি আমরা। মাঝেমধ্যে হাকালুকির দুই পাড়ের জনবসতি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে টর্চ লাইটের আলো দেখতে পাচ্ছি। বলতে গেলে আর কোনো ধরনের আলোই নেই।
আধ ঘণ্টা এভাবে চলার পর হাকালুকির কিছুটা ভেতরের দিকে চলে এলাম। হঠাৎ আকাশে ওঠা চাঁদের আবছা আলোয় মনে হলো, হাকালুকি আসলে হাওর নয়, একটা আস্ত সমুদ্র! কোনো কূল কিনারা দেখতে পাচ্ছি না! এমন সময় বিশাল বিশাল সব ঢেউ উঠতে শুরু করল। নৌকা একটু পর পরই বিপদজনকভাবে দুলে উঠছে।
সন্ধ্যা নামছে, ছবিঃ অঞ্জন অপু

এদিকে আমাদের অবস্থা মোটামুটি শোচনীয়! কেউই ভালো সাঁতার জানি না। আমাদের দুই সদস্যের আবার আছে হাইড্রোফোবিয়া! দুজন দুজনের হাত ধরে পারলে সেখানেই কেঁদে কেটে আরেকটা হাওর বানিয়ে ফেলে!
আমি তখন চিন্তা করছি জীবনে এখনো কী কী করা বাকি আছে সেই কথা। নৌকাটা যদি ডুবেই যায় তাহলে জীবনের ওপারে গিয়ে আফসোস করব কিনা সেটা নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলাম! তারপর দেখার চেষ্টা করলাম বাকিদের অবস্থা!
হাকালুকির বিশালতা, ছবিঃ অঞ্জন অপু

একজন এতকিছুর মাঝেও হেড়ে গলায় গান গেয়ে যাচ্ছেন। আমরা সবাই গলা মেলাচ্ছি তার সাথে! একজন নৌকার একেবারে সামনের পাটাতনে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন, কোনো সাড়া শব্দ আসছে না সেখান থেকে! একজনকে দেখলাম একটু একটু কাঁপছেন কিন্তু মুখে দন্ত বিস্তৃত হাসি! একজন শরীর শক্ত করে বসে আছেন, নড়াচড়া নেই! আর দুই হাইড্রোফোবিক সদস্যের একজন রীতিমতো চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছেন, ওয়াচ টাওয়ার পর্যন্ত না গিয়ে এখনই যেন নৌকা ঘুরিয়ে ফেলা হয়! কে শোনে তার কথা!
নেমে এসেছে অন্ধকার, ছবিঃ বদরুল ইসলাম মিয়া

শেষ পর্যন্ত ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে গেলাম আমরা! তবে স্রোত বেড়ে যাওয়ার কারণে ওপরে ওঠা হয়নি আর! সেখান থেকেই নৌকা ঘুরিয়ে ঘাটের দিকে রওনা হয়ে গেলাম।
হাকালুকিতে এই নৌ ভ্রমণের প্রত্যেকটি মুহুর্ত ছিল ভীষণ উপভোগ্য! শ্বাসরুদ্ধকর রোমাঞ্চ সম্ভবত প্রথমবারের মতো এত তীব্রভাবে অনুভব করেছি এখানেই! এই হাওরের বিশালতাও মুগ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে। দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা নিয়েই আমরা ফিরেছি হাকালুকি থেকে।

যেভাবে যাবেন:

আমাদের মতো জুড়িঘাট হয়ে যাওয়াটা অনেক সময়সাপেক্ষ। সহজ একটি রুট হতে পারে ঢাকা থেকে বাসে বড়লেখায় পৌঁছানো। সেখান থেকে রিজার্ভ সিএনজি নিয়ে সরাসরি চলে যেতে পারেন হাওরের ঘাটে।
ট্রেনে আসতে চাইলে সিলেটের ট্রেনে উঠে নেমে যাবেন মাইজগাঁও স্টেশনে। এরপর অটো নিয়ে ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টে চলে আসতে পারেন। নৌকা ঠিক করতে পারবেন এখান থেকেই।

খুঁটিনাটি:

হাকালুকি যাওয়ার জন্য ভোরেই রওনা দেয়াটা সুবিধাজনক। সন্ধ্যার হাকালুকি বেশ বিপদজনক!
নৌকা ভাড়া ঘণ্টা প্রতি ৬০০ টাকা। এক বছর আগে যাওয়ায় আমরা ৫০০ টাকা দিয়েছিলাম।
সাঁতার জানা না থাকলে লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখবেন।
অবশ্যই হাওরের পানিতে কোনো আবর্জনা ফেলবেন না! সিগারেটের ফিল্টার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রাখবেন।
ফিচার ইমেজ- আলী আহসান তারেক 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পক্ষীপ্রেমিকদের জন্য ৫টি আকর্ষণীয় স্থান

মহানন্দা নদীর ধারের কাশফুলের চর ও অন্যান্য