ঈদের ছুটিতে মেঘ ছুঁতে যাই কালিম্পংয়ে

মসজিদের ভেতরের অংশ; source: poriborton

এই মেঘ ছুঁয়ে গেল নাকি! এই তো রোদ ছিল? তাহলে গায়ে পানি কীসের! হাত, মাথা আর মুখ ভেজা কেন?

এই তুই কই?

আরে এই তো আমি!

আমি তো আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!

কিন্তু অন্যরা কই গেল? সামনেই তো ছিল! এত তাড়াতাড়ি গেলই বা কোথায়?

ওই যে, ওই যে, কিন্তু দেখা যাচ্ছিল না কেন?!

মেঘে ডাকা ডেলো। ছবি- লেখক

মেঘে ঢেকে ছিল কী! হ্যাঁ,, তাই তো! ওই যে আবার আসছে!

“হ্যাঁ এই দিকেই! দ্যাখেন, দ্যাখেন!” এই যে!

এই চলে গেল! কী দারুণ! কি অদ্ভুত! কী অসাধারণ! কী বিস্ময়! আমরা মেঘে ঢাকা! এগুলো মেঘেরই অশ্রু! মেঘেদের চলাচল! আমাদের চারপাশ ঘিরে!

এমনই ছিল হঠাৎ মেঘে ঢেকে গিয়ে, কিছুটা ভিজে গিয়ে আর অন্যদের ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি সীমার বাইরে গিয়ে আমাদের বিষম বিস্ময়! কালিম্পংয়ের ডেলো লেকের উপত্যকায় আমাদের অনুভূতি।

মেঘের মাঝে কালিম্পংয়ে। ছবি- লেখক

দার্জিলিং থেকে বিতর্ক শুরু হলো। কোথায় যাব আজ, মিরিখ না কালিম্পং? অনেক যুক্তি তর্কের পরে ঠিক হলো, কালিম্পংই যাব আজ। তো সেভাবেই শুরু হলো, ভিন্ন আমেজ, ভিন্ন গাছ-পাহাড়-জঙ্গল-নদী-উপত্যকা-অবারিত সবুজ, মাঝে-মাঝে গা ছমছমে অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া গুহার মতো লুপ! ইট বিছানো রাস্তা, কখনো পীচ ঢালা, কখনো শুকনো পাতা ঝরা মর্মর ধ্বনি, কখনো দূর ঝর্ণার জলের উচ্ছ্বাস, কখনো মিহি বাতাসের শীতল পরশ, কখনো নেমে যাওয়া আর নেমে যাওয়া আর কখনো জীপের হাইকিং!

অদ্ভুত রোমাঞ্চের মাঝে, হারিয়ে যাওয়া এক-একটি মুহূর্ত। এই ডানে খাদের কিনারে তো এই বামে হাজার ফুট নিচে! এক-একটি পাহাড়ই যেন বার বার ঘিরে ধরছে আমাদের, যেতে দেবে না ওর কোল থেকে! পালাতে দেবে না ওর বুক থেকে! যেন ওর মাঝেই আমাদের ধারণ করে রাখতে চাইছে যে কোনো ছলনায়।

লামাহাটটা। ছবিঃ লেখক

একবার তো এমন হলো একটি পাহাড় ডিঙাতে ৮-১০টি লুপ পেরিয়ে আসতে হলো! মানে একটি পাহাড়ের নিচ থেকে উপর বা উপর থেকে নিচে নামতে ৮-১০ বার ঘুরতে হলো চরকির মতো, পেরোতে হলো ততগুলো গুহা আর কালভার্ট!

এভাবে ভ্রমরের মতো ঘুরতে ঘুরতে এলাম লামাহাটটা। অনেক সাজানো-গোছানে, ছিমছাম, পরিছন্ন একটা ছায়া ঘেরা সবুজ অরণ্য আর রঙ-বেরঙের ফুলের রাজ্যে! কিন্তু প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো থাকতে না দিয়ে, ওর বুক চিরে আরও সৌন্দর্য বের করতে গিয়ে ওর আসল রূপ ঢেকে ফেলেছে। অনেকটা এরকম শুভ্র, সুন্দর, কোমল, মসৃণ, সোনা ছড়ানো কোনো রমণীকে যদি একগাদা ফাউনডেশন, ফেস পাউডার, উপটান, কাজল, লিপস্টিক, মাস্কারা আর গ্লস লাগালে যে কিম্ভূতকিমাকার রূপের বীভৎসতা তৈরি হয়! ঠিক সেই রকম! যে কারণে ওখানে বেশিক্ষণ চোখ ও মনের মাধুরীকে নষ্ট না করে, আবার চলতে শুরু করলাম।

লাভারস ভিউ পয়েন্ট। ছবিঃ লেখক

এবার একটু নেমে চলা। এবার বেশ ঘন জঙ্গল, শিশিরে ভেজা রাস্তা, দূরে পাহাড়ের পা জড়িয়ে তিস্তার ছুটে চলা। এই জায়গাটার নাম প্রেমীদের প্রেম পুরী! (লাভারস মিট পয়েন্ট! ভারতীয় নাম!) কেন? মনে প্রশ্ন এলো। চলো নামি, নেমেই দেখি কেন এই নাম! নেমে উপরের বেদীতে উঠতেই বুঝে গেলাম কেন এই নাম? দুটি নদীর মিলন! যেন কামড়ে ধরেছে, একে অন্যের ঠোঁট! মেটাচ্ছে অনেক দিনের ব্যাকুল তৃষ্ণা! চুমুর তৃষ্ণা! চোখে ভেসে উঠলো ২১ বছরের কেট উইন্সলেট আর ২২ বছরের লিওনার্দোর সেই বিখ্যাত, দৃষ্টি নন্দন আবেগময় মুহূর্ত।

ওখান থেকে আবার শুরু, আবার নামছি, ঘুরছি আর নামছি, ঘুরতে ঘুরতে মাথাই ঘুরে যাচ্ছে। প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যেন তিস্তার উম্মত্ত আহ্বান! পাথরে পানিতে মাখামাখি! ছোট ছোট ঢেউ বড় বড় পাথরের প্রাচীর, একদম তিস্তার পা জড়িয়ে যাচ্ছি অনেক, অনেকটা পথ। ঠিক তক্ষুনি তিস্তার আহ্বান ওর জলে ভেজার, ভেসে বেড়াবার! কিন্তু আমরা তখন শীতের তোড়ে, দূরে পালাই! তিস্তার বুকে শাবল না বসিয়েই ওকে পেরিয়ে যাবার ভালোবাসার প্রাকৃতিক উপহার! এমনভাবেই ব্রিজ করেছে, বিশাল, বলিষ্ঠ কিন্তু কোনো করুণা বা কষ্ট দেয়নি তিস্তাকে! এতটুকুও!

তিস্তার পায়ে পায়ে পথ চলা। ছবিঃ লেখক

আবার উঠছি, তিস্তাকে বামে রেখে, ঠিক উল্টো পথে! যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সেই পথের দিকেই! কিন্তু এবার নদীর ওপর পাড় ঘেঁষে, যেন তিস্তার উৎসমুখে! এবার রাস্তা একদম ঝকঝকে, মসৃণ, এঁকেবেঁকে, বাঁকে বাঁকে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, নীল আকাশ, সবুজ গাছ, গভীর অরণ্য, ফুলেদের বর্ণিল বাহার, বন্য প্রাণীদের নির্জনতা ভাঙার ডাক, পাখিদের গান, তিস্তার বয়ে চলা, রাফটিংয়ের রোমাঞ্চ, সূর্যের উঁকিঝুঁকি, যেন কখনো নিঃশব্দ, কখনো সঙ্গীতের মূর্ছনা মেখে, নীলিমার পথ ধরে স্বর্গের কাছাকাছি।

এভাবে এই পাহাড়, ওই পাহাড়, সেই পাহাড়, পাহাড়ে পাহাড়ে হাত ধরাধরি করে আমাদের নিয়ে গেল এক পাহাড়ের চূড়ায়। যেখানে মেঘেদের বাস, মেঘেদের বাড়ি, মেঘেদের গ্রাম, মেঘে মেঘে মাখামাখি, লুকোচুরি, গড়াগড়ি, এই গাছের উপরে মেঘ! তো এই দু-পায়ের ফাঁকে মেঘ! এই মাথার উপরে মেঘ! তো এই পিঠের কাছে মেঘ! এই ভেসে যায় মেঘ! তো এই ছুঁয়ে যায় মেঘ! মেঘে মেঘে একাকার চারিদিক।

সাদা মেঘ, কালো মেঘ, ধূসর মেঘ, রঙিন মেঘ, শুধু মেঘ আর মেঘ, মেঘ-সূর্যের খেলা, সারাক্ষণ, সারাদিন, সারা জনম ধরে, হাতে-হাত রেখে, গায়ে গা ছুঁয়ে! ভিজিয়ে দিয়ে, জল ছিটিয়ে, ভাসিয়ে দিয়ে।

মেঘে দেখি অবাক হয়ে! ছবি- শাহরিয়ার

আপনি যদি এই গরমে আর আসছে ঈদের ছুটিতে, ঠাণ্ডা শীতের পরশ মেখে, এমন অনুভূতি, এমন প্রকৃতি আর এমন মেঘেদের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে হারিয়ে যেতে চান, তবে নির্দ্বিধায় চলে যেতে পারেন কালিম্পংয়ে। যেখানে এমন মেঘেদের লুকোচুরির সাথে পাবেন সকল রকমের আধুনিকতাও। আর যদি চান একদম নির্জন কোনো প্রকৃতি বা পাহাড়ি পল্লী তাহলে চলে যেতে পারেন কালিম্পংয়ের যে কোনো পাহাড়ি গ্রামে, ইচ্ছে গাঁওয়ে।

ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা হয়ে শিলিগুড়ি থেকে বাসে বা জীপে করে চলে যেতে পারেন কালিম্পং। খুব সহজে আর অল্প খরচেই ঘুরে আসতে পারেন এই ঈদে।  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাঙামাটি শহরে পাহাড়িদের ঐতিহ্যময় উপহারের পসরা

মেঘালয়ে মেঘবিলাস: ক্রাংসুরির উদ্দামতা