ঈদ ভ্রমণ: পাহাড়ের স্বর্গ রিশপে

এবারের ঈদ একদম ভয়াবহ গরমের মধ্যে পড়েছে। ঘরের বাইরে বের হওয়াটাই যেন দায় হয়ে পড়েছে। কিন্তু আজকাল আমাদের অনেকেই ঈদের সময় দেশে বা দেশের বাইরে নানা রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর স্থান যেমন পাহাড়ে, সমুদ্রে, অরণ্যে এমন প্রাকৃতিক সুখে ভরপুর কোনো না কোনো জায়গায় গিয়ে নিরিবিলি, একান্তে বা নির্জনে কয়েকটা দিন নিজেদের মতো কাটাতে চাই। এবারও হয়তো অনেকেই এমন ভাবনা ভেবেছেন নিজের বা পরিবারের জন্য।  

নির্জন রিশপের রূপ। ছবিঃ লেখক

কিন্তু এই গরমে যাওয়া-আসার ধকল, আর কোথাও গিয়ে ভয়াবহ গরমের কথা চিন্তা করে হয়তো সেই ভাবনায় ইতি টানতে চাইছেন।

কিন্তু না, আপনার ভাবনাকে বরং আরও কিছুটা রঙিন করে তুলতে, একাকী বা পরিবার নিয়ে কয়েকটি দিন, একান্তে, নিরিবিলি, নিজের মতো করে নির্জনে আর গরমকে ছুটি দিয়ে বেশ শীত শীত অনুভুতির মাঝে ঝিরঝিরে বৃষ্টির গান শুনতে চলে যেতে পারেন পাহাড়ের স্বর্গভূমি নির্জন রিশপে। আর সেটাও দারুণ অল্প খরচ, স্বল্প সময়ের সাধ্যের মধ্যেই।

রিশপ, আমার কাছে পাহাড়ের স্বর্গভূমি! জ্বী, ঠিক পড়ছেন পাহাড়ের স্বর্গই। কারণ একই সাথে পাহাড়ের এত এত রূপ আমি আর কোথাও দেখিনি। পাহাড়ের দল এখানে এক এক সময়ে এক এক রূপ ধারণ করে, নানা রকম রঙিন সাজে সেজে ওঠে। আবার কখনো কখনো এক একটি পাহাড় এক এক রকম সাজে সেজে ওঠে একই সময়ে। ভীষণ অবাক করা একটা ব্যাপার, নিজের চোখে না দেখলে পাহাড়ের এমন সাজ আর রূপ বিশ্বাস করানো খুব কঠিন।

কুয়াশা ঘেরা রিশপ। ছবিঃ লেখক

আমি বান্দরবানের পাহাড় দেখেছি, পাহাড় দেখেছি সাজেকের, রাঙামাটির, শিমলার, মানালির, নৈনিতালের, কৌশানীর, হারশিলের। পাহাড় দেখেছি কাশ্মীর আর লাদাখেরও। সব সময়, সব পাহাড়ই আমার কাছে দারুণ লাগে, ভীষণ উপভোগ করি, কিন্তু এই রিশপের পাহাড়কে, একই সাথে আর একই জায়গায় বসে যেভাবে দেখা যায়, উপভোগ করা যায়, একই সাথে পাহাড়ের নানা রকম রঙ, রূপ আর সাজ আর কোথাও দেখিনি বা দেখা যায় না।

সব পাহাড়েই বৃষ্টি হয়, সব পাহাড়ই রঙ ছড়ায়, সব পাহাড়ই নানা রঙে সাজতে পারে, তবে সেটা এক এক সময়, এক এক রকম করে। একই সাথে পাহাড়ের অনেক রূপ আমি শুধু রিশপেই দেখেছি, এমনটা শুধু রিশপেই দেখা যায়। এখানে এই একই সাথে পাহাড়ের নানা রূপই আপনাকে অভিভূত করে তুলবে, অবাক করে দেবে আর একই সময়ে আপনাকে নানা রকম অনুভুতির স্বাদ দিয়ে যাবে।

রোদ ঝলমলে রিশপ। ছবিঃ লেখক

রিশপের পাহাড়ে বসে আপনি পাবেন একই সাথে কনকনে শীতের মতো পরিবেশ, যখন গায়ে বেশ গরম কাপড় পরে আপনাকে সেই শীত অনুভব আর উপভোগ করতে হবে। হয়তো যখন আপনি এমন শীতের মাঝেই এক কাপ কফি হাতে সুখের পরশ দেবেন, ঠিক সেই সময়েই হয়তো পাশের কোনো পাহাড়ে ঝুমঝুম বর্ষা নেমেছে!

আবার অবাক হয়ে দেখতে পাবেন আর একটু দূরের কোনো পাহাড়ে তখন ঝলমলো রোদ, কোনো পাহাড়ের গায়ে গায়ে তখন সাদা মেঘেদের সুখের ওড়াউড়ি, আর অন্য কোনো পাহাড় হয়তো নীল রঙের মায়াবী সাজে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। আবার কোনো পাহাড় তখনই হয়তো কালো মেঘেদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বৃষ্টিতে ভিজবে বলে তার খেয়াল জেগেছে, আবার অন্য কোনো পাহাড় তখন হয়তো ভীষণ অভিমানে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আছে কারো অপেক্ষায় ভাঙাতে অভিমান!

রিশপ থেকে মুগ্ধ কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছবিঃ লেখক

আর এসবের মাঝেও সবচেয়ে মুগ্ধ হবার মতো যে পাহাড়, সে হলো দূরে অন্য কোনো পাহাড়ের মাঝে মাঝেই উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাবে শ্বেতশুভ্র বরফ মোড়ানো পাহাড় চূড়া, পাহাড়ের সারি আর কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর কি চাই বলুন এক পাহাড়ে বসে এরচেয়ে বেশি? আর কত রঙের, ঢঙের, সাজের পাহাড় দেখতে চাই বলুন? আর এই নানা রকম পাহাড়ের সাজের সাথে নির্জন অরণ্য একদম ফ্রি।

সত্যি বলছি একমাত্র রিশপের পাহাড়েই আমি পেয়েছি এমন রূপ, এমন সাজ আর এমন সময়, একই সাথে আর একই সময়ে। তাই তো আমি রিশপের নাম দিয়েছি পাহাড়ের স্বর্গ। আমার কাছে রিশপ এমনই। এই রিশপকে আমার আর একটা কারণে এত এত ভালো লাগে। সেটা হলো, সে আমার হাত ছোঁয়া দূরত্বে, ইচ্ছে হলেই একটু অবসর পেলেই আমি ছুটে গিয়ে ছুঁয়ে দিতে পারবো রিশপের প্রিয় পাহাড়গুলোকে, দেখতে পারবো একই সাথে পাহাড়ের কত শত রূপ একই জায়গায় বসে। তাই আমি সময়, সুযোগ আর অল্প কিছু টাকা পেলেই বার বার ছুটে যেতে চাই প্রিয় রিশপে, পাহাড়ের এই স্বর্গ ভূমিতে।

রিশপের অরণ্য কুটির। ছবিঃ লেখক

আপনিও এই গরমে ঈদের ছুটি বা অবসর কাটাতে পারেন একা, বন্ধু বান্ধব বা পরিবার নিয়ে রিশপে। তো আর ভাবনা কেন, উপভোগ করে আসতে পারেন পাহাড়ের স্বর্গ রিশপকে।

যেভাবে রিশপ যেতে পারেন: রিশপ যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা হয়ে ভারতের ফুলবাড়ি সীমান্ত পার হয়ে শিলিগুড়ি ৬৫০-১,০০০ টাকা এসি আর নন এসি। শিলিগুড়ি জংশন থেকে বাস বা পানির ট্যাংকি থেকে জীপে কালিম্পং ভাড়া ১৩০ থেকে ১৫০। কালিম্পং থেকে জীপ নিতে হবে রিজার্ভ কার। ভাড়া পড়বে ১২-১৫ শ রুপি। গহীন পাইনের অরণ্যর মাঝ দিয়ে রোমাঞ্চকর এক পথ পাড়ি দিতে হবে।

এই অলস চেয়ারে কেটে যাবে সময়। ছবিঃ লেখক

যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়া আর থাকা সবকিছু নিয়ে জনপ্রতি খরচ হতে পারে ৬-৮ হাজার মাত্র ৬-৮ জনের গ্রুপের। আর যদি এক রুমে তিন বা চারজন করে থাকতে পারেন তবে খরচ চলে আসতে পারে মাত্র ৫ হাজারের মধ্যেই। রিশপে রুম ভাড়া পাবেন ৮০০-১,২০০ রুপীর মধ্যে। আর খাওয়ার প্যাকেজ সারাদিনের জন্য ৫০০ রুপী জনপ্রতি। তো আর ভাবনা কিসের? বেরিয়ে পড়তেই পারেন কাঁধে ব্যাগ, হাতে পাসপোর্ট আর পকেটে টাকা নিয়ে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভ্রমণের আনন্দ নষ্ট হয় যে ভুলগুলোর কারণে

নৈসর্গিক শান্তিবাড়ি অনৈসর্গিক সৌন্দর্যের রূপমা