শেষ সন্ধ্যায় ডুয়ার্সে

ডুয়ার্স নিয়ে আমার সুপ্ত একটা স্বপ্ন ছিল। সেও সেই অনেক দিন থেকে। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকে প্রথম যখন দীপাবলির সাতকাহন আর অনিমেষের উত্তরাধিকার পড়ি। সেই তখন ডুয়ার্স, এর সবুজ চা বাগান, আঙরাভাসা নদী, ডুডুয়ার পাহাড়ি ঢল, নুড়ি পাথরের ফাঁকে ফাঁকে ছোট-বড় মাছের লুকিয়ে থাকা, একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় বিমূঢ় করে রেখেছিল। কিন্তু অনেক অনেকবার এদিকে আসা হলেও নতুন প্রেয়সীর প্রেমে এতটাই মশগুল হয়ে পড়েছিলাম যে প্রথম আবেগের, প্রথম ভালো লাগাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম বলা যায়।

কিন্তু এই বছরের শুরুতে, যখন প্রেয়সীর কাছে যেতে চেয়েও পারিনি, তখন কথা দিয়েছিলাম কোনো না কোনো এক ফাঁকে আমি নতুন প্রেয়সীর কাছে যাবার সময় পুরনো প্রেম ডুয়ার্সে একটু হলেও উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাবো। তার উপর অনেকদিন পরে নতুন করে বই পড়ার নেশাটা পেয়ে বসাতে পুরনো প্রেম যেন ছাই চাঁপা আগুনের মতো উথলে উঠতে চাইছে মনপ্রাণ জুড়ে। তাই ঠিক করে নেয়া হলো এবার আর কোনো ভুল নয়, প্রেয়সীর কাছে যাবো ঠিক আছে, তবে একটু এদিকটা চোখে দেখে।

অরণ্যে নদী। Photo: http://bookmydisha.com

পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি সেভাবেই নিয়েছিলাম। প্রথমে ডুয়ার্স, অন্তত দুই দিন সেখানে হেঁটে, গড়িয়ে বা অলস সময় কাটিয়ে তারপর না হয় দার্জিলিং যাওয়া যাবে। কিন্তু বাস আর ট্রেনের দ্বন্দ্ব, জ্যাম, ভাঙা রাস্তা আর কয়েকটা বাহনের ঝামেলা শেষ করে বুড়িমারি থেকে চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে করতে শেষ বিকেল হয়ে গেছে। যদিও ততক্ষণে জীপ ঠিক করে ফেলেছি যে আজই যাবো, ডুয়ার্সের গভীরে যদি যেতে নাও পারি, অন্তত এর স্পর্শের মধ্যে থাকতে পারলেই আমি আপাতত খুশি।

স্থানীয় লোকজন আর জীপের ড্রাইভারের সাথে কথা বলে জানা গেল যে, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি হলো ডুয়ার্সের প্রবেশপথ। আর আমাদের হাতে যে সময় আছে, তাতে করে খুব বেশী হলে দেড় ঘণ্টা দূরত্বের লাটাগুড়ি পর্যন্ত যেতে পারি। যেহেতু হোটেল বা কটেজ ঠিক করা নেই, সেহেতু গভীর জঙ্গলে গিয়ে, পরিবার আর বাচ্চা নিয়ে নতুন করে হোটেল আর কটেজ খুঁজে ওঠার মতো ঝুঁকি না নিয়ে, লাটাগুড়ি পর্যন্ত যাওয়াটাই ঠিক করলাম। সেভাবেই ১,৫০০ রুপীতে জীপ ঠিক করা হলো। জীপ লাটাগুড়িতে আমাদের হোটেল বা কটেজ খুঁজে না ওঠা পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকবে।

অরণ্যের মাঝে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ছবিঃ indiamike.com

শুরু হলো শেষ বিকেলে, কৈশোরে প্রেমে পড়া সেই ডুয়ার্সের দিকে যাত্রা। আমি তো দারুণ শিহরিত, কিছুটা শিহরিত ছেলের মা-ও। কারণ আমি জানি, আমার মতো করে এই ডুয়ার্স আর তার চা বাগানের প্রেমে সে নিজেও পড়েছে, একই সময়ে। তবে তার আনন্দটা অপ্রকাশিত, আমার কাছে ধরা পরে যাবার ভয়ে, আর আমারটা উচ্ছ্বসিত প্রকাশে আবির্ভূত।

আমাদের জীপ চ্যাংড়াবান্ধা বাইপাস পেরিয়ে জলপাইগুড়ির রাস্তায় ওঠার পরেই নতুন করে শিহরিত হতে বাধ্য হলাম রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে সবুজের সমুদ্র বা মন কেড়ে নেয়া সবুজের হাতছানি, জলপাইগুড়ির সেসব চা বাগান। যা এতদিন ধরে বইয়ে পড়ে এসেছি।

প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার জুড়ে কখনো চা বাগান, কখনো ঘন অরণ্য, কখনো বিস্তীর্ণ প্রান্তরের সবুজের বুক চিরে, মুগ্ধ রাস্তা জুড়ে চলার পরে আমরা পেলাম অনেক কাঙ্ক্ষিত সেই ডুয়ার্সের প্রবেশমুখ যে জায়গাটা ময়নাগুড়ি নামে পরিচিত। তখন শেষ বিকেলের আলো নিভু নিভু আর সন্ধ্যা আগমন পুরো গ্রাম, শহর বা প্রকৃতির আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত ডুয়ার্স জুড়ে।

আহা, সেই স্বপ্নের অরণ্য। ছবিঃ ocean6holidays.com

ময়নাগুড়ি থেকে লাটাগুড়ি যাবার রাস্তাটা তুলনামূলক বেশ ফাঁকা। মসৃণ পিচ ঢালা রাস্তায় হু হু করে ছুটে চলেছে আমাদের জীপ, ডুয়ার্সের মধ্য দিয়ে, লাটাগুড়ি অরণ্যের দিকে। যদিও জীপে করে যাচ্ছিলাম, প্রায় অন্ধকার রাস্তা দিয়ে, কিন্তু তবুও কেমন যেন একটা গা ছমছমে অনুভূতি বারে বারে ঘিরে ধরছিল দু’পাশে ঘন, কালো, নির্জন আর প্রাচীন অরণ্যের মাঝ দিয়ে ছুটে যেতে।

মাঝে মাঝে বিস্তীর্ণ চা বাগানের মাঝে ছোট ছোট ঘরের মধ্য থেকে ছুটে আসা আলো জানান দিচ্ছিল ওরা অনেকটা আগের মতোই আছে, যেমনটা বইয়ে পড়েছিলাম। মদেসিয়া নারী বা চা বাগানের কর্মীরা তখন দিনের কাজ শেষ করে ঘরে বা ওদের কলোনিতে ফিরে যাচ্ছে। অরণ্য আর চা বাগানের মাঝে ছুটে চলা নির্জন, ফাঁকা আর অন্ধকার রাস্তার মাঝে মাঝে কোনো কোনো মোড়ে আলো জ্বেলে রয়েছে চায়ের দোকান, মুদি বা মনোহারি দোকান, দুই একটা সবজির দোকান, আর মাঝে মাঝে এক আধটা মাছ বা মাংসের দোকান চোখে পড়ছিল।

সন্ধ্যার শুরুতে, অরণ্যের মাঝে। ছবিঃ wordpress.com

এভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট চলার পরে, একটা বাজার চোখে পড়ল। ছোট্ট, মফস্বলের বাজারের মতো, লাটাগুড়ি বাজার। তার মানে আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি, আমাদের আজকের গন্তব্যে। ডুয়ার্সের অরণ্যের মাঝে, গা ছমছমে নীরবতা আর ব্যস্ততাহীন লোকালয়ে।

একটু পরে লাটাগুড়ি বাজার পেরিয়েই আমাদের জীপ থামলো একটি কটেজের সামনে, সোনার বাংলা কটেজ। আমাদের দেখে নেয়ার জন্য যে রুম পাওয়া যাবে কিনা আর পেলেও সেটা আমাদের বাজেটের সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ কিনা।

রিসোর্টের অভ্যর্থনা। ছবিঃ লেখক

দুজনে নেমে গিয়ে কটেজ দেখে দারুণ পছন্দ হয়েছে, কিন্তু রুম মাত্র একটা খালি আছে, ভাড়াটাও বেশ একটু বেশীই, ১,৮০০ রুপী। তবে চারজন বা পাঁচজন অনায়াসে থাকতে পারবে সেখানে। ফিরে এসে সবাইকে বলতে কেউই প্রথম দিকে রাজি হলো না। পরে আরও দুই একটি কটেজ দেখে, তেমন ভালো না পেয়ে আর আরও রাত পর্যন্ত অযথা ঘোরাঘুরি করে হয়রান না হয়ে, সোনার বাংলা কটেজের সেই এক রুমই নিয়ে নিলাম।

অতিরিক্ত বিছানা আর শীতের আয়োজন সহ ২,০০০ রুপীতে পেয়ে গেলাম। ব্যস, সবাই যার যার ব্যাগপ্যাক নিয়ে ঢুকে পড়লাম, ভীষণ চমৎকার এক কটেজে, সোনার বাংলায়। আমাদের আজকের রাত আর কালকের সকালটা ডুয়ার্সের লাটাগুড়ির এই নির্জন আর অনিন্যসুন্দর কটেজেই কাটবে ভেবে আমি তো দারুণ রোমাঞ্চিত ছিলাম।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাফটিং রোমাঞ্চ তিস্তায়

সিঙ্গাপুর: যেখানে অল্প বাজেটে ঘোরা অবিশ্বাস্য কিছু নয়