এস্তোনিয়ার গহীনে ভ্রমণ

বেশির ভাগ পর্যটকই তালিন শহরটি বাদে আর বেশি দূর বেড়াতে যান না। কিন্তু এই রাজধানী শহর পেরিয়ে এস্তোনিয়ার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা মেলে বিপুল বনরাশির। তাও আবার প্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া বিবর্জিত, মার্জিত কিন্তু অপরূপ। বন্যপ্রাণীদের জন্য এই স্বর্গে কেউ কেউ বেড়াতে আসেন প্রকৃত শান্তির সন্ধানে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে। 

এস্তোনিয়ার এক-চতুর্থাংশ প্রাকৃতিক সংরক্ষণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ। এছাড়া প্রায় অসীম মনে হওয়া জলাভূমি ও তৃণভূমির বুক চিরেও রয়েছে বনভূমি। এই বনভূমি দেশটির প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে এখানকার নেকড়ে বাঘ, ভাল্লুক, বুনো শুয়োর সহ লিন্স নামক এক প্রজাতির বনবিড়ালের বসবাসের জন্য হয়েছে অভয়ারণ্য। আবার দেশের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ জলাভূমি ও তৃণভূমি রয়েছে, সেগুলো অভিবাসী পাখিদের জন্য দারুণ এক বিশ্রামের জায়গা।

এস্তোনিয়ার বণ্য জীবজন্তু; ছবিসূত্র: Estonian Wildlife Tours

৪৫,২২৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে বাস করে মাত্র ১৩ লক্ষ মানুষ। এতে করেও দেশটির প্রাকৃতিক বনভূমির পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা করা যায় সহজেই। 

এস্তোনিয়ার উত্তর-পশ্চিমাংশে দেশটি প্রসারিত হয়ে গিয়ে মিশেছে বাল্টিক সাগরের সাথে। একইসাথে সমুদ্র সৈকতের কাছে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১,৫০০টি ছোট ছোট দ্বীপ, যার বেশীরভাগ দ্বীপেই কোনো জনবসতি নেই। আস্কি নামক দ্বীপটির অধিবাসী মাত্র একজন। এস্তোনিয়ার মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীরা ছুটির দিনগুলোতে দ্বীপের পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করে। ফলে একইসাথে কম সময়ের চাকরিও হয় আবার ছুটিও কাটানো যায়। 

এস্তোনিয়ার উত্তরাঞ্চলের দ্বীপগুলোর মধ্যে একটি, Aegna; ছবিসূত্র: Vikipeedia

বাল্টিক সাগরে আনুমানিক ৩০,০০০ গ্রে সিলের বসবাস। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ সিলই বাস করে মালুসি নামক দ্বীপটিতে। সেখানে নিশ্চল পানির উপর অহরহ একাকী ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় সিলগুলোকে।

১৯২০ সালের দিকে এস্তোনিয়রা সিল ধরার এক অভিনব কায়দা বের করে। তারা আবিষ্কার করে যে সিল গানের প্রতি বেশ আকর্ষণ বোধ করে। তাই বর্তমানে লিলো নামক স্থানীয় লোকসংগীত থেকে শুরু করে বিথোভেনের গান বাজিয়েও সিলগুলোকে আকর্ষিত করে ধরে ফেলা যায়। বেশ সংস্কৃতিবান প্রাণী নিঃসন্দেহে! 

বাল্টিক সাগরে গ্রে সিল; ছবিসূত্র: TripAdvisor

কিন্তু আপনি যদি কেবল একাকী শান্তির খোঁজে ভ্রমণে বের হন, তাহলে কেবল সমুদ্র ভ্রমণই নয়, আরো অনেক জায়গাই আছে এস্তোনিয়াতে। 

এস্তোনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতীয় পার্ক, সুমা। নদী, জল-জঙ্গল সমৃদ্ধ পার্কটিতে রয়েছে ১৮৫ প্রজাতির পাখি। যার মধ্যে সোনালী ঈগল, প্যাঁচা, স্টর্কদের সাথে স্তন্যপায়ী প্রাণীদেরও দেখা যায়। একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে পার্কটিতে, যেখান থেকে পার্কের মোটামুটি বেশীরভাগ জায়গাই নজরে আসে। সেই ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়ালে বোঝা যায়, পার্কটিতে কিছুটা রয়েছে আফ্রিকান সাভানার মতো ভাব, আবার টাওয়ারের নিচের সমতল ভূমি ছড়িয়ে গেছে দিগন্ত অবধি। ঘাস ও মসের মিশ্রণে মাটিতে কিছুটা লাল ভাবও দেখা যায়। মাটি-রঙা অঞ্চলগুলোতে রয়েছে বিশাল লম্বা লম্বা গাছ। পার্কের বুক চিরে এলোমেলো বয়ে গেছে কিছু ঝিরিপথও। 

টাওয়ারের নিচের সমতল ভূমি ছড়িয়ে গেছে দিগন্ত অবধি। ছবিসূত্র: RMK

সেই নরম মাটির উপর দিয়ে পথ চলতে চলতে একসময় পেরিয়ে যেতে হয় কাদামাটিও। তবে এসব কাদামাটিতে মাখামাখি হয়ে পুরো পার্ক ভ্রমণ শেষ করতে হয় না, দেখা মেলে ক্যানু নামক নৌকার। সেই নৌকায় চড়ে ধীরে সুস্থে পাড়ি দেওয়া যায় রিসা নামক নদীটি। নদীতে পানি কেমন থাকে সেটা আপনার ভাগ্যের উপর। আমাদের দেশের শাখা নদীগুলোর মতো পানি কমও থাকতে পারে, আবার বর্ষার পদ্মা, মেঘনার মতো মাত্রাতিরিক্তও পানিও থাকতে পারে।

তবে সাধারণত সুমা একটি বন্যাপ্রবণ এলাকা। বসন্তকালীন সময়ে বন্যায় এখানে পানির উচ্চতা বেড়ে চার মিটার পর্যন্ত উঠে যায়। ফলে ক্যানুতে করে আশেপাশের তৃণভূমি ও জলবদ্ধ জঙ্গলে বিচরণ করা সম্ভব হয়। এস্তোনিয়রা এই সময়টিকে উল্লেখ করে বছরের ‘পঞ্চম ঋতু’ হিসেবে। 

এস্তোনিয়ার পঞ্চম ঋতু; ছবিসূত্র: In  Your Pocket

তবে এইসব অ্যাডভেঞ্চারে পূর্ণ জায়গা আপনার পছন্দ না হলে রয়েছে আরো কিছু অপশন।

Pärnu হচ্ছে এস্তোনিয়ার স্পা সেবা নেওয়ার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা। একইসাথে এটিকে এস্তোনিয়ার ‘গ্রীষ্মকালীন রাজধানী’ও বলা হয়ে থাকে। বিস্তৃত রাস্তার দুই পাশে সারি দিয়ে গড়ে ওঠা সুন্দর কাঠের বাড়িঘর এবং এসব ঘেঁষে রয়েছে সাদা বালুর মন মাতানো সমুদ্র সৈকত। ভাগ্য ভালো থাকলে, সেই সব সি-বিচ খালিই পেয়ে যেতে পারেন। 

রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা কাঠের বাড়িঘর; ছবিসূত্র: Sludge G/Flickr

সমুদ্রে দাপাদাপি করে, খোলামেলা রাস্তাগুলোতে ঘুরে বেড়ানো শেষে থাকতে পারেন ফ্রস্ট বুটিক হোটেলে। যেমন আরামদায়ক তেমনি আকর্ষণীয় এই হোটেলটি। সাদা রঙে পলিশ করা কাঠের বিমের উপর অবস্থিত উঁচু সিলিং, আরামদায়ক বালিশ এবং তামাটে রঙের মখমলের চাদর— এই সব কিছু মিলিয়েই মনে হবে যেন ঘরে নয়, মেঘের রাজ্যে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। এছাড়া হোটেলের নিচতলায় ফায়ারপ্লেস এবং মোমবাতির ছড়াছড়ি আপনার মনকে বাধ্য করবে সন্ধ্যে বেলাটা প্রিয়জনের সাথে প্রিয় পানীয় পান করতে করতে কাটাতে। 

ফ্রস্ট বুটিক হোটেল; ছবিসূত্র: Booking.com

এখানকার এরকম গ্রামীণ সৌন্দর্যবোধ, কাছেই অবস্থান করা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জল-হাওয়ার সাথে মিলেমিশে ছুঁয়ে গেছে স্থানীয় প্রায় সব ক’টি হোটেল এবং রেস্তোরাঁতেও। পাইন কাঠে নির্মিত আসবাবপত্র, পরিষ্কার করে রাখা শামুকের খোলস, ফায়ারপ্লেসে আগুনের মড়মড় শব্দ, প্রকৃতির রঙয়ে সাজানো ঘরের দেয়াল— এই সব কিছুই এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করে যেন এগুলোর কোনো কিছুই মানবসৃষ্ট নয়, সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে নির্মিত!  

সেখানকার খাবারদাবারে যেমন আধুনিকত্ব রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রাচীনত্বের ছোঁয়াও। যেমন ধরুন, NOA থেকে খেতে পারেন পুদিনা পাতার আইসক্রিম, এক ধরনের বিস্ময় জাগানিয়া মজাদার মসের সাথে বিটরুট এবং ষাড়ের মাংস খেতে পারেন Cru থেকে। রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারগুলোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রত্যেকটা খাবারের উপকরণই সম্পূর্ণ স্থানীয়। এমন নয় যে এস্তোনিয় খাবারের উপকরণগুলোও স্থানীয় হতে হয় কিন্তু অনেক এস্তোনিয়ই নিজেদের খাবারের উপকরণ নিজেরাই সংগ্রহ করে নিতে ভালোবাসেন। প্রচুর এস্তোনিয় স্থানীয় জঙ্গলে যান কেবল নিজেদের খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় মাশরুম এবং অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করতে।

এতসব ঘুরে বেড়ানো শেষে চলে আসার সময় রাজধানী তালিন হয়ে ঘুরে আসা যায়। শহরটি ইউনেস্কোর প্রাচীন শহরের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। মধ্যযুগীয় দেয়ালে ঘেরা, খোয়া বিছানো পথ, ছাদের উপর লাল রঙা টাইলস, সমুদ্রের বুকের পোতাশ্রয় অবধি বিস্তৃত শহুরে আলোর খেলা— এসব কিছুই আমাদের শান্তির আশ্রয়ে ঘিরে ধরে রাখে। এখানকার চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ কিংবা রাস্তার পাশের বন্ধুত্বপূর্ণ কোলাহলের পরও মনে করিয়ে দেয় জায়গাটা এস্তোনিয়ায়, শান্তি এবং নীরবতার এস্তোনিয়া। 

নীরবতা ও প্রশান্তির তালিন নগরী; ছবিসূত্র: The Culture Trip

ছুটিছাঁটায় শান্তিতে দুদণ্ড সময় কাটাতে একা কিংবা পরিবারসহ ঘুরে আসুন এস্তোনিয়া থেকে। উপভোগ করুন পৃথিবীর বৈচিত্র্যগুলো। 

ফিচার ইমেজ:  G Adventures

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ব্যাংককের নিকটবর্তী ৫টি অসাধারণ দ্বীপ: ঘুরে আসতে পারেন সহজেই

বিশ্বের সেরা কিছু সস্তা খাবার