অভাবনীয় সুন্দর আগ্রা দুর্গ থেকে অপূর্ব তাজ দর্শন

তাজমহলের মায়ায় বাঁধা পড়ে বেশ বিষণ্ণ মনে পথ ধরে ছিলাম আগ্রা দুর্গের উদ্দেশ্যে। আমার ভাবনায় ছিল ধুর, কী হবে এই আগ্রা দুর্গ দেখে? একমাত্র তাজমহল ছাড়া মানুষের তৈরি আর কোনো স্থাপনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই বা ছিল না। যখন আগ্রা দুর্গের কাছে রাস্তার অপর পাশে এসে আমাদের অটো দাঁড়াল, বাইরে থেকে দেখেই মনটা আমার দমে গেল! মনে মনে বলছিলাম কী হবে এই এক লাল ইটের তৈরি দুর্গ দেখে! ধুর, এর চেয়ে বাকি সময়টা তাজমহলে কাটিয়ে দিলেই তো ভালো হতো। কেমন বিশাল লাল ইটের একটা প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে ভেতরে কোনো দুর্গকে আড়াল করে।

রাস্তা থেকে আগ্রা দুর্গ। ছবিঃ culturalindia

এমনকি মাত্র ২০ রুপীর টিকেটের বিনিময়ে যখন দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করছিলাম তখনো মন পড়েছিল তাজমহলের রূপের কাছে, অসম্ভব আকর্ষণ আর মিহি মায়ার কাছে। তার উপর যখন জানলাম বিদেশী টুরিস্টদের প্রবেশ মুল্য ১০০ রুপী তখন তো আরও মেজাজ খারাপ হলো। একবার তো ভাবলাম নাহ ওরা যায় যাক, আমি বাইরে একটু হেঁটে বা ঘুরে ঘুরে দেখে ওদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু সেবারই প্রথম দেশের বাইরে ভ্রমণ বলে আমার বেপরোয়া ইচ্ছায় লাগাম লাগালাম। সবার সাথেই ভেতরে প্রবেশ করলাম। তবে অবশ্যই বেশ মন খারাপ নিয়ে। মন তো আমার তাজমহলের শ্বেত পাথরে, সবুজ গালিচায়, বর্ণীল ফুলে আর যমুনার জলে গেঁথে গেছে!
দু’পাশে লাল ইটের খাড়া দেয়ালের মাঝে মাঝারি আর ধুলো ওড়া রাস্তা দিয়ে নিচ থেকে উপরের দিকে হেঁটে চলেছি মেজাজ খারাপ নিয়ে। কিন্তু একটু উপরে উঠতেই অসহ্য গরমের মধ্যে কোথা থেকে যেন হু হু ঠাণ্ডা বাতাস পুরো শরীর জুড়িয়ে দিল মুহূর্তেই! ক্ষণিকের জন্য থমকে গিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম, হুট করে পাওয়া একটা ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগলাম।
আগ্রা দুর্গের খোলা চত্তর। ছবিঃ manthandiary

উপরে উঠে একদম সমতলে, লাল ইটের উঠোনে যখন দাঁড়ালাম চারদিক থেকে মিহি বাতাস যেন শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল আমাদের আগমনকে আর সেখানে দাঁড়িয়ে একটু দূরের খোলা জানালায় চোখ পড়তেই বিস্ময়ে হা হয়ে তাকিয়ে ছিলাম! হ্যাঁ সত্যি তাই-ই, বিস্ময়ে হা হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। এমন উপহার নিয়ে যে এই দুর্গ আমার জন্য অপেক্ষা করছে আমি ভাবতেই পারিনি। একদম না।
যে উপহার পেয়ে এতক্ষণ ধরে ভেতরে ভেতরে মন খারাপ করে থাকা আক্ষেপটা উধাও হয়ে গেছে নিমিষেই! কেননা এটা সেই উপহারই যে। যার জন্য মন ব্যথাতুর হয়ে, আক্ষেপে পুড়ছিল! হ্যাঁ, সেই শ্বেত পাথরের ধবধবে সাদা আর অপার আকর্ষণের তাজ! তাজমহল এই দুর্গের লাল ইটের খোলা জানালা দিয়ে দূর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছিল!
আগ্রা দুর্গ থেকে তাজের চাহুনি! ছবিঃ culturalindia.net

ভাবা যায়, যার জন্য আপনি ভীষণ মন খারাপ করে আছেন, যদি একটু পরে দেখতে পান যে সে আপনাকে আড়াল থেকে দেখে মিটিমিটি হাসছে! কেমন অনুভূতি হবে তখন? কতটা খুশিতে উচ্ছ্বসিত হবেন? কতটা হতে পারেন আপ্লুত? ঠিক ততটাই হয়েছিলাম, আগ্রা দুর্গের খোলা জানালা থেকে দূরের যমুনা তীরে দাঁড়ানো তাজের অপূর্ব আর অপার্থিব আকর্ষণ দেখে।
আমি আর কোত্থাও যাইনি। একদম কোথাও না। দুর্গের খোলা বারান্দায় গিয়ে অপলক চোখে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। তাজের দিকে। সে কী অপূর্ব পরিবেশ, অপার্থিব চারপাশ আর অভাবনীয় স্থাপনা, নিজ চোখে না দেখলে অনুভব করা মুশকিল। আপনি দুর্গের যে কোনো খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখবেন তাজ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানেই দাঁড়ান বা বসে থাকুন না কেন যমুনার মাতাল বাতাস আপনাকে পাগল করে তুলবে, ব্যাকুল করে দেবে আপনার ভেতরের আপনাকে।
খোলা বেলকোনি থেকে। ছবিঃ shomaabhyankar

পুরো দুর্গের একটা অংশ যমুনা নদীর সাথে প্রায় লাগোয়া, সামনের যতটা জায়গা আছে সেখানে আছে বিশাল নদীর মতো পরিখা, যেন হুট করে নদীর এপাশ দিয়ে কোনো শত্রুপক্ষ এসে আক্রমণ করতে না পারে। তার আগে রয়েছে চওড়া প্রাচীর। তার মানে, নদী, দীর্ঘ প্রাচীর, নদীর মতো বহমান জলে টইটুম্বুর পরিখা, নিচের দিকে পাহারা দেবার জন্য, পায়চারী করার জন্য ছোট পথ তারপরে উপরের সারিতে খোলা বেলকনি।
যেখানে দাঁড়ালে যমুনা নদী আপনাকে দেবে সব সময়ের প্রাকৃতিক ঠাণ্ডা বাতাস, দূর থেকে দেখতে পারবেন পরম প্রেয়সী প্রিয় তাজকে। অপলক চেয়ে থেকে যত খুশি তত, যেভাবে খুশি সেভাবে। আর পুরো দুর্গের যে দুর্লভ কারুকাজ, তা দেখে বিস্ময়ে চোখের ঘোর লেগে যাবে নিশ্চিতভাবেই।
অপূর্ব কারুকাজের আগ্রা দুর্গ। ছবিঃ cdn.britannica.com

আর পুরো দুর্গের ভেতরে চোখের আরামের জন্য রয়েছে নানা রকম ফুলের গাছ, পাতা বাহার, সবুজ গালিচা, বাগান, ফোয়ারা, মঞ্চসহ কত শত কক্ষ আর সবুজের সমারোহ। শুনেছি এখানে সম্রাট শাহজাহানকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। যিনি পৃথিবীর এই অনন্য স্থাপনা, সপ্তম আশ্চর্যের একটির স্থপতি ছিলেন। যিনি শ্বেত পাথরে সাদা তাজমহলের অনুরূপ আর একটি কালো মার্বেল পাথরের অনিন্দ্য স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন যমুনার অপর পাশে। ঠিক তাজমহলের উল্টো পাড়ে। যেটাকে নিজের সমাধি বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অঢেল সম্পদের অপচয় রোধ করতে তার কাছের মানুষেরাই তাকে বন্দী করে এই দুর্গে নির্বাসন দিয়েছিলেন।
যদিও এই আগ্রা দুর্গই ছিল মুঘল সম্রাজ্যের প্রথম আবাসস্থল। যতদিন দিল্লীকে ভারতের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা না করা হয়েছে। আর কথিত আছে এখানেই সম্রাট শাহজাহানকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল বাকি জীবনের জন্য। তিনি এই আগ্রা ফোর্টে বসে, বেলকনিতে হেঁটে, খোলা জানালায় তাকিয়ে, যমুনার বাতাস গায়ে মেখে তার অনেক আদর, মমতা, পরম স্নেহ আর ভালোবাসায় গড়া তাজমহলের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেন! সত্যি মিথ্যা তো জানি না, তবে এমনই কথিত আছে, শুনেছি।
আগ্রা দুর্গ। ছবিঃ irpano.ru

তবে যে যাই বলুক, আমার কিন্তু তাজকে সব থেকে ভালো লেগেছে, তাজের কাছে গিয়ে নয়, ছুঁয়ে নয়, বসে নয়, ইচ্ছেমতো আস্বাদন করে নয়! সব থেকে মোহাচ্ছন্ন হয়েছি, কাছ থেকে যতটা, তার থেকেও বেশী দূর থেকে, আগ্রা দুর্গের বেলকনি, খোলা জানালা থেকে, দূরের তাজকে দেখে। দেখেছি আর মোহিত হয়েছি, বিমোহিত হয়েছি আর অপলক তাকিয়ে থেকে রূপ-রস-গন্ধ অনুভব করেছি।
তাজের এমন অনিন্দ্য রূপ আস্বাদন করতে চাইলে, ঢাকা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে আগ্রা, ট্রেন, প্লেন বা বাসেও যেতে পারেন অনায়াসে। যার যেভাবে সাধ জাগে আর সাধ্য আছে।
ফিচার ইমেজ- d1ljaggyrdca1l.cloudfront.net

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অস্ট্রেলিয়ায় আমার প্রিয় ৯টি হোটেল

এক নজরে একটি জেলা: ইসলামের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম