ঈদ উল আযহা ও এক টুকরো মাংস…

যেদিন লাদাখের লেহ শহর থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে ভারতের শেষ গ্রামে পৌছাই, সেদিন ছিল ঈদ উল আযহা বা কোরবানীর ঈদ। কিন্তু কেন যেন চারদিকের অপার্থিব রুক্ষ পাহাড়ি সৌন্দর্য সেকথা একবারও মনে পড়তে দেয়নি আমাদের কাউকেই।

আর তাছাড়া, সেই ছোটবেলা থেকেই ঈদ, কোরবানি, জন্মদিন, বিয়ে, বিয়ে বার্ষিকী বা আনুষ্ঠানিক কোনো অনুষ্ঠান আমার কাছে বিশেষ কোনোদিন হয়ে ওঠেনি। এইসব বিশেষ দিনের কোনো কিছুই আমাকে কখনো স্পর্শ করে না। অদ্ভুত একটা ব্যাপার। যে কারণে লেহ থেকে জীবনের অন্যতম রোমাঞ্চকর পথ পেরিয়ে নুব্রাভ্যালী থেকে তুরতুক যখন পৌছাই, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। আমার মাথাতেই ছিল না যে সেদিন ঈদ।

তুরতুকের বনেদী বাড়ি। ছবিঃ পার্পল ড্রিম টিম

তুরতুক হলো পুরোপুরি মুসলিম প্রধান একটি গ্রাম। কারণ এই গ্রামটি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা যায়, যেটা বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় যেভাবেই হোক ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যা বিখ্যাত সিয়াচেন অঞ্চলে পড়েছে। তো তুরতুক যাওয়ার একটু পরেই চারদিক থেকে চুলায় গরুর মাংস চাপানোর গন্ধ পেতে শুরু করলাম মনে হলো! যার ঘ্রাণ গ্রামের বাড়ির রান্নাঘর থেকে বের হয়ে সেটা বাতাসের সাথে ধেয়ে এসে আমাদের নাকে লাগতে লাগল। আর ঠিক তক্ষুনি মনে পড়ল, আরে আজকে তো কোরবানির ঈদ! সারাদিনের অভাবনীয় রোমাঞ্চকর পথের আকর্ষণ আর রুক্ষ কিন্তু মায়াবী সৌন্দর্যের মোহে সে কথা একবারও মনে পড়েনি কারো।

কিন্তু নাকে এসে মাংস রান্নার গন্ধ লাগতেই একজন ভীষণ স্মৃতি কাতর হয়ে পড়লেন। রাসেল ভাই আর তার সাথে কিছুটা বাবলু দা, যাকে আমরা আজকাল বাবু দা বলে ডাকি। রাসেল ভাই তো পারলে মুষড়ে পড়েন, জীবনে এই প্রথম তিনি কোনো কোরবানির ঈদে ঢাকায় বা নিজের বাসায় নেই। অথচ এই দিনে বাসায় তিনি সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটান। তখন বেলা তিনটা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলতে লাগলেন এই সময় বাসায় মাংস নিয়ে আসার পরে অর্ধেক রান্না হয়ে যেত, এমনকি তার হয় তো হাফ কেজি খাওয়াও হয়ে যেত!

সেই দুঃখে তিনি চারদিকে ভীষণ লোভীর মতো ছোকছোক করতে লাগলেন। আসলে যতটা না দুঃখে তার চেয়ে বেশী এই দিনের আকর্ষণে, মায়ায়, টানে, স্মৃতি কাতরতায়। জীবনে প্রথমবার নিজের বাসা ছেড়ে অনেক, অনেক দূরে কোথাও ঈদের দিন কাটানোর কষ্টে। শেষ বেলায় এসেও মাংসের স্বাদ চেখে দেখতে না পারার দুঃখে। তাকে ছাড়া বাসায় আর বাসা ছাড়া সে যে অনেক দূরে আছে সেই বেদনা তিনি তার সাথে অন্যদের মাঝেও সংক্রমিত করে দিলেন।

এরপর হুট করে তিনি সমানের দিকে দৌড়ে চলে গেলেন আবার কয়েক মিনিট পরে ফিরেও এলেন ভীষণ আনন্দ নিয়ে চওড়া হাসি মুখে। কেন হঠাৎ করেই তিনি এত খুশি কেন? নিজে থেকেই বলতে লাগলেন, কোরবানির দিনে গরুর মাংস খেতে না পারার আক্ষেপ একটু হলেও তিনি কমাতে পারছেন! কেন কীভাবে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি তার ক্যামেরার পিছনের হাত সামনে নিয়ে এলেন। সেই হাতে বেশ মাঝারী সাইজের একটা টুকরো আধাসেদ্ধ মাংস ধরে আছেন! কোনো এক পথচারীর কাছ থেকে চেয়ে এনেছেন! আরও দিতে চাইছিল লোকটা, কিন্তু তিনি নেননি।

এরপর সবাই মিলে লাঞ্চের জন্য এক পাহাড়ের পিঠে ঝুলে থাকা বাঁশ, বেড়া আর কাপড় দিয়ে বানানো হোটেলে গিয়ে বসলাম। ততক্ষণে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে পুরো তুরতুক জুড়ে। খোলা পাহাড়ের উপরে সামান্য ট্রিপল দিয়ে ছাদ বানিয়ে রেখেছে যেন ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে বসতে কোনো সমস্যা না হয়। সেখানে বসে আমরা সবার জন্য ম্যাগি অর্ডার করলাম। আর রাসেল ভাই একটি ছোট থালায় তার অর্জন করা বিশেষ দিনের বিশেষ মাংসের টুকরো ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করতে লাগলেন। আমরা নয়জন ছিলাম বলে তিনি গুনে গুনে, অনেক কষ্ট করে ছোট ছোট নয় টুকরা করলেন। এবং সবাইকে ভাগ করে দিতে লাগলেন। অনেকেই নিল, মুখে দিল, কেউ কেউ নিল না, কেউ খেল, কেউ মুখে নিয়ে ফেলে দিল, কারণ ওটা পুরো রান্না করা ছিল না। আধা সেদ্ধ মাংসের টুকরো কি আর আমাদের মতো কষানো মাংস খেয়ে অভ্যস্তরা খেতে পারে?

সেসব বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সেই মাত্র এক টুকরো মাংস কিন্তু হাসি ফুটিয়েছিল কারো কারো মুখে, স্মৃতি কাতর কেউ কেউ দারুণ আনন্দিত হয়েছিল, কোরবানির দিনে গরুর মাংস চেখে দেখতে না পারার আক্ষেপ একটু হলেও ভুলে গিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। এটাই একটা বড় পাওয়া ছিল, হোক এক টুকরো মাত্র মাংস, সুখ, আনন্দ আর মুখে হাসি তো ফোঁটাতে পেরেছে। ঈদের কি মহিমা, কি দুর্লভ ঈদ আর মাংস সেদিন একটু অনুভব করতে পেরেছিলাম। এইসব বিশেষ দিনের অনুভূতিহীন আমি।

কোরবানি আর এক টুকরো মাংসের জন্য।

বিশেষ কথাঃ এই গল্পটা আমি লিখেছি ঠিক-ই, কিন্তু এই গল্পটার কৃতজ্ঞতা বাবু দার, কারণ এই গল্পটা আমার মাথায় ছিল না। এটা আমি অনেক আগেই লিখে শেষ করা ৫০ পর্বের পার্পেল ড্রিমে লিখিওনি, কারণ এই গল্প লেখার অনুভুতি আমার মধ্যে কাজ করেনি, বিশেষ দিনের আবেগহীনতার জন্য। কিন্তু পরে ফেসবুকে বাবুদার এই ঈদ আর মাংস নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই গল্পটা লিখেছি। তাই এই গল্পের কৃতজ্ঞতা বাবু দার।

ধন্যবাদ প্রিয় বাবু দা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একদিনের ভ্রমণে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোরের গল্পকথা