সন্ধ্যার মায়াবী বিছানাকান্দি

লালাখালে বেশ অনেকটা সময় কাটিয়ে দুপুর ২টায় আমরা ঘাটে ফিরেছি। আমাদের সিএনজির ড্রাইভারেরা অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য। আজ আমাদের লালাখাল আর বিছানাকান্দি যাওয়ার কথা। অনেকটা সময় ইতোমধ্যে চলে গেছে। তাড়াতাড়ি আমাদের তিন সিএনজিতে উঠে পড়লাম আমরা ১৫ জন। লালাখালের মতোই বিছানাকান্দিতেও আমরা যাচ্ছি অন্য একটা ঘাট হয়ে। হাদারপাড় যাচ্ছি না।
ভাবছিলাম এবার হয়তো রাস্তাটা একটু ভালো হবে, ঝাঁকির ঝক্কি কিছুটা কম পোহাতে হবে। তবে এক ঘণ্টা পরই বুঝতে পারলাম ভুল ছিলাম! শেষের এক ঘণ্টার ঝাঁকিতে ভয় পাচ্ছিলাম কখন আবার সিএনজির চাকা খুলে যায় বা চাকার স্প্রিং ভেঙে যায়! এমন হলে বিপদেই পড়তে হবে। আশেপাশে চাকা ঠিক করার কোনো গ্যারেজ নেই। শেষবার যখন সিলেটে এসেছিলাম, এই বিছানাকান্দি থেকে আসার পথেই সিএনজি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঠিক করার কোনো উপায় ছিল না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সন্ধ্যা থেকে রাত গড়ানোর পর নতুন সিএনজির দেখা পেয়েছিলাম। ফেরার পথে পান্থুমাই হয়ে আসতে চেয়েছিলাম সবাই। কিন্তু এই যান্ত্রিক বিভ্রাটের কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
এবার যাতে তেমন অভিজ্ঞতা না হয় সেজন্য অন্য কয়েকজন ড্রাইভারের সাথেও কথা বলে এসেছি। আমাদের তিন সিএনজির কোনোটা নষ্ট হলে তাদের কেউ যাতে নিতে আসেন আমাদের।
বিকেল ৪টায় একটা বিরতি নিলাম আমরা। দুপুরে কিছুই খাওয়া হয়নি। এখানে এসে দেখলাম খাবার প্রায় শেষ। নতুন করে রান্না করতে হবে। কিন্তু নতুন রান্না খাওয়ার মতো যথেষ্ট সময় নেই আমাদের হাতে। তাই হালকা কিছু খেয়েই আবার উঠে পড়লাম সিএনজিতে।
ভয়ংকর ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে আমরা যখন এই নতুন ঘাটে পৌঁছালাম তখন বাজে বিকেল ৫টা। এখনই নৌকা ঠিক করে রওনা দিলেও বিছানাকান্দিতে গিয়ে সময় কাটানো হবে কিনা সেটা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম সবাই। ঘাটে তখন নৌকা ছিল চারটা। একটা নৌকা দেখলাম বিছানাকান্দি থেকে ফিরেও এসেছে। তড়িঘড়ি করে দুটো নৌকা ঠিক করে তখনই রওনা দিয়ে দিলাম। আগে পৌঁছে পরে চিন্তাভাবনা করা যাবে।

যাত্রার শুরুর ঠিক পর, ছবিঃ জিম

বিছানাকান্দিতে যাওয়ার পথে এই জলভ্রমণটি বেশ স্বস্তিদায়ক। শেষ বিকেলে প্রকৃতির মাঝে এমনিতেই একটা আলাদা মায়া থাকে। ছোটখাটো পাহাড়-টিলাগুলোকে পেছনে ফেলে নৌকা যখন পানির বুকে এগিয়ে চলতে থাকবে, সেই মায়া আরও ভালোভাবে অনুভব করবেন আপনি।
পাহাড়ের সারি, ছবিঃ জিম

আমাদের নৌকাটাই তখন শুধুমাত্র বিছানাকান্দিমুখী। বাকি সবগুলো নৌকা তখন ফিরতি পথ ধরেছে। নৌকার ভেতরের মানুষজন বারবার তাকাচ্ছে আমাদের দিকে। কেউ কেউ হেসে দিচ্ছে! আমরাও পাল্টা হাসি উপহার দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি!
পাহাড়, আকাশ, প্রকৃতি, ছবিঃ জিম

ঠিক সাড়ে ছটায় আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। শেষ বিকেলের আলো তখনো আছে কিছুটা। শেষ হয়ে যায়নি। তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা শেষ হতে চলেছে। নৌকা থেকে নেমেই একটা বড় ধাক্কা খেলাম। আগে ছোট ছোট টেবিলে জিনিসপত্র সাজিয়ে বেচাকেনা শেষে টেবিলগুলো উঠিয়ে নিয়ে চলে যেত বিক্রেতারা। এখন দেখছি ছাপরা ঘর তুলে রীতিমতো বাজার বসানো হয়েছে জায়গাটায়! পুরো ব্যাপারটাই খুব বেমানান লাগছে।
সন্ধ্যা নামার একটু আগে, ছবিঃ জিম

তবে এই সন্ধ্যায় এখানে আসার বেশ ভালো একটা সুফল পেলাম আমরা। বিজিবি বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছে। পুরো জায়গাটায় আমরা ছাড়া আর কেউ নেই! একপাশে বিজিবি, অন্য পাশে বিএসএফ আর মাঝখানে আমরা! সবার পরে আসার কারণে বিজিবি আমাদের দৈন্য দশাটা বুঝতে পেরেছিল সম্ভবত। বিনা বাধায় তাই আশেপাশে ঘোরাঘুরি করার ছাড়পত্র পেয়ে গেলাম! দুশ্চিন্তা করার বদলে নিজেদের ভাগ্যকে একটা বড়সড় ধন্যবাদ দিয়ে ফেললাম সবাই!
আমরা ছাড়া কেউ নেই! ছবিঃ লেখক

মানুষের চাপটা এখানে দিন দিন বেড়েই চলছে। ইন্টারনেটে ছবি দেখে বিরক্তই হয়েছিলাম খানিকটা। এমন সময় এসেও ফাঁকা বিছানাকান্দি পেয়ে যাওয়ার আনন্দটা ছিল অনেক অনেক বেশি।
আলো আঁধারির খেলা, ছবিঃ জিম

সন্ধ্যা নামার পরই ভারতীয় অংশটায় পাহাড়গুলোর গায়ে কয়েকটা রোড লাইট জ্বলে উঠল। একটু আগেই সূর্য ডুবে যাওয়ায় আকাশে চলছিল নানা রঙের খেলা। সারি সারি পাহাড়গুলো আবছা আলো আর অদ্ভুত নীরবতায় তাদের অস্তিত্বকে জানান দিয়ে যাচ্ছিল। আর পায়ের নিচে ছোটবড় অসংখ্য পাথরকে পাশ কাটিয়ে বয়ে চলা ক্ষীণ পানির স্রোতধারা সারা শরীরেই বুলিয়ে যাচ্ছিল আরামদায়ক শীতলতার পরশ। বলতেই হবে সন্ধ্যার বিছানাকান্দির কোনো তুলনা নেই!
নেমেছে সন্ধ্যা, ছবিঃ জিম

পৌনে এক ঘণ্টার মতো থেকে আমরা নৌকায় উঠে পড়লাম। ফিরে যাওয়ার সময় এই সান্ধ্য ভ্রমণটা দীর্ঘদিন ধরে মনে গেঁথে থাকবে আমার। নৌকা নদীর সরু দিকটার দিকে যেতেই দেখলাম পানিতে ভাসছে জ্বলন্ত প্রদীপ। প্রদীপের এই নিভু নিভু আলো ছাড়া পুরো জায়গাটায় অন্য কোনো আলোর দেখা নেই। পানির ওপর আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্য দিয়ে চলা পুরোটা সময় আমরা কেউ কোনো কথা না বলে চুপচাপ কাটিয়ে দিয়েছি। যদি সাথে থাকতেন, হয়তো আপনিও সেটাই করতেন!
দেড় ঘণ্টা পর আমরা ঘাটে পৌঁছে গেলাম। আমাদের সিএনজি ড্রাইভারেরা সেখানেই ছিলেন। নৌকার টাকা মিটিয়ে সিএনজিতে উঠে ফিরে এলাম সিলেট শহরে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে সিলেট শহর। এরপর আম্বরখানা থেকে সিএনজি বা মাইক্রোবাসে করে বিছানাকান্দির নৌকা ঘাট। নৌকা ঠিক করে বিছানাকান্দি।

খুঁটিনাটি:

সিএনজি ড্রাইভারকে বলে নেবেন হাদারপাড় না গিয়ে যাতে বিছানাকান্দির অন্য ঘাটগুলোর যে কোনো একটায় নিয়ে যায়।
আমাদের দুই নৌকার ভাড়া পড়েছিল ১,২০০ টাকা।
সন্ধ্যায় পৌঁছালে বিজিবির সদস্যদের সাথে কথা বলে নেবেন যাতে কিছুটা সময় থাকতে পারেন।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে ভুলবেন না।
ফিচার ইমেজ- সিজান আহমেদ জিম 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নপুরী ইতালি: শীর্ষ সব ভ্রমণস্থানের গল্প

মেঘপাহাড়ের দেশ সুইজারল্যান্ডের স্বর্গরাজ্য থেকে বলছি